15/12/2021
রোমানিয়া, নিভৃতে থাকা ইউরোপের বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের গল্প!
আজ এমন এক দেশ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে, যা অনেকের কাছে ‘কান্ট্রি অব ড্রাকুলা’ কিংবা ভ্যাম্পায়ারের দেশ নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি দেশ, যেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আইন করে কালো জাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিককে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখানকার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষের উদ্যমতায় ওয়েলেসের যুবরাজ হিসেবে পরিচিত চার্লস এতটাই মুগ্ধ যে তিনি মাঝেমধ্যেই বেড়াতে আসেন। দারুণ এবং অদ্ভুত সুন্দর দেশটির নাম রোমানিয়া।
ইউরোপের অনেকের কাছে রোমানিয়া জিপসি অর্থাৎ যাযাবরের দেশ হিসেবেও পরিচিত। তবে ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ভুল। ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তর ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী, যাদের নৃতাত্ত্বিকভাবে রোমা নামে অভিহিত করা হয়, তাদের সঙ্গে রোমানিয়ানদের অনেকে এক করে ফেলে দুটি নামই কাছাকাছি হওয়ার কারণে। রোমানিয়া নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই। কারণ যে কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করেছি, আমার চোখে সেরা হচ্ছে রোমানিয়া। এখানকার সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা, বন্ধুবৎসলতা আর আন্তরিকতা যে কারও মন ভোলাতে বাধ্য। ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিবেচনায় অনেকে রোমানিয়াকে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।
রোমানিয়া শব্দটি এসেছে লাতিন ‘রোমানাস’ থেকে, যার অর্থ ‘সিটিজেনস অব রোম’ বা রোমের অধিবাসী। ১৮৭৭ সালে রোমানিয়া অটোমান শাসকদের হাত থেকে মুক্ত হয় এবং ১৮৮১ সালে ‘কিংডম অব রোমানিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী রোমানিয়ার জনসংখ্যা ১৯ দশমিক ৭১ মিলিয়নের কাছাকাছি, যেখানে এ জনসংখ্যার শতকরা ৯১ ভাগের মতো মানুষ খ্রিষ্টধর্মে (মূলত অর্থোডক্স খ্রিষ্টান) বিশ্বাসী। রোমানিয়ার বেশির ভাগ মানুষই রোমানিয়ান নামক Ethnic গোষ্ঠীর সদস্য। তবে, দেশটিতে হাঙ্গেরিয়ান, জার্মান, রোমা, ইউক্রেনিয়ান এসব Ethnic গোষ্ঠীর মানুষও রয়েছে। শহরাঞ্চলে বসবাস করা মানুষেরা সাধারণত পাশ্চাত্য ভাবধারার পোশাক পরিধান করে থাকেন। তবে গ্রামাঞ্চলের দিকে বসবাস করা মানুষেরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করতে বেশি ভালোবাসে। রোমানিয়ায় মেয়েদের চুল দেখে বলে দেওয়া যায় যে সে বিবাহিত নাকি অবিবাহিত। অবিবাহিত মেয়েরা চুল খোলা রাখতে পছন্দ করে এবং সাধারণত চুলে বেণি গাঁথে। আর বিবাহিত নারীরা মারামা নামক একধরনের কাপড় দিয়ে চুল ঢেকে রাখে।
রোমানিয়ার জাতীয় পতাকার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নীল, হলুদ ও লাল রং আছে, যা ট্রান্সসিলভানিয়া, মলদাভিয়া ও ওয়ালাসিয়া—এ তিনটি ভিন্ন স্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে। এ তিনটি স্থান দেশটির ঐতিহাসিক একতার পরিচয় বহন করে।
রোমানিয়ার রাজধানী এবং বৃহত্তম নগরের নাম বুখারেস্ট, যা দেশটির শিল্প, সাহিত্য, বাণিজ্যসহ যাবতীয় প্রসাশনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার বিবেচনায় বুখারেস্ট ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। রোমানিয়ার সংসদ যা রোমানিয়ার স্থানীয় ভাষায় পার্লামেন্টুল রোমানিয়েই নামে পরিচিত, বুখারেস্টে অবস্থিত। এ পার্লামেন্ট ভবনটি পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম নির্মাণ। এর আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত পেন্টাগনের বিল্ডিং রয়েছে। রোমানিয়ার ন্যাশনাল পার্লামেন্টকে পৃথিবীতে এযাবৎকাল পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে ভারী নির্মাণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্লামেন্ট। অসাধারণ নির্মাণশৈলীর স্থাপত্যকলা, শহরের গঠন এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এর সঙ্গে বিদ্যমান সাহিত্য এবং চিত্রকলার অপরূপ মেলবন্ধনের কারণে বুখারেস্ট পূর্ব ইউরোপের প্যারিস নামেও ডাকা হয়।