06/10/2026
"চাঁদা না দিলে ঘর ভেঙে দেব, মেরে ফেলব!" এক ফোনকলের এই কথাগুলো আইনের চোখে কতটা গুরুতর?
রফিক সাহেবের ছোট একটা দোকান। একদিন অচেনা নম্বর থেকে ফোন: "মাসে ২০ হাজার দিবি। না দিলে দোকান ভেঙে দেব, তোকেও মেরে ফেলব।" রফিক সাহেব ভাবলেন, থানায় জিডি করবেন, নাকি মামলা? আর এই হুমকির জন্য ওই লোকের কী শাস্তি হতে পারে?
আইন এখানে অনেক বেশি স্পষ্ট। ঘটনা কেমন, তার ওপর ধারা বদলায়।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী
ধারা ৩৮৩-৩৮৪: ক্ষতির ভয় দেখিয়ে চাঁদা (donation বা subscription সহ), সম্পত্তি বা মূল্যবান কিছু দিতে বাধ্য করলে সেটা extortion। শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, বা জরিমানা, বা উভয়।
ধারা ৩৮৫: চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে কাউকে ক্ষতির ভয় দেখালে, বা ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেই অপরাধ। শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর, আইনে সর্বনিম্ন ৫ বছরের কথাও আছে।
ধারা ৩৮৬: মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে সত্যিই চাঁদা আদায় করে ফেললে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
ধারা ৩৮৭: চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখালে, এমনকি চেষ্টা করলেও, শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বনিম্ন ৭ বছর, সঙ্গে জরিমানা। অর্থাৎ টাকা আদায় হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না।
ধারা ৫০৩ ও ৫০৬ (ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শন): জান, সম্মান বা সম্পত্তির ক্ষতির হুমকি দিয়ে ভয় দেখালে সাধারণত সর্বোচ্চ ২ বছর। মৃত্যু, গুরুতর আঘাত বা আগুনে সম্পত্তি ধ্বংসের হুমকি হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর।
খেয়াল করুন, "ঘর ভেঙে দেব" আর "আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব" ধারা ৫০৬-এর বিশেষ অংশে একভাবে লেখা নেই। তবে ঘর ভাঙার হুমকিও ঘটনা অনুযায়ী ফৌজদারি ভীতি প্রদর্শন বা চাঁদাবাজির আওতায় আসতে পারে।
ফোন বা মেসেজে হুমকি হলে?
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৬৯(গ) অনুযায়ী চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে টেলিযোগাযোগ মাধ্যমে হুমকিমূলক বা ভীতিকর বার্তা পাঠালে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড, বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা। এই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য। তবে ফোন বা মেসেজ হলেই শুধু এই ধারা খাটবে, তা নয়। ঘটনা অনুযায়ী দণ্ডবিধির ধারাগুলোও একসঙ্গে প্রযোজ্য হতে পারে।
গ্রেপ্তার কি হবেই?
মামলা করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেপ্তার হয় না। দণ্ডবিধির ধারা ৩৮৫ ও ৩৮৭ ফৌজদারি কার্যবিধির তফসিলে আমলযোগ্য, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে। তবে সেটা কার্যবিধির শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করে।
এমন হুমকি পেলে কী করবেন
১. প্রমাণ রাখুন। কল রেকর্ড বা কলের তথ্য, নম্বর, মেসেজ বা চ্যাটের স্ক্রিনশট, অ্যাকাউন্ট বা প্রোফাইলের তথ্য সংরক্ষণ করুন। সামনাসামনি হুমকি হলে তারিখ, সময়, স্থান ও সাক্ষীদের নাম লিখে রাখুন।
২. থানায় লিখিত অভিযোগ বা এজাহার করুন। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৫৪ অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য থানায় লিখিতভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিধান আছে। জিডি শুধু ঘটনার একটা নথি, মামলা নয়।
৩. পরিস্থিতি জরুরি হলে নিজের নিরাপত্তাকে আগে রাখুন এবং ৯৯৯-এ কল করুন।
৪. একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন, কোন ধারায় অভিযোগ দেবেন তা ঠিক করতে।
মনে রাখবেন, এগুলো সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান। শাস্তি কত হবে, তা আদালত ঘটনার প্রমাণ দেখে ঠিক করেন।
⚠️ এটি সাধারণ আইনি তথ্য, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার আইনি পরামর্শ নয়। আপনার ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য, তা জানতে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন।
আপনার এলাকায় কি এমন হুমকির কথা শুনেছেন? কমেন্টে জানান। দোকানদার বা ব্যবসায়ী কারও কাজে লাগবে মনে হলে শেয়ার করুন।
সূত্র: দণ্ডবিধি, ১৮৬০, ধারা ৩৮৩, ৩৮৪, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৭, ৫০৩, ৫০৬; বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১, ধারা ৬৯(গ), ৭৭(১); ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮, ধারা ৫৪, ১৫৪