12/05/2026
শিবের বাজার, সিলেট সদরের অন্যতম প্রাচীন ও পরিচিত বাজার। বহু পুরনো এই বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষের জীবন, স্মৃতি আর গল্প। তেমনি এক গল্পের মানুষ ছিলেন সুনামগঞ্জের প্রবাসী সেলিম মিয়া।
বিদেশে দীর্ঘদিন কষ্ট করে টাকা উপার্জন করেছিলেন তিনি। শখের বশে শিবের বাজারের পাশে কয়েক ডেসিমেল জায়গা কিনে একটি সুন্দর একতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রথমদিকে সেই বাড়ি ছিল তার স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচি, চিন্তা আর প্রয়োজন বদলাতে থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তানরাও শহরমুখী হয়ে পড়ে। তারা বাবাকে বলল,
— “গ্রামের পাশে এত দূরে থাকার চেয়ে শহরের প্রাইম এলাকায় একটা বাড়ি কিনি।”
সন্তানদের কথায় সেলিম মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়িটি বিক্রি করবেন।
বাড়ি বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকার পুরনো ধাঁচের কিছু মধ্যস্থতাকারী হাজির হলো। কেউ লুঙ্গি পরে, কেউ পানের রসে লাল দাঁত দেখিয়ে আশ্বাস দিল,
— “চিন্তা করবেন না ভাই, আমরা পার্টি আনতেছি।”
কিন্তু সবার আড়ালে অন্য হিসাব কষছিল পাশের বাড়ির মালিক নজব আলী। বহুদিন ধরেই সে জায়গাটি কম দামে কেনার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু সেলিম মিয়া বাজারমূল্যের নিচে বিক্রি করতে রাজি ছিলেন না।
এরপর শুরু হলো নোংরা খেলা।
যখনই কোনো ক্রেতা আসত, নজব আলী তাদের কানে কানে বলত,
— “এই জায়গার উপর মামলা আছে।”
— “ডকুমেন্ট ঠিক নাই।”
— “ভবিষ্যতে ঝামেলা হবে।”
সবই ছিল মিথ্যা। কিন্তু গ্রামের সহজ-সরল মানুষ ভয় পেয়ে সরে যেত। এভাবে একের পর এক ক্রেতা হাতছাড়া হতে লাগল। দুই বছর চেষ্টা করেও সেলিম মিয়া বাড়িটি বিক্রি করতে পারলেন না।
অবশেষে ভীষণ কষ্ট আর হতাশা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন— এই সম্পদ আর নিজের জন্য রাখবেন না। তিনি বাড়িটি একটি এতিমখানা মাদ্রাসাকে দান করে দিলেন।
লোকজন অবাক হয়ে গেল। কেউ বলল বোকামি, কেউ বলল আবেগ। কিন্তু সেলিম মিয়া শান্ত ছিলেন। অন্তত এতিম শিশুদের কাজে লাগবে— এই ভেবেই তিনি তৃপ্তি পেলেন।
কয়েক মাস যেতে না যেতেই হঠাৎ নজব আলীর বড় ধরনের অসুখ ধরা পড়ল। দেশের চিকিৎসায় কাজ হলো না। তাকে ভারতে নিতে হবে। দ্রুত অনেক টাকার প্রয়োজন।
বাজারের পাশেই তার আরেকটি মূল্যবান জায়গা ছিল। সেটি বিক্রি করার ঘোষণা দিতেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস শুরু হলো।
তার নিজের ভাতিজাই ক্রেতাদের কাছে নানা অপপ্রচার শুরু করল।
— “এই জায়গায় আগে দেওয়ের মেলা বসত।”
— “দক্ষিণ এশিয়ার ভূত ফেরতের মেলা ছিল এখানে।”
— “এই জায়গা অশুভ, তাই এতদিন খালি পড়ে আছে।”
মানুষ ভয় পেতে লাগল। ক্রেতারা ফিরে যেতে লাগল।
ভাতিজার আসল উদ্দেশ্য ছিল জায়গাটি কম দামে নিজের নামে নেওয়া। ২০ লাখ টাকার জায়গা সে ১০ লাখ টাকায় নিতে চাইল, তাও আবার কিস্তিতে।
অসহায় নজব আলী শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ১২ লাখ টাকায় জায়গাটি ভাতিজার নামে রেজিস্ট্রি করে দিল। এককালীন মাত্র ৮ লাখ টাকা পেল, বাকিটা কিস্তিতে দেওয়ার কথা।
যে মানুষ একদিন অন্যের সম্পদ বিক্রি বন্ধ করতে মিথ্যা গল্প ছড়িয়েছিল, ভাগ্য যেন তাকেই একই আয়নায় দাঁড় করাল। নিজের জীবনে সে একই প্রতারণার স্বাদ পেল।
পরে অনেক চিকিৎসা হলো, অনেক চেষ্টা হলো। কিন্তু টাকার অভাব, মানসিক কষ্ট আর অসহায়তার ভার শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচতে দিল না। একসময় নজব আলী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
শিক্ষা:
মানুষের ক্ষতি করার জন্য মিথ্যা, ষড়যন্ত্র আর লোভ কখনো স্থায়ী লাভ এনে দেয় না। অন্যের পথে কাঁটা বিছালে একদিন সেই কাঁটা নিজের পথেই ফিরে আসে। পৃথিবীতে বিচার সবসময় আদালতে হয় না— অনেক বিচার মানুষের জীবনেই ফিরে আসে।