12/07/2026
ফৌজদারি কার্যবিধি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (অধ্যাদেশ নং ৪১, ২০২৫
ধারা- ১: সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন
এই আইনটির নাম "Code of Criminal Procedure (Second Amendment) Ordinance, 2025" এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ধারা- ২: ম্যাজিস্ট্রেটদের জরিমানার ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বেত্রাঘাত বাতিল (৩২ ধারা সংশোধন)
প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট: জরিমানার ক্ষমতা ১০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) টাকা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট: জরিমানার ক্ষমতা ৫,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা করা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট: জরিমানার ক্ষমতা ২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা করা হয়েছে।
বেত্রাঘাত বিলোপ: ফৌজদারি আইন থেকে 'Whipping' বা বেত্রাঘাত করার শাস্তির বিধানটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
ধারা- ৩: গ্রেফতারের পদ্ধতি ও অধিকার সম্পর্কিত নতুন বিধান (নতুন ধারা ৪৬এ, ৪৬বি, ৪৬সি, ৪৬ডি এবং ৪৬ই সন্নিবেশ)
৪৬এ (গ্রেফতারের নিয়ম): গ্রেফতারকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে নিজের নাম লেখা দৃশ্যমান পরিচয়পত্র পরতে হবে এবং আসামিকে তা দেখাতে হবে। একটি 'মেমোরেন্ডাম অব অ্যারেস্ট' (গ্রেফতারি মেমো) তৈরি করতে হবে, যেখানে আসামির পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির স্বাক্ষর এবং আসামির নিজের স্বাক্ষর থাকবে। আসামিকে বাসার বাইরে থেকে গ্রেফতার করা হলে ১২ ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবার বা মনোনীত বন্ধুকে গ্রেফতারের স্থান ও হেফাজতের জায়গা জানাতে হবে। আসামির শরীরে আঘাত থাকলে সরকারি ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা ও মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। আসামি চাইলে গ্রেফতারের ১২ ঘণ্টার মধ্যে আইনজীবীর পরামর্শ নিতে বা আত্মীয়ের সাথে দেখা করতে পারবেন।
৪৬বি (তথ্য সংরক্ষণ): গ্রেফতারের তথ্য সরকারি রেজিস্টার ও ওই থানার সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) তাৎক্ষণিকভাবে লিখতে হবে। আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী চাইলে পুলিশ এই তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে।
৪৬সি (তথ্য প্রদর্শন): প্রতিটি থানা ও জেলার সদর দপ্তরে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদার নিচে নন, এমন একজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব দিতে হবে এবং এই তথ্য ডিজিটাল ফর্মে প্রদর্শন করতে হবে।
৪৬ডি (স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা): পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার যথাযথ যত্ন নেওয়া পুলিশের দায়িত্ব।
৪৬ই (ডাক্তারি পরীক্ষা): গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি অসুস্থ বা আহত হলে দ্রুত সরকারি মেডিকেল অফিসার বা রেজিস্টার্ড ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। নারী আসামির ক্ষেত্রে নারী ডাক্তার বা নার্সের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আসামি গুরুতর অসুস্থ হলে সশরীরে হাজির না করে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করা যাবে।
ধারা- ৪: জব্দতালিকা বা সিজার লিস্ট (৫১ ধারা সংশোধন)
আসামির কাছ থেকে কোনো কিছু জব্দ করা হলে সাক্ষীর সামনে একটি তালিকা প্রস্তুত করতে হবে এবং তার একটি কপি আসামি বা তার মনোনীত ব্যক্তিকে প্রদান করতে হবে।
ধারা- ৫: বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের সুনির্দিষ্ট শর্ত (৫৪ ধারা সংশোধন)
পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করতে পারবে যদি নিচের ১১টি কারণের কোনোটি থাকেঃ
১। পুলিশের সামনে আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলে।
২। ৭ বছর বা তার কম শাস্তির অপরাধের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে; তবে পুলিশকে বিশ্বাস করতে হবে যে গ্রেফতার জরুরি।
৩। ৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করেছে বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে।
৪। কারও কাছে বৈধ কারণ ছাড়া ঘর ভাঙার বা চুরির সরঞ্জাম থাকলে।
৫। সরকার বা আইন দ্বারা ঘোষিত পলাতক অপরাধী হলে।
৬। কারও কাছে চোরাই মাল পাওয়া গেলে।
৭। পুলিশের আইনি কাজে বাধা দিলে বা আইনি হেফাজত থেকে পালালে।
৮। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী থেকে পালানো সদস্য (deserter) হলে।
৯। দেশের বাইরে এমন অপরাধ করলে, যা দেশে করলে শাস্তিযোগ্য হতো এবং তা প্রত্যর্পণযোগ্য হলে।
১০। মুক্তি পাওয়া কয়েদি ৫৬৫(৩) ধারার নিয়ম ভাঙলে।
১১। অন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে গ্রেফতারের বৈধ लिखित অনুরোধ (রিকুইজিশন) আসলে।
শর্তঃ নিবর্তনমূলক আটক (প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন) আইনের অধীনে এই ধারায় কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না।
ধারা- ৬: গ্রেফতারের কারণ অবহিতকরণ (নতুন ধারা ৫৪এ সন্নিবেশ)
বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের সময় পুলিশ আসামিকে গ্রেফতারের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে মৌখিকভাবে জানাবে।
ধারা- ৭: পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (নতুন ধারা ৫৭এ সন্নিবেশ)
গ্রেফতারের আইনি বিধান পুলিশ ঠিকমতো পালন করেছে কিনা, ম্যাজিস্ট্রেট তা যাচাই করবেন। অবহেলা বা আইন লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন।
ধারা- ৮ ও ৯: সমন জারির আধুনিকায়ন (৬৯ ও ৭০ ধারা সংশোধন)
সমন এখন কাগজের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও (এসএমএস, ভয়েস কল, ইনস্ট্যান্ট মেসেজ বা ই-মেইল) পাঠানো যাবে। পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক 'পুরুষ' সদস্যের বদলে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য সমন গ্রহণ করতে পারবেন।
ধারা- ১০: রিমান্ড বা পুলিশ হেফাজত (১৬৭ ধারা সংশোধন)
আসামিকে সর্বমোট ১৫ দিনের বেশি পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) রাখা যাবে না। এরপর তাকে বিচারিক হেফাজতে (জেলে) পাঠাতে হবে।
তৃতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা ক্ষমতাহীন দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারবেন না।
রিমান্ডে দেওয়ার আগে আসামিকে সরকারি ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।
রিমান্ড শেষে শরীরে আঘাতের চিহ্ন বা নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট পুনরায় ডাক্তারি পরীক্ষার নির্দেশ দেবেন এবং নির্যাতনের প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
ধারা- ১১: শোন অ্যারেস্ট ও বেআইনি আটক (নতুন ধারা ১৬৭এ সন্নিবেশ)
অন্য মামলায় জেলে থাকা কাউকে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখাতে হলে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে, কেস ডায়েরি দেখাতে হবে এবং তার বক্তব্য শুনতে হবে। নিবর্তনমূলক আটক (বিনা বিচারে আটক) উদ্দেশ্যে কাউকে গ্রেফতার করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট জেলে পাঠানোর আদেশ দেবেন না। পুলিশের বেআইনি কাজের প্রমাণ পেলে ম্যাজিস্ট্রেট দণ্ডবিধির ২২০ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
ধারা- ১২: তদন্তের সময়সীমা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (নতুন ধারা ১৭৩বি সন্নিবেশ)
মামলার তদন্ত ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে। যৌক্তিক কারণে ম্যাজিস্ট্রেট সময় বাড়াতে পারবেন।
তদন্ত কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃত অবহেলা করেন, বা কাউকে বাঁচাতে প্রমাণ নষ্ট করেন, তবে আদালত তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন।
সুবিচারের স্বার্থে আদালত চাইলে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে আসামির বদলে 'সাক্ষী' হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিতে পারবেন।
ধারা- ১৩: ভাষাগত পরিবর্তন (২৪৭ ধারা সংশোধন)
নালিশি মামলার ক্ষেত্রে "If the summons has been issued on complaint, and upon" এর জায়গায় "In a case instituted upon complaint, if on" শব্দগুচ্ছ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
ধারা- ১৪: মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার ক্ষতিপূরণ (২৫০ ধারা সংশোধন)
মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগকারীকে জরিমানা করতে বাধ্য থাকবেন। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ:
১,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০,০০(পঞ্চাশ) হাজার টাকা;
৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫,০০০ টাকা;
১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা এবং
সর্বোচ্চ ৩,০০০ টাকার জায়গায় ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) টাকা করা হয়েছে।
ধারা- ১৫ ও ১৬: সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়াল (২৬০ ও নতুন ধারা ২৬৪এ)
সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষেত্রে আর্থিক এখতিয়ার ১০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫,০০,০০০ টাকা করা হয়েছে। সম্ভব হলে একই দিনে চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ, আসামিকে পরীক্ষা ও রায় ঘোষণা সম্পন্ন করতে হবে।
ধারা- ১৭: পলাতক আসামির বিজ্ঞপ্তি (৩৩৯বি ধারা সংশোধন)
পলাতক আসামিকে হাজির হওয়ার জন্য জাতীয় বাংলা পত্রিকার পাশাপাশি আদালত, জেলা প্রশাসক বা পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যাবে।
ধারা- ১৮: আপোষ-মীমাংসা (৩৪৫ ধারা সংশোধন)
দণ্ডবিধির ১৪৩ ধারা (বেআইনি সমাবেশ) এখন আপোষযোগ্য করা হয়েছে। আদালত চাইলে আপোষযোগ্য মামলাগুলোতে উভয় পক্ষকে লিগ্যাল এইড অফিসার, আইনজীবী বা নিজেদের মধ্যে আপোষ করার সুযোগ করে দিতে পারবেন এবং চুক্তিপত্র সংরক্ষণ করে আদেশ দেবেন।
ধারা- ১৯ ও ২০: বেত্রাঘাত বিলোপ (৩৯০-৩৯৬ ধারা সংশোধন)
ফৌজদারি কার্যবিধি থেকে বেত্রাঘাত বা চাবুক মারার (Whipping) শাস্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
ধারা- ২১ ও ২২: আপিলের অযোগ্য জরিমানা (৪১৩ ও ৪১৪ ধারা সংশোধন)
যেসব ক্ষেত্রে আপিল করা যায় না, এমন জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৫,০০০ টাকা করা হয়েছে।
ধারা- ২৩ ও ২৪: জামিন ও ডিজিটাল বন্ড (৪৯৬ ও ৪৯৯ ধারা সংশোধন)
জামিন দেওয়ার সময় আদালত আসামির পালানো ঠেকাতে বা ভালো আচরণের জন্য যুক্তিসঙ্গত শর্ত আরোপ করতে পারবেন। আসামিরা আদালতের অনুমতি নিয়ে অনলাইনেও জামিননামা (Bail bond) দাখিল করতে পারবেন, যা জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) দিয়ে যাচাই করা হবে।
ধারা- ২৫: আসামির হাজিরা মওকুফ (৫৪০এ ধারা সংশোধন)
তদন্ত পর্যায়ে আসামি জামিনে থাকলে এবং তার আইনজীবী উপস্থিত থাকলে, ম্যাজিস্ট্রেট যুক্তিসঙ্গত কারণে আসামির ব্যক্তিগত হাজিরা মওকুফ করতে পারবেন।
ধারা- ২৬: সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা (৫৪৪ ধারা সংশোধন)
মামলার বাদী, ভুক্তভোগী এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য আদালত যেকোনো পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবেন।
ধারা ২৭: দ্বিতীয় তফসিলের সংশোধন (SCHEDULE II)
দণ্ডবিধির ১৪৩ ধারাকে আপোষযোগ্য (Compoundable) এবং ১৪৪ ধারাকে আপোষ-অযোগ্য (Not Compoundable) করা হয়েছে।
দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারার (গুরুতর আঘাত) ক্ষেত্রে সমনের বদলে ওয়ারেন্ট ইস্যু হবে এবং এটি জামিন-অযোগ্য (Not bailable) অপরাধ বলে গণ্য হবে।
ধারা ২৮: নতুন ফর্ম সংযোজন (SCHEDULE V, Form IA)
তফসিলে গ্রেফতারের একটি আদর্শ 'মেমোরেন্ডাম অব অ্যারেস্ট' ফর্ম যুক্ত করা হয়েছে। এতে আসামির নাম, পরিচয়, এনআইডি, গ্রেফতারের কারণ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, সাক্ষীর স্বাক্ষর এবং গ্রেফতারকারী কর্মকর্তার বিস্তারিত তথ্য লেখার নির্ধারিত ছক রয়েছে।