23/12/2023
ভ্যাট টিপস-০৯৮/২০২৩
বিষয়: নারী উদ্যোক্তার বাড়ি ভাড়ার ভ্যাট মওকুফ বিষয়ে জটিলতা নিরসণ।
এসআরও নং-১৩৬-আইন/২০২৩/২১৩-মূসক, তারিখ: ২১ মে ২০২৩ এর টেবিল-৪ অনুসারে, নারী উদ্যোক্তা কর্তৃক পরিচালিত ব্যবসার শো-রুমের ভাড়া ভ্যাটমুক্ত। কিন্তু এ বিষয়টা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু প্রশ্ন আসে যার সঠিক উত্তর সাধারণত পাওয়া যায় না। তাই, অনেক নারী উদ্যোক্তা এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না। প্রশ্নগুলো হলো, যদি নারী উদ্যোক্তা পার্টনার হন, অর্থাৎ ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তার অংশ ধরুন ৪০%, ৫০% বা ৬০% হয়, তখন কি ভাড়ার ভ্যাট মওকুফ হবে? আর একটা প্রশ্ন হলো, ব্যবসার শো-রুম বলতে কি বোঝায়? নারী উদ্যোক্তা সেবা প্রদানকারী হলে এই সুবিধা পাবেন কিনা। উল্লেখ্য, ভ্যাট ব্যবস্থায় মূলত উৎপাদনকারী, ট্রেডার এবং সেবা প্রদানকারী এই তিনভাগে উদ্যোক্তাদের বিভক্ত করা হয়েছে। উৎপাদনস্থল ভাড়া নেয়া হলে তা সবার ক্ষেত্রেই ভ্যাটমুক্ত। বাকি থাকে ট্রেডিং এবং সেবা প্রদান। আজ আমরা এ বিষয়টা বিশ্লেষণ করবো, ইন-শা-আল্লাহ।
কাস্টমস আইনের অধীন জেনারেল রুলস ফর ইন্টারপ্রিটেশন (জিআইআর) এ এমন একটা বিধান রয়েছে যে, কোনো পণ্যের বেশিরভাগ অংশ যদি কোনো এক প্রকৃতির হয়, তাহলে সেই পণ্যটা সেই প্রকৃতি অনুসারে শ্রেণীবিন্যাস করতে হবে। ধরুন, একটা কাপড়ের ৭০% কটন আর ৩০% সিনথেটিক। এই কাপড়কে কটনের তৈরি বলে বিবেচনা করতে হবে। তাহলে একটা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ অংশের মালিকানা যদি নারীর হয়, তাহলে স্বাভাবিক যুক্তিতে সেই প্রতিষ্ঠানকে নারী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
কেউ কেউ বলে থাকেন যে, নারী উদ্যোক্তা কর্তৃক পরিচালিত ব্যবসার শো-রুমের ভাড়ার ক্ষেত্রে ভ্যাট মওকুফ করা হয়েছে। তাই, সেবাপ্রদানস্থল হলে ভ্যাট মওকুফ প্রযোজ্য হবে না। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র ট্রেডিং এর শো-রুম হলে ভ্যাট মওকুফ প্রযোজ্য হবে। আমার মতে, এ ধরনের বক্তব্য সঠিক নয়। আমার মতে, এখানে “ব্যবসা” এবং “শো-রুম” শব্দসমূহ সাধারণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ভ্যাট আইনে শো-রুমের সংজ্ঞা নেই। তাই, “শো-রুম” সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হবে। তৃতীয় তফসিলে “ব্যবসায়ী” এর সংজ্ঞা রয়েছে। তবে, আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় সেবার ক্ষেত্রেও শো-রুম হতে পারে। আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় “তৈরি পোশাক বিপণন” হলো একটা সেবা। এই সেবার সংজ্ঞায় উল্লেখ রয়েছে যে, নিজস্ব শো-রুম থেকে বিক্রি করা। অর্থাৎ সেবার ক্ষেত্রেও শো-রুম হতে পারে। শো-রুম এর সাধারণ অর্থ হলে যেখানে কোনো কিছু প্রদর্শণ করা হয় এবং বিক্রি করা হয়। তাই, ব্যবসার শো-রুম বলতে এখানে ট্রেডিং এবং সেবা প্রদান উভয়কে বোঝানো হয়েছে বলে আমার অভিমত।
লেজিসলেটিভ ইনটেনশন বলে একটা কথা আছে। এই বিধান করা হয়েছে মূলত নারীদেরকে সুবিধা দেয়ার জন্য। যেহেতু নারীরা আমাদের সমাজে পিছিয়ে রয়েছে সেহেতু নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। যদি শুধুমাত্র শতভাগ নারীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা না পায়, এবং নারীর শতভাগ মালিকানার শো-রুম ছাড়া এই সুবিধা না পায়, তাহলে এই সুবিধা একেবারেই সীমিত হয়ে যায়। কারণ, শতভাগ নারীর মালিকানায় খুব কম প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে। যদি সেবা প্রদানকারী বাদ দেয়া হয়, তাহলে এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা কোনো সুবিধা হবে না যা ভোগ করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। লেজিসলেটিভ ইনটেনশন এমন হতে পারে না। যদি ৫০% এর বেশি অংশ নারীর মালিকানায় হলে বাড়ি ভাড়া মওকুফের সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে পুরূষেরা নারীর সাথে অংশীদারী কারবার স্থাপন করতে উৎসাহী হবেন। এতে নারীর ক্ষমতায়ন হবে। লেজিসলেটিভ ইনটেনশন সম্ভবত এটা হতে পারে। নারী উদ্যোক্তাগণ সাধারণত বিউটি পার্লার, বুটিক শপ, পোষাক, হস্তশিল্প ইত্যাদি কাজের সাথে জড়িত। এ কাজগুলো ট্রেডিং এবং সেবা প্রদান উভয় ধরনের হয়ে থাকে।
তাই, নারী উদ্যোক্তা কর্তৃক পরিচালিত ব্যবসার শো-রুম বলতে ট্রেডিং প্লেস এবং সেবা প্রদানের স্থান উভয়কে বোঝাবে এবং ৫০% এর বেশি অংশ নারীর মালিকানাধীন হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে নারী উদ্যোক্তা কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে আমার অভিমত। তবে, এ বিষয়ে রেগুলেটরী এজেন্সী যদি অন্যবিধ ব্যাখ্যা বা মতামত প্রদান করে তাহলে তা প্রাধান্য পাবে।
ধন্যবাদ এবং শুভ কামনা।
ড. মোঃ আব্দুর রউফ
ভ্যাট বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষক।