20/05/2026
সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রমন, নেই আইনী সুরক্ষা।
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্ট ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করার মতো মানহানীসহ নানা অপরাধের বিরুদ্ধে দেশে কোনো বিদ্ধমান আইন নেই।
নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়া যেকোনো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সোশ্যাল মিডিয়া এখন পারস্পরিক যোগাযোগের চেয়ে অন্যকে নোংরা, কুৎসিত এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করে ঘায়েল করার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এখানে একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষের প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন মানুষের চরিত্র হরণ ব্ল্যাকমেল করে চাঁদাবাজি করা।
নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আজ নাগরিক জীবন বিপন্ন। মানুষ আতঙ্কিত। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নোংরা আক্রমণের শিকার হয়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।
বহু সংসার ভেঙে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে। ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কে। গোটা সমাজে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য ও অরাজকতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে। এসব আইনের মাধ্যমে ওইসব দেশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে কোনো কার্যকর আইন নেই। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস করে। কিন্তু এই আইনটি অসম্পূর্ণ। ফলে সাইবার অপরাধীরা আরো দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে। তারা এখন বাধাহীনভাবে মানুষের চরিত্রহননের খেলায় মেতে উঠেছে।
বাংলাদেশে সাইবার স্পেসে স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। বিশেষ করে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে নাগরিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এ আইনে।
ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। অপপ্রয়োগের কারণে এটি একটি বিতর্কিত আইন হিসেবে পরিচিতি পায়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে সরকার সাইবার সিকিউরিটি আইন চালু করে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে পূর্বের আইনের ধারা ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪ বাদ করায় এ আইনে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়েছে।
এই আইনে একজন ব্যক্তিকে বিরামহীনভাবে সাইবার বুলিং করলে কোনো শাস্তি নেই। এআই দিয়ে কারো ছবির সঙ্গে অন্যের ছবি যুক্ত করে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নেই। আইনে একজন ব্যবসায়ীর সুনাম নষ্ট করে মিথ্যা প্রচার করলে তার আইনি প্রতিকার নেই। একজন নারীকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষকে কিছু সাইবার অপরাধীর কাছে জিম্মি করেছেন। এখন সাইবার অপরাধে বিচার নাই। সাইবার সন্ত্রাসীরা আইনের ঊর্ধ্বে।
এক শ্রেনীর সাইবার সন্ত্রাস ভূয়া আইডি তৈর করে প্রতিনিয়ত সম্মানীত নাগরিকদের সোশ্যাল মিডিয়া তাদের ইচ্ছা মতো হেনস্থা করছে, যার প্রতিক্রিয়া পড়ছে জনজীবনে, অতছ তারা ধরা ছোয়ার বাহিরে। থানায় জিডি করেও আইনগত সুরক্ষা বা প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছেনা। বিদ্যমান আইন না থাকার কারনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করাও সম্ভব হচ্ছেনা। নিয়মিত ভিকটিমরা যোগাযোগ করলেও তাদেরকে আইনী পরামর্শ প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। একজন আইনজীবী হয়ে লজ্জাবোধ হচ্ছে।
যার মনে যা চাহিবে লিখবে মানুষকে হয়রানী করবে এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারেনা, গঠনমুলক সমালোচনা করতে বাধা নেই কিন্তু মানহানী, মিথ্যাচার, নোংরামি করা একটি অপরাধ। ইসলাম বা অন্য ধর্মেও গীবতের বিরুদ্ধে বিধান আছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব অবিলম্বে জনগণের সাইবার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করনের লক্ষ্য আইন সংশোধন করা। না হলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারও এদের হাত থেকে রেহাই পাবে না।
এড. নিয়ামুল হক
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মৌলভীবাজার।