08/03/2024
সত্য কাহন😢
কি ভাবে শুরু করবো, কি লিখবো বুঝতে পারছি না। কিছু একটা করা দরকার, কিছু লেখা দরকার, ভয়ংকর একটা অন্যায় হচ্ছে, প্রতিবাদ করা দরকার।
কিছুই করতে পারছি না। এই না পারার অক্ষমতা প্রতি নিয়ত আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। গত দুই সপ্তাহ রাতে ঘুমাতে পারি নি, দুঃস্বপ্ন দেখে বারবার জেগে উঠেছি।
ঘটনার শুরু ১৯ জুলাই। জুম্মার নামায পড়তে যাচ্ছি ছেলেটাকে নিয়ে। খুব নীচু দিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে গেল। ছেলেটা অবাক হয়ে জানতে চায়,
বাবা হেলিকপ্টার এত নীচ দিয়ে কেন যাচ্ছে?
জানি না বাবা কেন এত নীচ দিয়ে যাচ্ছে।
বাবা, যে পাইলট ওটা চালাচ্ছে, সে কি তোমার ছাত্র?
সেটাও তো জানি না বাবা।
আমার সাত বছরের ছেলের ধারনা আকাশে যত প্লেন আর হেলিকপ্টার উড়ে, তার সব পাইলটই আমার ছাত্র।
নামায পড়ে বাসায় ফিরে বসে টিভি দেখছি, হঠাৎ চারিদিকে গোলাগুলি, চিৎকার। সারা ঘর টিয়ার গ্যাসের ধোয়ায় ঢেকে যাচ্ছে। চোখ খোলা কঠিন। ছেলে দুটো অসহায় হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। কি হচ্ছে চারিদিকে?
আমি জানি না। সরকার এবং ছাত্রদের মধ্যে কোটা নিয়ে ঝামেলা চলছে কয়দিন ধরে। এটা যে এমন পর্যায়ে যাবে ভাবি নি।
আমার বাসা ধানমন্ডিতে। ঢাকার সাত মসজিদ রোড খুব পরিচিত এবং পুরাতন একটা রাস্তা। এই রাস্তায় অনেকগুলো সরকারী ও বেসরকারী স্কুল কলেজ আছে। আশেপাশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা রাস্তায় এসে জমা হয়েছে। পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংর্ঘষ। চিৎকার আর গোলাগুলির শব্দে একটা ভীতিকর পরিবেশ।
আমি ছাদে উঠে দেখার চেষ্টা করি কি হচ্ছে। আমার বাসাটা পুরানো। ৬ তলা। চারপাশে বেশ কটা সুউচ্চ ভবন, যাকে বলে হাই রাইজ। সেই হাই রাইজ বিল্ডিং এর বারান্দা থেকে কিছু ছোট ছেলেমেয়ে চিৎকার করে বলছে
Uncle Uncle মাথা নীচু করেন, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করছে।
আমি আকাশে তাকাই। শ্রাবণের নীল আকাশ। মেঘ নাই। RAB এর একটা হেলিকপ্টার আকাশে টহল দিচ্ছে। তারা নিশ্চয় আকাশ থেকে মাটিতে ছাত্রদের উপর গুলি করবে না। হয়তো শুধু ভয় দেখানোর জন্য নীচু দিয়ে উড়ছে। ছাত্রদের হাতে তো বন্দুক মিসাইল নাই যে হেলিকপ্টারে মারবে।
আমাকে অবাক করে হেলিকপ্টারের পেটের কাছে খোলা দরজা থেকে একজন গুলি করলো। আমি কি ভুল দেখলাম? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা কি ভাবে সম্ভব?? একজন কেউ রাইফেল হাতে নিয়ে এইম করে ফায়ার করছে। সে কি সুপ্রশিক্ষিত স্নাইপার নাকি সাধারন সৈনিক আমি জানি না। এটা যে টিয়ার গ্যাস শেল ছিল না তা নিশ্চিত। দেশে কি যুদ্ধ বেধে গেল নাকি? সামান্য একটা কোটা নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন কোন দিকে যাচ্ছে কে জানে?
চারিদিকে ধুমধাম টিয়ার গ্যাস আর গোলাগুলির শব্দ। চোখ জ্বলছে, কোন ভাবেই চোখ খুলে রাখতে পারছি না। এর মধ্যেই দেখি সাত মসজিদ রোড একটা রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। একদিকে ছাত্র অন্যদিকে পুলিশ। ছাদে বেশীক্ষণ থাকা ঠিক হবে না। আমি নীচে বাসায় চলে গেলাম। মনটা এত খারাপ। কি হচ্ছে এসব।
ইন্টারনেট নাই। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক খুবই দুর্বল। টিভি খুলে দেখি সব চ্যানেলেই অল্প বিস্তর আন্দোলনের খবর বলছে, তবে ভয়াবহতাটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
পরবর্তী ৩/৪ দিন কোন ইন্টারনেট নাই। এদিক ওদিক থেকে ভেসে আসে নানা খবর। অস্থির প্রহর। কারফিউ, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, সেনাবাহিনী, চারপাশ কেমন গুমোট, কেউ কোন কথা বলে না। না জানি কি হয়। চারিদিকে ত্রাস। ঘরে খাবার নাই, বাজারে সরবরাহ নাই, জিনিষপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। সবার মনে একটাই চিন্তা “ কি হবে”? কি করবো আমরা???
কারা যেন বন্দুকের ঠান্ডা নল উঁচিয়ে বলছে” বেজন্মা রাজাকারের বাচ্চা, তোরা “কি” ও করতে পারবি না।”
এর মধ্যে খবর পেলাম বেশ কটা গুরুত্বপূর্ণ স্হাপনাতে হামলা হয়েছে। টিভি ভবন, সেতু ভবন, বিআরটিএ, মেট্রোরেল স্টেশন আগুনে পুড়েছে। খুবই
দুঃখজনক ঘটনা। তবে তার চেয়েও খারাপ খবর হলো বেশ কিছু মানুষ গুলিতে নিহত হয়েছে। সংখ্যাটা যে কত তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
এর বেশ কিছুদিন পর সম্ভবত ২৮ অথবা ২৯ জুলাই সীমিত আকারে ইন্টারনেট সেবা চালু হলো । আমারা সবাই দেখলাম, জানলাম। সারি সারি লাশ আর জমাট বাঁধা রক্ত। আমারা স্তব্ধ হতেও ভুলে গেলাম। এমনও হয়??!!
এর পর শুরু হোল মিথ্যাচার। পাপ আর অন্যায় ঢাকার কি প্রানান্ত চেষ্টা। দেশের আপামর জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়লেও বিকারহীন রইলেন তাবৎ বড় বড় সব দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং মন্ত্রীরা। পুরো ঘটনা ভিন্ন খাতে ঘুরানোর জন্য কত যে ছল করা হোল এবং এখনো হচ্ছে।
আমি বসে ভাবছি কি করা যায়? আমি অতি সাধারণ ছা পোষা একটা মানুষ। কিই বা করার ক্ষমতা আমার? নাই , কিছু করার ক্ষমতা আমার নাই। আমি রাজনীতি করি না। আমি বিখ্যাত কেউ নই। কে শুনবে আমার কথা?
কিন্তু আমি তো একটা বাবা, আমি একজন শিক্ষক। এভাবে সন্তানরা গুলি খেয়ে মরে যাচ্ছে, ছাত্ররা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করতে গিয়ে জুলুমের শিকার হয়েছে, এর জন্য কিছুই করবো না।কাল যখন আমার সন্তান গুলিতে প্রান দেবে তখন.........
এক সূর্য দহন জ্বালায় জ্বলেছি গত কয়টা দিন। আজ ২ আগষ্ট জুম্ম ার নামায পড়ে নিয়ত করেছি , যা হয় হবে, আমি এই নির্মম গনহত্যার প্রতিবাদ করবো। আমি জানি এর পরিনতি হবে ভয়ানক। তবু এর বিরুদ্ধে আমি লিখবো। এটা না করলে মানুষ হিসাবে, একজন পিতা হিসেবে নিজের কাছে ছোট হয়ে যাব। একটা ই তো জীবন।কি হবে ঘাসফড়িং আর পাখীর মত বেঁচে? মানুষ হতে চাই, একজন সত্যিকারের মানুষ....
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি আপনাকে বলছি.......
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আমাদের Honor Code শিখিয়েছিল। যেখানে বলা হোত.........
A gentleman cadet should lead a life of honor and integrity. He should not lie cheat or steal and should not tolerate who does so.
আপনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সমগ্র জাতির সাথে মিথ্যাচার করেছেন, প্রতারণা করেছেন, বিভ্রান্ত করছেন। কোটা নিয়ে আন্দোলন রত ছাত্রেদের ব্যাপারে আপনার অপরিনামদর্শিতা, অদূরদর্শিতা, হঠকারিতা, এবং দম্ভ দেশকে আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার প্রতি আপনার সীমাহীন লোভ, নগ্ন করেছে আপনার নির্লজ্জ অমানুষিকতা। আপনার এক ইশারায় আপনার পালিত হায়নার দল মনুষত্বের সকল সীমা লংঘন করে ঝাপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর। রাজপথ পঙ্কিল হয়েছে অসহায় ছাত্রদের রক্তে। হায়নাদের পায়ের কাঁটা মারা বুটের তলায় বিভৎস মাংসের পিন্ড, চির চিহ্ন দিয়ে গেছে আমাদের অপমানিত ইতিহসে।
আমরা দেখেছি, আপনার নির্দেশে আপনার গারুদা বাহিনী তাদের গান্ডীব দিয়ে সজ্জিত করেছ হাওয়াই জাহাজ। সেই ব্রহ্মাস্ত্রের লক্ষ্য ছিল ছাত্রদের মাথা।
আকাশ থেকে বজ্রের মত নেমে এসেছে অগুনের গোলা, চোখা জ্বালানো ধোঁয়া। অথচ কি নির্বিকার এবং নির্লিপ্ত ভাবে আপনি বললেন, হেলিকপ্টার থেকে পানি ফেলা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার বুক কি এতটুকু কাঁপে না যখন আপনি এমন অবলীলায় মিথ্যা বলেন?
কি দোষ ছিল ৪ বছরের ছোট্ট রিয়ার? ৬ বছরের একটা বাচ্চা বলি হোল আপনার সীমাহীন অহংকারের। এর দায় আপনি কেমন করে এড়াবেন? আপনি মেতেছেন রক্তের হোলি খেলায়। আপনি কি ভেবেছেন আপনার হাতে লেগে থাকা এই রক্ত, মধ্য শ্রাবনের ভারী বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে? আপনি কি ভেবেছেন যত্রতত্র আপনার বিরক্তিকর মেকী কান্নার নোনা জলে এই রক্তের দাগ মুছে যাবে?
এই মাটি এত রক্ত শুষে নেবে না। এই রক্তের দায় আপনাকে মেটাতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন জনগনের জান কে হেফাজত করতে । আপনি ব্যর্থ হয়েছেন রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করতে। আমি আপনার কাছে এই ব্যর্থতার কৈফিয়ত চাই। আপনা কে জবাব দিতে হবে।
এক সময় দেশের সেবা করার জন্য শপথ নিয়েছি। আপনাকে সুরক্ষা দেবার জন্য শপথ নিয়েছি, নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আপনাকে সুরক্ষা দিয়েছি। আজ সেই হাতে পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্র কলম তুলেছি, আপনার অনাচারের বিরুদ্ধে লিখবো তাই।
আপনার অনুগত নির্লজ্জ চরেরা আমার মুখ চেপে ধরবে। ধরুক। আমার উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ শ্লোগানের ধ্বনি হয়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে প্রতিধ্বনি তুলবে সারা দেশে, আপনি কেমন করে তা আটকাবেন?
আপনার হায়নার দল আমার হাত কেটে নেবে? নিক।
আমার আঙ্গুল লেখকের অজস্র কলম হয়ে ছাত্র জনতার হাতে হাতে যাবে ছড়িয়ে। আমার কিসের ভয়?
আমাকে মেরে ফেলবেন? কাপুরুষ মরে বারবার। মানুষ হয়ে জন্মেছি, একবার মরবো, বীরের মত মরবো। আমার সন্তানরা বলবে তাদের বাবা ছিল একজন সত্যিকারের মানুষ যে মৃতুকে ভয় পায় নি।
আপনি আমাকে মেরে ফেলবেন? আমার রক্তের মৃতসন্জীবনীতে আরো লাখো কোটি কন্ঠ সোচ্চার হয়ে বলবে" আমরা বিচার চাই, আমারা রক্তের বদলা চাই। কত জনকে মারবেন আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী???? যত মানুষ আপনি মেরেছেন, আজ আমিই তাদের কন্ঠস্বর, আজকে আমিই জনগন, আজকে আমিই বাংলাদেশ।
আপনাকে জবাব দিতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি জবাব চাই।আমার সন্তান মরেছে, আমার ছাত্র মরেছে, আমার ছাত্রকে আপনি আপনার সীমাহীন দুর্নীতি আর লোভের জালে ফেলে অনৈতিক কাজে বাধ্য করেছেন। আপনাকে জবাব দিতে হবে।
আপনি একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ না করে, চেতনা নামক চেতনানাশক এক মাদকে আসক্ত করে ঘৃনার বিষ ছড়িয়েছেন।জাতিকে বিভক্ত করেছেন। আমি চুপ ছিলাম। আপনার উন্নয়নের জোয়ারের নীচে দুর্নীতির চোরাবালির যে বিশাল গর্ত, সেই গর্তে দেশ ডুবেছে, কিছু বলি নাই,চুপ ছিলাম, আপনার যাবতীয় আনাচার, অত্যাচার, মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কোন কথা বলি নাই। চুপ ছিলাম। তারপরো আজ ছোট একটা দাবী নিয়ে যখন নিরস্ত্র অসহায় বাচ্চাগুলো রাস্তায় নামলো, আপনি তাদের গুলি করে মারলেন। তাদের কে মারলেন কেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
আপনি কি খোদা? নমরুদ, ফেরাউন ও খোদা ছিল। আপনার শেষের শুরু হয়ে গেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি বিচার চাই। এই গনহত্যার বিচার। যতদিন এই মাটিতে এই ছাত্র জনতা এবং নিষ্পাপ শিশু হত্যার বিচার না হবে, ততদিন আমার কলম থামবে না।
আপনি প্রস্তুত তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
আমি প্রস্তুত, মৃতুর জন্য।
আমার প্রিয় ছাত্র যাকে এক সময় অনেক যত্ন আর ভালোবাসায় আকাশে উড়ে বেড়ানোর সব মন্ত্র শিখিয়েছিলাম,.... যদি এক দিনের জ ন্যও আমার কাছে এতটুকু শিক্ষা আপনি পেয়ে থাকেন তবে তার প্রতিদান আমি চাই। এই জালিম শাষকের জুলুমে যদি আমি মারা যাই, আপনি আমার জানাযার নামাযে আসবেন না। আমি আমার নিজেকে আপনার দোয়া থেকে বন্চিত করলাম কারন যে মানুষ জালিম শাষকের জুলুম মাটিতে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে, মহান রাব্বুল আলামীন তার দোয়া কবুল করেন না।
সবশেষে গারুদা বাহিনীর প্রধান:..........
YOU TOO BRUTUS!!!!!!!!!!!!!