24/09/2026
যাদের জন্য জীবনভর ছুটে চলি, একদিন তাদের কাছেই ফিরতে পারি না!
আমরা আমাদের সন্তানদের কতটা ভালোবাসি! তারা একটু অসুস্থ হলেই বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে, রাতের ঘুম হারাম হয়, নিজের সব কাজ ফেলে তাদের পাশে বসে থাকি। তাদের সামান্য কষ্টও যেন আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। অথচ একদিন আমরাও এমনই ছিলাম! অসহায়, নির্ভরশীল, পৃথিবী সম্পর্কে অজ্ঞ। তখন আমাদের বাবা-মায়ের পৃথিবীটাও ছিলাম আমরা। আমাদের একটুখানি হাসির জন্য তারা কত রাত জেগেছেন, আমাদের একটুখানি স্বস্তির জন্য কত কষ্ট নীরবে সহ্য করেছেন, তার হিসাব হয়তো কোনোদিনই আমরা রাখতে পারিনি।
কিন্তু সময় বড় নির্মম। সেই বাবা-মায়ের হাত যখন কাঁপতে শুরু করে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, হাঁটতে গেলে কারও হাতের প্রয়োজন হয়, তখন কোথায় যেন আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। জীবিকার তাগিদ, সংসারের দায়িত্ব, অর্থের পেছনে ছোটা, ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ সবকিছুর ভিড়ে ধীরে ধীরে তাদের জন্য সময়টুকুই যেন সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। আমরা ভালোবাসি, কিন্তু সময় দিতে পারি না; মায়া হয়, কিন্তু পাশে থাকতে পারি না; দায়িত্বের কথা মনে থাকে, অথচ সেই দায়িত্বের উষ্ণতাটুকু অনেক সময় তাদের কাছে পৌঁছায় না।
হয়তো একদিন আমাদেরও বয়স হবে। আমাদের হাতও কাঁপবে, চোখও ঝাপসা হবে, হাঁটতে গেলে কারও হাতের প্রয়োজন হবে। তখন হয়তো আমাদের সন্তানদেরও অনেক কাজ থাকবে, অনেক ব্যস্ততা থাকবে, অনেক দূরের শহর থাকবে, অনেক বড় স্বপ্ন থাকবে। তারা হয়তো আমাদের ভালোবাসবে, কিন্তু কাছে থাকার সময় পাবে না। তখন হয়তো আমরা বুঝব! বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অপেক্ষা কত দীর্ঘ, আর একটি সন্তানের ব্যস্ততা কত নিঃশব্দে একজন বৃদ্ধ মানুষের হৃদয় ভেঙে দিতে পারে।
প্রকৃতির নিয়মটা বড় অদ্ভুত। আমরা যেভাবে আমাদের সন্তানদের বড় করি, একদিন ঠিক সেই সন্তানদের কাছ থেকেই আমাদের বার্ধক্যের আশ্রয় প্রত্যাশা করি। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে মানুষকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে ভালোবাসা থাকে, অথচ পাশে থাকার মানুষ থাকে না; সম্পর্ক থাকে, অথচ সময় থাকে না; আপনজন থাকে, অথচ তাদের স্পর্শটুকু দূরের কোনো স্মৃতির মতো মনে হয়।
মাঝেমধ্যে সত্যিই ভাবি, এত টাকা, এত খ্যাতি, এত সম্পদ, এত অট্টালিকা গড়ে শেষ পর্যন্ত লাভটা কোথায়? যাদের জন্য এত কিছু অর্জনের যুদ্ধ, তাদের কাছ থেকেই তো একদিন আমরা দূরে সরে যাই। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার জন্য বর্তমানটাকেই বিসর্জন দিয়ে দিই। তিনবেলা খাবার, মাথার ওপর একটি ছাদ আর একটু নিশ্চিন্ত জীবনের জন্য মানুষ কত যুদ্ধ করে! অথচ সেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য অনেক সময় দিতে হয় পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সময় দিয়ে।
হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাস এটাই। পরিবারকে ভালো রাখার জন্য আমরা সারাজীবন পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে তাদের শৈশবের অনেক মুহূর্ত হারিয়ে ফেলি, বাবা-মায়ের জন্য ভালো কিছু করতে গিয়ে তাদের শেষ বয়সের অনেক বিকেল পাশে বসে কাটাতে পারি না।
যদি আমাদের জীবনব্যবস্থা একটু মানবিক হতো, যদি জীবিকার জন্য মানুষকে আপনজনের কাছ থেকে এত দূরে ছুটতে না হতো, যদি প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব মাটি, পরিবার আর প্রিয়জনদের কাছাকাছি থেকেই সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারত, তাহলে হয়তো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ঘরগুলো এত নিঃসঙ্গ হতো না। হয়তো কোনো বৃদ্ধ মা দরজার দিকে তাকিয়ে সন্তানের অপেক্ষায় থাকতেন না, কোনো বৃদ্ধ বাবা ফোনের ওপাশে সন্তানের কণ্ঠ শোনার জন্য এতটা ব্যাকুল হতেন না।
জীবন আসলে খুব অল্প সময়ের। আমরা ভাবি, আজ নয় কাল সময় দেব। আজ কাজটা শেষ করি, কাল বাবা-মায়ের কাছে যাব। আজ একটু ব্যস্ত আছি, কাল সন্তানের সঙ্গে বসব। কিন্তু সেই ‘কাল’ কখনো কখনো আর আসে না।
শেষ পর্যন্ত হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন অট্টালিকা নয়, ব্যাংক-ব্যালেন্স নয়, খ্যাতিও নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, জীবনের শেষ প্রান্তে ফিরে তাকিয়ে দেখতে পারা, যাদের ভালোবাসা আমাদের জীবনটাকে অর্থ দিয়েছে, তাদের জন্য আমরা অন্তত কিছুটা সময় ভালোবাসা হয়ে থাকতে পেরেছিলাম।
কারণ জীবন একদিন সবকিছু ফিরিয়ে দেয়। শুধু সময়টা ফিরিয়ে দেয় না।