01/07/2026
মৃত ব্যক্তির নামে মোকাদ্দমা দায়ের করে পরবর্তীতে ওয়ারিশদের পক্ষভুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই
লাহোর হাইকোর্টের Civil Revision No.6103 of 2024 মামলার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি পর্যালোচনা:
দেওয়ানি কার্যবিধির সঠিক প্রয়োগ এবং আদালতের একতিয়ারের প্রশ্নে একটি মামলা কতখানি আইনসিদ্ধ হতে পারে, তা নিয়ে সম্প্রতি লাহোর হাইকোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছে। Civil Revision No.6103 of 2024 মামলাটিতে মাননীয় বিচারপতি মুহাম্মদ সাজিদ মেহমুদ সেঠি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার কোনো আইনি অস্তিত্ব থাকে না এবং পরবর্তীতে সংশোধনীর মাধ্যমেও এটিকে জীবিত করা সম্ভব নয়। রায়ের শেষে আদালত এটিকে আইনগত নজির হিসেবে প্রকাশের যোগ্য বা "Approved for Reporting" হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
নিচে মামলার পটভূমি, পক্ষসমূহের আইনি লড়াই, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. মামলার প্রাথমিক পরিচিতি:
আদালতের নাম: লাহোর হাইকোর্ট, লাহোর (বিচার বিভাগ)।
মামলা নম্বর: Civil Revision No.6103 of 2024।
শুনানির তারিখ: ২২ জুন, ২০২৬।
আবেদনকারী: আব্দুল আজিজ (মৃত) তাঁর বৈধ ওয়ারিশগণের মাধ্যমে।
প্রতিপক্ষ: মোসাম্মত আয়েশা বিবি এবং অন্যান্য।
২. ঘটনার কালপঞ্জি ও মামলার প্রেক্ষাপট:
মামলাটির গভীরতা এবং আইনগত জটিলতা বুঝতে এর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও ঘটনাপ্রবাহ জানা আবশ্যক:
১০ই ডিসেম্বর, ১৯৮৮: একটি কথিত জমি বিক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হয়, যেখানে দাবি করা হয় আব্দুল আজিজ প্রতিপক্ষের (বাদীদের) অনুকূলে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে সম্মত হয়েছিলেন।
০৬ই ডিসেম্বর, ১৯৮৯: চুক্তি সম্পাদনের মাত্র এক বছরের মাথায় মূল বিবাদী আব্দুল আজিজ মৃত্যুবরণ করেন।
০২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬: আব্দুল আজিজের মৃত্যুর দীর্ঘ ৭ বছর পর, প্রতিপক্ষ/বাদীরা দেওয়ানি আদালতে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মাধ্যমে স্বত্ব ও দখল পাওয়ার দাবি জানিয়ে মামলা দায়ের করেন।
মামলার মধ্যবর্তী পর্যায়: মামলার কার্যধারা চলাকালীন বাদীরা জানতে পারেন যে আব্দুল আজিজ অনেক আগেই মারা গেছেন। ফলশ্রুতিতে, বাদীরা দেওয়ানি আদালতে আবেদন করে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের মামলায় পক্ষভুক্ত করেন।
নিম্ন আদালতের রায়: নিম্ন আদালত এবং পরবর্তীতে আপিল আদালত (অতিরিক্ত জেলা জজ) ০৫ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে বাদীদের পক্ষে ডিক্রি জারি করেন এবং রায় বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে ওয়ারিশগণ হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন দায়ের করেন।
৩. পক্ষসমূহের আইনি লড়াই ও যুক্তি:
আবেদনকারী (ওয়ারিশগণ)-র পক্ষে যুক্তি:
আবেদনকারীদের পক্ষে বিজ্ঞ কৌশলী অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি দেখান যে, সমগ্র মামলাটি শুরু থেকেই আইনগতভাবে অবৈধ ছিল। কারণ একজন মৃত ব্যক্তির কোনো আইনি ব্যক্তিত্ব বা দেওয়ানি অস্তিত্ব থাকে না, ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আইনি কার্যধারা শুরু করা যায় না। একক বিবাদী যদি মামলা দায়েরের পূর্বেই মারা যান, তবে আদালতের সামনে কোনো বৈধ বিরোধ বা নালিশ সৃষ্টি হয় না। সুতরাং, পরবর্তীতে ওয়ারিশদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এই মূলগত আইনি ত্রুটি কোনোভাবেই নিরাময় বা সংশোধন করা সম্ভব নয়।
প্রতিপক্ষ (বাদীগণ)-র পক্ষে যুক্তি:
প্রতিপক্ষের বিজ্ঞ কৌশলী নিম্ন আদালতের রায়কে সমর্থন করে যুক্তি দেন যে, মামলা দায়েরের সময় বাদীরা আব্দুল আজিজের মৃত্যুর বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। যখনই তারা বিষয়টি জানতে পারেন, তখনই সৎ উদ্দেশ্যে মৃত ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশদের মামলায় পক্ষভুক্ত করার আবেদন জানান। বাদীরা তাঁদের এই যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে ভারতের পাটনা হাইকোর্টের একটি পুরোনো নজির (AIR 1961 PATNA 480) উপস্থাপন করেন।
৪. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি নীতি বিশ্লেষণ:
উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে মাননীয় বিচারপতি মামলাটির গুণাগুণ পর্যালোচনার পূর্বে এর ভিত্তিমূলক আইনি প্রশ্নটি নির্ধারণ করেন: "একক বিবাদীর মৃত্যুর পর তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা আইনগতভাবে চলতে পারে কি না এবং পরবর্তী সময়ে ওয়ারিশদের পক্ষভুক্ত করে এই ত্রুটি দূর করা যায় কি না?"
আদালত তাঁর রায়ে নিম্নলিখিত যুগান্তকারী আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন:
মৃত ব্যক্তির বিচারিক অক্ষমতা: আইন কেবল জীবিত প্রাকৃতিক ব্যক্তি বা আইনগত সত্ত্বাকেই চেনে, যারা মামলা করতে পারে বা যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। মৃত ব্যক্তির বিচারিক কার্যধারায় অংশ নেওয়ার বা বিবাদী হওয়ার কোনো দেওয়ানি অস্তিত্বই থাকে না।
অজ্ঞতা একতিয়ার তৈরি করতে পারে না:
নিম্ন আদালতের এই যুক্তি হাইকোর্ট সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন যে— বাদীরা মৃত্যুর বিষয়ে জানতেন না বিধায় ওয়ারিশদের পক্ষভুক্তিতে ত্রুটি দূর হয়েছে। আদালত বলেন, আদালতের একতিয়ার কোনো পক্ষের ব্যক্তিগত অজ্ঞতার দ্বারা তৈরি হতে পারে না। মামলা দায়েরের তারিখের বস্তুনিষ্ঠ সত্যটিই এখানে বিচার্য, আর সত্য হলো বিবাদী তখন জীবিত ছিলেন না।
Order I Rule 10 এবং Order XXII-এর অপপ্রয়োগ:
আদালত স্পষ্ট করেন যে, দেওয়ানি কার্যবিধির এই বিধানগুলো কেবল তখনই প্রযোজ্য হয় যখন একটি বৈধভাবে দায়েরকৃত মামলা ইতিমধ্যেই আদালতে বিচারাধীন থাকে এবং সচল মামলার কোনো পক্ষ চলাকালীন অবস্থায় মারা যান। যে মামলা শুরু থেকেই মৃত বা অস্তিত্বহীন, সেখানে সংশোধন বা পক্ষান্তরের মাধ্যমে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করা আইনিভাবে অসম্ভব।
৫. উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নজিরসমূহ:
হাইকোর্ট তাঁর সিদ্ধান্তকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সুপ্রিম কোর্ট ও উচ্চ আদালতের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক আইনি নজিরের ওপর নির্ভর করেছেন:
1. 2001 SCMR 1 (Hafiz Brothers (Pvt.) Ltd. v. Pakistan Industrial Credit and Investment Corporation Ltd.)
মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার কার্যধারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
2. 2013 SCMR 464 (Muhammad Yar (deceased) through L.Rs. and others v. Muhammad Amin (deceased) through L.Rs. and others): সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট রায় দিয়েছিলেন যে, মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা আইনগতভাবে শূন্য এবং একে পুনরুজ্জীবিত করা যায় না।
3. PLD 2007 Lahore 180 (Ch. Muhammad Tufail Khan alias Tufaul Muhammad through Legal Representatives v. Zari Taraqiati Bank Limited through Branch Manager):
এই মামলায় বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বাদীর একমাত্র আইনি উপায় হলো তামাদি বা সীমাবদ্ধতা আইনের অধীনে ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে নতুন করে মোকাদ্দমা দায়ের করা। তবে এই নতুন মামলার ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের পক্ষে সমস্ত আইনগত প্রতিরক্ষা এবং তামাদির আর্গুমেন্ট উন্মুক্ত থাকবে।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও রায়:
লাহোর হাইকোর্ট সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, নিম্ন আদালতসমূহ একতিয়ারসংক্রান্ত এই মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষা করে মামলার গুণাগুণে প্রবেশ করেছেন, যা আইনগতভাবে মারাত্মক ত্রুটি।
আদালতের চূড়ান্ত আদেশ:
ক) দেওয়ানি রিভিশন আবেদনটি মঞ্জুর করা হলো।
খ) নিম্ন আদালত এবং আপিল আদালতের প্রদত্ত সমস্ত রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হলো।
গ) প্রতিপক্ষ/বাদীগণের মূল মোকাদ্দমাটি শুরু থেকেই আইনগতভাবে অক্ষম ও অচল হওয়ায় সম্পূর্ণভাবে খারিজ করা হলো।
ঙ) মামলার খরচ বাবদ কোনো পক্ষকে কোনো আর্থিক আদেশ দেওয়া হয়নি।
এই রায়টি দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মামলার বাদীকে অবশ্যই মোকাদ্দমা দায়েরের দিন বিবাদীর জীবিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যা শুরু থেকেই শূন্য বা আইনগতভাবে মৃত, আদালত বা কোনো পক্ষান্তরের আবেদন তাকে কখনোই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে না।