13/09/2026
আরেকটা লাশ। আরেকটা পরিবার। আরেকটা "পারিবারিক ব্যাপার" বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা।
গত কয়েক দিনে দুটি মৃত্যুর খবর আমাদের সামনে এসেছে। দুটোই নারী। দুটোই স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়ে। দুটোই এমনভাবে, যা আমাদের লজ্জা দেওয়া উচিত — অথচ কয়েক দিন পরই আমরা ভুলে যাব।
মুক্তা ইসলাম নামের এক নারীকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হয়েছিল। পাশের ঘরে তাঁর সন্তানেরা কাঁদছিল। মা তখনো ভাবছিলেন সন্তানদের কথা — মার খাওয়ার মধ্যেও বলছিলেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আসতে দাও। আর স্বামী তখন বলছিলেন, আজ পিটিয়ে মেরে ফেলবেন। কয়েক দিন পর রাজধানীর খিলক্ষেতে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁর লাশ। পরিবারের অভিযোগ — এটি হত্যা, আত্মহত্যা নয়।
প্রায় একই সময়ে মারা যান আল মাইদা আক্তার, মাত্র বিশ বছর বয়স। মৃত্যুর দুদিন আগে নিজের বোনকে একটা ছবি পাঠিয়েছিলেন — গালে ব্যান্ডেজ, চোখ ফোলা। লিখেছিলেন, "আপা, ও আমাকে আজও মারছে।" এই একটা লাইনেই বোঝা যায়, কতবার তিনি এই কথা বলেছেন, আর কতবার কেউ শোনেনি।
এই দুই নারীর মৃত্যু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে ২৭ হাজার ৯১১টি, যার মধ্যে ১৭ হাজার ১৯৬টি — অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ — খোদ স্বামীর বিরুদ্ধে। মানে প্রতিদিন গড়ে ৭০টি কল আসে শুধু স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে। এই সংখ্যাগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয় — প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মুক্তা, একজন মাইদা লুকিয়ে আছেন, যাঁর কথা আমরা কখনো জানতেই পারব না।
আমরা কতদিন চুপ থাকব?
আমাদের সমাজে এখনো স্বামীর হাতে মার খাওয়াকে "সংসারের ব্যাপার" বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবেশী শোনে, চুপ থাকে। আত্মীয় স্বজন, বলে "মানিয়ে নাও"। থানায় গেলেও অনেক সময় বলা হয়, "সংসার তো এমনই হয়"। এই নীরবতাই প্রতিটি নির্যাতনকারীকে সাহস জোগায়। এই নীরবতার দাম দিতে হয় মুক্তা আর মাইদার মতো নারীদের জীবন দিয়ে।
যাঁরা এই নির্যাতন চালান, তাঁদের জন্য কোনো সহানুভূতি থাকা উচিত নয়। একজন মানুষ, যিনি নিজের স্ত্রীকে বেঁধে পেটান, সন্তানদের কান্নার মধ্যেও থামেন না — তিনি অপরাধী, স্বামী নন। আইনের চোখে তাঁর বিচার হওয়া উচিত পূর্ণ কঠোরতায়, কোনো আপস ছাড়াই।
এখন করণীয় কী
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ — এই আইনগুলো কাগজে আছে। সমস্যা প্রয়োগে। তাই দরকার:
নির্যাতনের প্রথম লক্ষণেই প্রতিবেশী বা পরিবারের চুপ না থেকে ৯৯৯-এ কল করা বা থানায় অভিযোগ করা।
থানায় অভিযোগ এলে তা লঘু করে না দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, এবং তদন্তে গাফিলতির জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা যুক্ত করা, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এটিকে "স্বাভাবিক" না ভাবে।
নির্যাতিত নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র ও আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা, যাতে তাঁরা ভয় ছাড়া ঘর ছাড়তে পারেন।
মুক্তা আর মাইদার জন্য আমরা আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু তাঁদের প্রতিবেশী, তাঁদের কলিগ, তাঁদের বান্ধবী — যাঁরা হয়তো এই মুহূর্তে একই রকম কষ্টে আছেন, তাঁদের জন্য কিছু করার সময় এখনো আছে। আপনি যদি আশপাশে এমন কিছু দেখেন বা শোনেন, চুপ থাকবেন না। একটা ফোনকল, একটা প্রশ্ন — "তুমি ঠিক আছ তো?" — হয়তো কারো জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।
- Md. Hasib Uddin Chanchal