18/05/2026
প্রতিষ্ঠিত মেয়ে কি বেকার ছেলেকে বিয়ে করতে পারেন?
সমাজের দ্বিচারিতা, পিতৃতন্ত্রের শেকড় এবং বদলে যাওয়া বাংলাদেশের আলোকে একটি সত্যিকারের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের বিবাহ-বাজারে একটি পুরনো, কিন্তু অলিখিত নিয়ম চলে আসছে যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত পুরুষ বেকার নারীকে বিয়ে করেন, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত নারী যদি বেকার পুরুষকে বিয়ে করতে চান, তখন পরিবার থেকে সমাজ সবার ভ্রু কুঁচকে যায়। এই অসামঞ্জস্যটি কেন? এর পেছনে কি কেবল সংস্কার, নাকি আছে গভীরতর কাঠামোগত কারণ?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। পোশাক শিল্প থেকে ব্যাংকিং, সরকারি চাকরি থেকে শিক্ষকতা নারীরা আজ প্রতিটি সেক্টরে পুরুষের পাশাপাশি এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে।
২০২৪ সালের PSC পরীক্ষায় শীর্ষস্থানীয়দের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন নারী। অথচ বিয়ের প্রশ্নে সেই একই সমাজ এখনও বলে, "মেয়ে উপার্জনশীল হলেও স্বামীকে আরও বেশি উপার্জনশীল হতে হবে।"
এই মানসিকতার শিকড় বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো এবং ধর্মীয়-সামাজিক রীতিনীতির গভীরে প্রোথিত। ইসলামিক দৃষ্টিকোণে পুরুষকে পরিবারের "কওয়াম" বা অভিভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা অনেকে "উপার্জনকারী পুরুষ" হিসেবে সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেন। হিন্দু সম্প্রদায়েও পণপ্রথা ও পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকার আইন একই মানসিকতা দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
"যে সমাজ একজন পুরুষকে তার স্ত্রীর সাফল্যে গর্বিত হতে শেখায়নি, সে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকেও সম্পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়নি।"
• ৫৮% শিক্ষিত নারী মনে করেন বিয়েতে পুরুষের আয় বেশি হওয়া জরুরি
(BRAC গবেষণা, ২০২৩)
• ৭২% পরিবার বেকার বরকে প্রত্যাখ্যান করে যদি কনে উপার্জনশীল হন
(Prothom Alo জরিপ, ২০২৪)
• ৩৩% নগরকেন্দ্রিক তরুণী বলেন, আয়ের বৈষম্য বিয়েতে সমস্যা নয়
(UNFPA Bangladesh, ২০২৫)
পক্ষের যুক্তি:
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে "প্রতিষ্ঠিত মেয়ে বেকার ছেলেকে বিয়ে করতে পারবেন" — এই অবস্থানের পক্ষে একাধিক শক্তিশালী যুক্তি বিদ্যমান।
সমতার যুক্তি:
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বিবাহের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত — এটি সাংবিধানিক সাম্যের দাবি।
সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে, যার মধ্যে বিবাহের সিদ্ধান্তও অন্তর্ভুক্ত।
পুরুষের বেকারত্ব সাময়িক:
একজন মেধাবী ও সৎ মানুষ পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন।
পারস্পরিক পরিপূরকতা:
পরিবার একটি অংশীদারিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান — এক পক্ষ উপার্জন করলে, অন্য পক্ষ গৃহস্থালি, সন্তান প্রতিপালন ও মানসিক সহায়তায় অবদান রাখতে পারেন।
উন্নত দেশগুলোতে "হাউসব্যান্ড" বা গৃহস্থালিতে নিয়োজিত পুরুষ একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক ভূমিকা।
গবেষণা দেখায়, সংসারে কে বেশি উপার্জন করেন তার চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া বৈবাহিক সুখের বড় নিয়ামক।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা:
বেকারত্ব কোনো চরিত্রের দোষ নয়; এটি কাঠামোগত সমস্যা। বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক।
উপার্জনকারী নারী পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে পারেন, যা সামগ্রিকভাবে পরিবারের জন্য মঙ্গলজনক।
সামাজিক পরিবর্তনের ধারা:
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের নগর-শিক্ষিত মধ্যবিত্তে এই প্রবণতা ধীরে হলেও বাড়ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশি নারী উপার্জনকারী এবং তাদের পরিবার দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে এই মানসিকতার নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন।
বিপক্ষের যুক্তি:
তবে এই প্রশ্নের অপর পিঠেও রয়েছে বাস্তবতার কঠিন পাথর — যা সহজে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
সামাজিক কাঠামো ও চাপ:
বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজে স্ত্রীর চেয়ে কম উপার্জনকারী স্বামী এখনও "অপদার্থ" হিসেবে চিহ্নিত হন এই সামাজিক কলঙ্ক দাম্পত্য জীবনে মারাত্মক চাপ তৈরি করে।
পরিবার ও প্রতিবেশীর নিরন্তর মন্তব্য নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নিরাপত্তার প্রশ্ন।
বাংলাদেশে নারীর সম্পত্তি ও আয়ের আইনি সুরক্ষা এখনও যথেষ্ট মজবুত নয়। উপার্জনকারী নারী অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার ফাঁদে পড়তে পারেন।
বেকার পুরুষের আত্মসম্মানবোধ ক্ষুণ্ণ হলে গৃহহিংসার ঝুঁকি বাড়তে পারে — মানুষ পরিবর্তন ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এই শঙ্কা উঠে এসেছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী স্বামীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবাহের একটি শর্ত হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে স্বীকৃত।
সনাতন ধর্মীয় রীতিতেও পুরুষের গৃহস্বামী ভূমিকাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
দীর্ঘমেয়াদী বৈষম্যের ঝুঁকি:
উপার্জনের পার্থক্য যদি সিদ্ধান্তগ্রহণে ক্ষমতার পার্থক্যে পরিণত হয়, তাহলে বৈবাহিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
"পুরুষ হয়ে বসে থাকা" নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হীনমন্যতাবোধ সম্পর্কে বিষ ঢালতে পারে।
গভীর বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট:
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আলোকে এই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীরা সম্মুখসারিতে থেকে যে সাহস দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে বাংলাদেশের নারী আর "রক্ষণীয় সম্পদ" নন, তিনি "পরিবর্তনের কারিগর।" অথচ সেই একই নারীকে বিয়ের বাজারে এখনও "উপযুক্ত পুরুষের অপেক্ষায়" থাকতে হয়।
শ্রমবাজারের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (BIDS) তথ্যমতে,
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১২%-এরও বেশি। এই বাস্তবতায় "প্রতিষ্ঠিত পুরুষ" খোঁজার সংকীর্ণ মানদণ্ড নারীর বিবাহযোগ্য বয়সকে অনর্থক দীর্ঘায়িত করছে, যা একটি পৃথক সামাজিক সংকট।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. নাজনীন আক্তার একটি গবেষণায় উল্লেখ করেন "পুরুষের আর্থিক শ্রেষ্ঠত্বের উপর নির্মিত বিবাহ-কাঠামো নারীর শিক্ষাগত ও পেশাদার অগ্রগতির বিপরীত একটি শক্তি হিসেবে কাজ করছে।"
তাঁর পর্যবেক্ষণ: শহরের তরুণীরা বিয়ে পিছিয়ে দিচ্ছেন, কারণ "উপযুক্ত পাত্র" পাওয়া যাচ্ছে না — অথচ তাদের আশেপাশে মেধাবী, সৎ, কিন্তু বেকার তরুণের কমতি নেই।
তথ্যসূত্র:
✓Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) — Labour Force Survey 2023-24
✓BIDS (Bangladesh Institute of Development Studies) — Youth Unemployment Report, 2024
✓BRAC Institute of Governance and Development — Gender Norms in Marriage, 2023
✓UNFPA Bangladesh — Young Women's Agency Survey, 2025
✓Prothom Alo জরিপ — "বিবাহ ও নারীর পেশা," জানুয়ারি ২০২৪
✓Dr. Nazneen Akhtar, RU — "Marriage Market and Female Education," Journal of Social Science Bangladesh, Vol. 12,
2024
✓Manusher Jonno Foundation — Domestic Violence & Economic Dependency Report, 2024
✓বাংলাদেশ সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২৮(২): নারী-পুরুষ সমান অধিকার।
প্রতিষ্ঠিত মেয়ে বেকার ছেলেকে বিয়ে করতে পারবেন কি না — এটি আসলে একটি আইনি বা ধর্মীয় প্রশ্ন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন। এই পুনর্নির্মাণ শুরু হতে হবে পরিবার থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যম থেকে। ছেলেকে শেখাতে হবে; তোমার স্ত্রীর সাফল্য তোমার পরাজয় নয়, বরং তোমার সংসারের শক্তি। মেয়েকে শেখাতে হবে — তোমার উপার্জনের ক্ষমতা তোমার বিয়ের বাধা নয়, তোমার গর্বের বিষয়। এবং সমাজকে শিখতে হবে — একটি পরিবারের মাপকাঠি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ — শুধু পুরুষের ব্যাংক ব্যালেন্স নয়।
লেখক:
বোরহান উদ্দিন খান শাকের
এলএলবি (অনার্স), এল এল এম
এডভোকেট
ইমেইল: [email protected]