14/04/2026
অনেকদিন আইনের একাডেমিক চর্চা করা হয়না। বিজ্ঞ আইনজীবী আমার সবচাইতে ব্রিলিয়ান্ট এসোসিয়েট আহাদের সাথে কথা প্রসঙ্গে মনে হলো এই বিষয়টি নিয়ে একটু লেখাপড়া করা দরকার আর তাই এই লেখার অবতারনা।
বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা:
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আইনি ভিত্তি এবং ন্যায়সংগত বিচারিক পদক্ষেপ
লেখক- এম এম নুরুজ্জামান
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Zaman Fouzia Legal Associates
Meherba Plaza
33 Topkhana Rd Suite 8 D E
Writ Petition 10356/2024
মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ
রায়ের তারিখ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৪ সালের Writ Petition 10356/2024-এ প্রদত্ত রায়ে সরকারকে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনাকে কেউ কেউ বিচারিক সীমালঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই গবেষণাপত্রে আমরা সেই সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করব যে, হাইকোর্ট বিভাগের এই নির্দেশনা শুধু আইনসম্মত নয়, বরং সংবিধানের ২২, ১০৭, ১০৯, ১১২ ও পুনরুজ্জীবিত ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে এটি সাংবিধানিকভাবে অপরিহার্য।
এই গবেষণাপত্র দেখাবে যে — মাসদার হোসেন মামলার (৫২ ডিএলআর এডি ৮২) অনুসরণে, সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের পৃথক সচিবালয়ের সাথে কাঠামোগত সমতার দাবিতে, তুলনামূলক সাংবিধানিক আইনের আলোকে, এবং জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী — এই নির্দেশনা নিছক একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি সংবিধানের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতার বাস্তব প্রতিফলন।
এক. ভূমিকা: যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ তার ঐতিহাসিক রায়ে যে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন, তার মধ্যে পৃথক বিচারিক সচিবালয় স্থাপনের নির্দেশনাটি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। একাধিক আইনজীবী ও বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন যে এই নির্দেশনা সংবিধানের সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের মূল বক্তব্য হলো — সচিবালয় প্রতিষ্ঠা একটি নীতি-নির্ধারণী বিষয়, যা সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত; আদালত এক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন না।
এই লেখা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। আমাদের মূল যুক্তি পাঁচটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে:
(ক) সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার ইতিবাচক দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করেছে — আর একটি স্বাধীন সচিবালয় সেই বিচ্ছেদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ;
(খ) ১১২ অনুচ্ছেদ সমস্ত নির্বাহী কর্তৃপক্ষকে সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় কাজ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে — এবং সেই বাধ্যবাধকতার বারো বছরের অমান্য আদালতকে বাধ্য করেছে হস্তক্ষেপ করতে;
(গ) মাসদার হোসেন মামলা ইতোমধ্যে বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে — এই নির্দেশনা সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন মাত্র;
(ঘ) সংসদ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাহী বিভাগ — প্রতিটি সাংবিধানিক অঙ্গের নিজস্ব স্বাধীন সচিবালয় রয়েছে; বিচার বিভাগকে তা থেকে বঞ্চিত রাখা সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী; এবং
(ঙ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই আদালতে স্বীকার করেছেন যে এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের কোনো আপত্তি নেই।
এই পটভূমিতে 'বিচারিক অতিক্রমণ'-এর অভিযোগটি শুধু আইনিভাবে অসার নয়, বাস্তবের সঙ্গেও সংগতিহীন।
দুই. নির্দেশনার পাঠ ও প্রেক্ষাপট
রায়ের মূল নির্দেশের (ঘ) অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন:
"(d) Furthermore, the respondent Nos. 1-3 are hereby directed to establish an Independent Separate Secretariat for the Supreme Court of Bangladesh as proposed by the Supreme Court authority, within 03 (three) months from date." — W.P. No. 10356 of 2024, Judgment dated 02.09.2025, per Ahmed Sohel J & Debasish Roy Chowdhury J
এই নির্দেশনা শূন্য থেকে উদ্ভূত হয়নি। রেকর্ডে যে তথ্যচিত্র রয়েছে তা উদ্বেগজনক:
প্রথমত, ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই একটি পৃথক সচিবালয় স্থাপনের সংকল্প গ্রহণ করে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায়। কোনো সাড়া মেলেনি।
দ্বিতীয়ত, একই বছরের ২৩ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মুজাম্মেল হোসেন সারক ভবনে একটি নামফলক উন্মোচন করে সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন এবং দুটি ভবন নির্বাচন করেন। কিন্তু ২০১৮ সালে সেই নামফলক অজ্ঞাত কারণে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং উদ্যোগটি থেমে যায়।
তৃতীয়ত, ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা নিশ্চিত করে যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাহী বিভাগ নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
চতুর্থত — এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে — আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল সরাসরি বলেছেন যে এই সচিবালয় স্থাপনে সরকারের কোনো আপত্তি নেই।
এই প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশনা কোনো অপ্রত্যাশিত বিচারিক হস্তক্ষেপ নয় — এটি বারো বছরের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে একটি সাংবিধানিক প্রতিক্রিয়া।
তিন. নির্দেশনার সাংবিধানিক ভিত্তি
৩.১ অনুচ্ছেদ ২২ — বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
"The State shall ensure the separation of the judiciary from the executive organs of the State." — Article 22, Constitution of the People's Republic of Bangladesh, 1972
এই বিধানটি কোনো ইচ্ছামূলক পরামর্শ নয়। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত এই মূলনীতিটি ৮(২) অনুচ্ছেদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি এবং আইন প্রণয়নে এটি অনুসরণ করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
প্রশ্ন হলো — বিচার বিভাগ কি আদৌ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হতে পারে যদি তার পুরো প্রশাসনিক যন্ত্রপাতি — কর্মীনিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ, নীতি প্রণয়ন, অবকাঠামো — আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়? একটি নির্বাহী মন্ত্রণালয়ের ছায়ায় থেকে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাজ চালানো মানে পৃথকীকরণ কেবল কাগজে থাকা — বাস্তবে নয়।
হাইকোর্ট বিভাগ ঠিকই চিহ্নিত করেছেন যে বর্তমান 'দ্বৈত প্রশাসন ব্যবস্থা' — যেখানে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় একসঙ্গে অধস্তন বিচার বিভাগের উপর কর্তৃত্ব ভাগ করে নিচ্ছে — সেটি ঠিক ২২ অনুচ্ছেদের যা ভেঙে দেওয়ার কথা। একটি স্বাধীন সচিবালয় সেই ভাঙনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদন।
৩.২ অনুচ্ছেদ ১০৭ — সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব প্রশাসনিক কর্তৃত্ব
সংবিধানের ১০৭(১) অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টকে তার নিজের কার্যবিধি এবং অধীনস্থ আদালতের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। ১০৭(২) অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টকে তার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদ সংক্রান্ত বিধি তৈরির অধিকারও দিয়েছে।
এই বিধান সুপ্রিম কোর্টকে একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যার নিজস্ব প্রশাসনিক কর্তৃত্ব রয়েছে। এই কর্তৃত্ব প্রয়োগের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো প্রয়োজন — অর্থাৎ একটি সচিবালয় — তা ১০৭ অনুচ্ছেদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। অধিকার থাকলে তা প্রয়োগের সুযোগও থাকতে হবে — এটি আইনের প্রাথমিক নীতি।
৩.৩ অনুচ্ছেদ ১০৯ — তত্ত্বাবধান ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ
সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে তার অধস্তন সমস্ত আদালত ও ট্রাইব্যুনালের উপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে। আপিল বিভাগ বাংলাদেশ বনাম আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী, ৭৭ ডিএলআর (এডি) ১৩৪ (২০২৫) মামলায় এই ক্ষমতাকে বিচারিক ও প্রশাসনিক উভয় অর্থেই ব্যাপক বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার রেকর্ড যদি আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকে, তাহলে ১০৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা প্রয়োগ কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি স্বাধীন সচিবালয় হলো সেই কাঠামোগত পূর্বশর্ত যা ছাড়া ১০৯ অনুচ্ছেদের তত্ত্বাবধান ক্ষমতা পূর্ণরূপে কার্যকর হতে পারে না।
৩.৪ অনুচ্ছেদ ১১২ — নির্বাহী বিভাগের বাধ্যতামূলক সহায়তার দায়িত্ব
সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
"All executive and judicial authorities in the Republic shall act in aid of the Supreme Court." — Article 112, Constitution of the People's Republic of Bangladesh, 1972
এই অনুচ্ছেদটি শুধু একটি সদিচ্ছার প্রকাশ নয় — এটি একটি আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য ইতিবাচক দায়িত্ব। আপিল বিভাগ মো. নুরুন নবী ভূঁইয়া বনাম মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, ২১ এডিসি ৭৬১ (২০২৪) মামলায় নিশ্চিত করেছেন:
"In aid of all its powers given under the constitution, in order to ensure the authoritative status of the Supreme Court, the Constitution provides in Article 112 that all authorities - executive and judicial in the Republic shall act in aid of the Supreme Court." — Md. Nurun Nabi Bhuiya v. Md. Abdullah Al Masud, 21 ADC 761 (2024), Appellate Division
এখন চিন্তা করুন: সুপ্রিম কোর্ট নিজে ২০১২ সালে সংকল্প নিয়েছে, চিঠি পাঠিয়েছে, উদ্বোধন করেছে — এবং তারপর বারো বছর ধরে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এটি কি ১১২ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন নয়? নির্বাহী কর্তৃপক্ষ যখন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন আদালত সেই বাধ্যবাধকতা কার্যকর করার নির্দেশ দিতে পারেন। এটি সক্রিয়তাবাদ নয় — এটি সংবিধান প্রয়োগ।
তিন মাসের সময়সীমা দেওয়ার অর্থ হলো ২০১২-২০২৫-এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা। এটি একটি সমানুপাতিক প্রয়োগ কৌশল — বিচারিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার নয়।
৩.৫ পুনরুজ্জীবিত ১১৬ অনুচ্ছেদ — কর্তৃত্ব সুপ্রিম কোর্টে
হাইকোর্ট বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের নির্দেশনা তার প্রাথমিক রায়ের অনিবার্য পরিণতি। পুনরুজ্জীবিত ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন বিচারিক কর্মকর্তাদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে। তাহলে সেই কর্তৃত্ব প্রয়োগের জন্য প্রশাসনিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে সুপ্রিম কোর্টেরই অধীনে। আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই কর্তৃত্ব প্রয়োগ সাংবিধানিকভাবে অসংগত।
সহজ কথায়: ক্ষমতা যেখানে অর্পিত হয়, প্রশাসনিক কাঠামোও সেখানে থাকা উচিত। পৃথক সচিবালয় হলো সেই কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন।
চার. মাসদার হোসেন মামলা — অপূর্ণ নির্দেশনার পরিণতি
এই আলোচনার কেন্দ্রীয় নজির হলো বাংলাদেশ ও অন্যান্য বনাম মাসদার হোসেন ও অন্যান্য — ৫২ ডিএলআর (এডি) ৮২। এটি বাংলাদেশে বিচারিক স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর রায়। আপিল বিভাগ সেই মামলায় ঘোষণা করেছিলেন:
"It is declared that the judicial service is a service of the Republic within the meaning of Article 152(1) of the Constitution, but it is functionally and structurally distinct and separate from the civil executive and administrative services of the Republic and cannot be amalgamated, abolished, replaced, mixed up or tied together with such services." — Bangladesh & Others v. Masdar Hossain & Others, 52 DLR (AD) 82, Appellate Division
এই ঘোষণা অস্পষ্ট নয়, অষ্পষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। বিচারিক বিভাগ কাঠামোগতভাবে আলাদা — নির্বাহী সেবার সঙ্গে 'মিশ্রিত' করা যাবে না।
অথচ মাসদার হোসেন মামলার পরের পঁচিশ বছরেও অধস্তন বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাজ আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চলছে। বিচারকদের সার্ভিস রেকর্ড, পদায়নের নথি, বেতন ও অবকাঠামো — সব কিছুতেই নির্বাহী মন্ত্রণালয়ের ছায়া। মাসদার হোসেন মামলার ঘোষণা কাগজে জীবিত, বাস্তবে মৃতপ্রায়।
হাইকোর্ট বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের নির্দেশনা এই মৃতপ্রায় ঘোষণাকে জীবন্ত করার পদক্ষেপ। এটি নতুন কোনো বিচারিক আবিষ্কার নয়। এটি আপিল বিভাগের নিজের নির্দেশনার বাস্তবায়ন — যা ক্রমাগত উপেক্ষিত হয়ে আসছিল।
সমালোচকরা বলছেন 'আদালত প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন না' — কিন্তু এখানে কাঠামো নির্মাণ নয়, পূর্বনির্ধারিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন হচ্ছে। পার্থক্যটি মৌলিক।
পাঁচ. কাঠামোগত সমতা — সংবিধান কী বলে
সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবিধানিক যুক্তিগুলির একটি আসে কাঠামোগত সমতার বিশ্লেষণ থেকে। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রধান সাংবিধানিক অঙ্গের নিজস্ব স্বাধীন সচিবালয় আছে বা থাকার কথা:
সংসদ — ৭৯ অনুচ্ছেদ
সংবিধানের ৭৯(১) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে: 'সংসদের একটি নিজস্ব সচিবালয় থাকবে।' এই বিধান বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন ১৯৯৪ প্রণীত হয়েছে। সেই আইনের ৩(২) ধারা বলছে — সংসদ সচিবালয় কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দফতরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে না।
নির্বাচন কমিশন — নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯-এর ৩ ধারা বলছে — নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সচিবালয় থাকবে এবং তা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দফতরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে না।
নির্বাহী বিভাগ — সচিবালয় নির্দেশমালা ২০২৪
সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদের অধীনে ব্যবসার বিধিমালা এবং সচিবালয় নির্দেশমালা ২০২৪ নির্বাহী বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় কাঠামো নিশ্চিত করে।
বিচার বিভাগ — ব্যত্যয়ের পঞ্চাশ বছর
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিচার বিভাগের জন্য কোনো স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিটি সাংবিধানিক অঙ্গ তার প্রশাসনিক স্বাধীনতা পেয়েছে — শুধু বিচার বিভাগ পায়নি।
এই বৈষম্য কেবল প্রশাসনিক অপূর্ণতা নয়। হাইকোর্ট বিভাগ ঠিকই চিহ্নিত করেছেন যে এটি সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী সমতা লঙ্ঘন। বিচারিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত একমাত্র গোষ্ঠী যারা একটি স্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামো থেকে বঞ্চিত — অথচ তারা সেই মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছেন যার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিতে তারা আইনত বাধ্য।
আদালত এই বৈষম্য দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি বিচারিক অতিক্রমণ নয় — এটি সাংবিধানিক বৈষম্য সংশোধন।
ছয়. তুলনামূলক সাংবিধানিক আইন — আন্তর্জাতিক প্রমাণ
৬.১ ভারত
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য রাজস্থান ও অন্যান্য বনাম রমেশ চন্দ্র মুন্দ্রা [(২০২০) ২০ এসসিসি ১৬৩] মামলায় বলেছে:
"An integral part of the independence of the judiciary as a constitutional value is institutional independence, namely the aspect concerning financial autonomy which the judiciary must possess and enjoy. Effective involvement of the judicial branch in budgeting, staffing, and infrastructure has also been recognised by the international community." — State of Rajasthan & Others v. Ramesh Chandra Mundra & Others, (2020) 20 SCC 163, para 22, Supreme Court of India
সোমেশ চৌরাসিয়া বনাম মধ্যপ্রদেশ রাজ্য [এআইআর ২০২১ এসসি ৩৫৬৩] মামলায় আরও বলা হয়েছে:
"Our Constitution specifically envisages the independence of the District Judiciary. This is implicit in Article 50 of the Constitution, which provides that the State must take steps to separate the judiciary from the executive in the public services of the State. The District Judiciary operates under the administrative supervision of the High Court, which must secure and enhance its independence from external influence and control." — Somesh Chaurasia v. State of Madhya Pradesh & Others, AIR 2021 SC 3563, para 42, Supreme Court of India
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব স্বাধীন সচিবালয় আছে। অধস্তন বিচার বিভাগের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের হাতে, নির্বাহী সরকারের নয়।
৬.২ যুক্তরাজ্য
আর বনাম সেক্রেটারি অব স্টেট ফর দ্য হোম ডিপার্টমেন্ট [২০০২] ৪ অল ইআর ১০৮৯ মামলায় হাউস অব লর্ডস সুস্পষ্ট বলেছে:
"The complete functional separation of the judiciary from the Executive was fundamental since the Rule of Law depended on it." — R v. Secretary of State for the Home Department [2002] 4 All ER 1089, at p. 1090, House of Lords
যুক্তরাজ্যে ২০০৫ সালের সাংবিধানিক সংস্কার আইন বিচারিক প্রশাসনের দায়িত্ব লর্ড চ্যান্সেলর (নির্বাহী কর্মকর্তা) থেকে লর্ড চিফ জাস্টিসের কাছে হস্তান্তর করেছে এবং বিচারিক প্রশাসনিক স্বাধীনতার কাঠামোগত প্রক্রিয়া হিসেবে স্বাধীন আদালত ও ট্রাইব্যুনাল সেবা প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি ঠিক সেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন যা বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ নির্দেশ করছেন।
৬.৩ সিঙ্গাপুর ও নেপাল
সিঙ্গাপুরের সংবিধানের ১১১এফ অনুচ্ছেদ এবং নেপালের সংবিধানের ১৫৪ অনুচ্ছেদ উভয়ই বিচার বিভাগের জন্য পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করে। এই দুটি দেশেই নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক একটি বিচারিক সচিবালয় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার অংশ।
৬.৪ জাতিসংঘ মানদণ্ড
বিচারিক স্বাধীনতার মৌলিক নীতিমালা (জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, ১৯৮৫)-এর ১নং নীতি বলে:
"The independence of the judiciary shall be guaranteed by the State and enshrined in the Constitution or the law of the country. It is the duty of all governmental and other institutions to respect and observe the independence of the judiciary." — UN Basic Principles on the Independence of the Judiciary, Principle 1, GA Res. 40/32 (1985)
জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট (২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশ প্রতিবেদন) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্থাপনকে অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে সুপারিশ করেছে।
আন্তর্জাতিক আইন এই নির্দেশনাকে দুর্বল করে না — বরং শক্তিশালী করে।
সাত. সমালোচনার মুখোমুখি
৭.১ 'আদালত প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন না'
সমালোচনার কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো কুদরত-ই-এলাহী পানি বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ ডিএলআর (এডি) ৩১৯ মামলা থেকে আহৃত — আদালত শুধু অসাংবিধানিকতা ঘোষণা করতে পারেন, প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন না।
কিন্তু এই যুক্তি মূল বিষয়টিই এড়িয়ে যায়।
হাইকোর্ট বিভাগ কোনো নতুন কাঠামো নির্মাণ করেননি। তিনি সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের 'প্রস্তাব অনুযায়ী' সচিবালয় স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন — অর্থাৎ সেই কাঠামো যা সুপ্রিম কোর্ট নিজেই ২০১২ সালে প্রস্তুত করেছিল, ভবন নির্বাচন করেছিল, উদ্বোধন করেছিল। নির্মাণ আগেই হয়েছিল — আদালত শুধু বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
৭.২ ১০২ অনুচ্ছেদের প্রতিকারমূলক এখতিয়ার ম্যান্ডামাস পর্যন্ত বিস্তৃত
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে ম্যান্ডামাস প্রকৃতির নির্দেশনা জারির ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। ম্যান্ডামাস হলো ঠিক এমন একটি আদেশ যা কোনো কর্তৃপক্ষকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করে।
১১২ অনুচ্ছেদের অধীনে সাংবিধানিক দায়িত্ব বিদ্যমান → আদালত সেই দায়িত্ব বলবৎ করতে পারেন ১০২ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে। অধিকার থাকলে প্রতিকারও থাকতে হবে — এটি ন্যায়শাস্ত্রের প্রাথমিক সূত্র। মার্বারি বনাম ম্যাডিসন (১৮০৩) থেকে আজ পর্যন্ত এই সূত্র অটল।
৭.৩ কুদরত-ই-এলাহী পানি মামলার ভুল প্রয়োগ
কুদরত-ই-এলাহী পানি মামলা নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবিধানিক সংস্থার পুনর্গঠনের প্রশ্নে আদালতের ক্ষমতা নিয়ে ছিল। সেই মামলা এই সাধারণ অর্থে প্রযোজ্য নয় যে আদালত কখনো সাংবিধানিক দায়িত্ব বাস্তবায়নের নির্দেশ দিতে পারবেন না।
বরং বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিচারের ইতিহাসে আপিল বিভাগ নিজেই মাসদার হোসেন মামলায় বারোটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করেছিলেন — যার মধ্যে বিচারিক বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপও ছিল। বর্তমান নির্দেশনা তার চেয়ে অনেক বেশি সীমিত ও পরিমিত।
৭.৪ সরকারের সম্মতি — বিতর্কটি অর্থহীন
সমালোচনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এটি: যে পক্ষের বিরুদ্ধে আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেই সরকারই আদালতে বলেছে এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। রায়ে স্পষ্ট লেখা আছে:
"With regard to the prayer for issuance of a direction to establish a separate Secretariat along with all necessary logistical support, the learned Attorney General has fairly submitted that the State has no objection to the establishment of such a Secretariat." — W.P. No. 10356 of 2024, Judgment dated 02.09.2025
যখন যাঁর বিরুদ্ধে আদেশ সেই পক্ষ নিজেই সম্মতি দিয়েছেন, তখন 'বিচারিক অতিক্রমণ'-এর প্রশ্নটি তাত্ত্বিকভাবেও টিকে না। এই বিতর্কটি তাই মূলত একাডেমিক।
আট. তিন মাসের সময়সীমা — কেন যুক্তিসংগত
নির্দেশনায় তিন মাসের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু এই সময়সীমা মনগড়া নয়।
প্রথমত, প্রশ্ন হলো এই আদালত কি এমন সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন? উত্তর — হ্যাঁ। মাসদার হোসেন মামলায় আপিল বিভাগ নিজেই সময়সীমাসহ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সাংবিধানিক নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সময়সীমা একটি ন্যায়সংগত প্রয়োগ-কৌশল।
দ্বিতীয়ত, কেন তিন মাস যথেষ্ট? কারণ সরকার ২০১২ সালে ইতোমধ্যেই ভবন নির্বাচন করেছিল, উদ্বোধন করেছিল, নামফলক লাগিয়েছিল। যা করার ছিল তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল — মাঝপথে থেমে যাওয়া হয়েছিল। তিন মাস সেই থেমে যাওয়া প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করার জন্য অপর্যাপ্ত নয়।
তৃতীয়ত, সময়সীমাটি ২০১২-২০২৫-এর পুনরাবৃত্তি রোধ করে। বারো বছরের নিষ্ক্রিয়তার পটভূমিতে কোনো সময়সীমা না দেওয়া মানে 'যেকোনো সময় করবেন'-এর অনুমতি দেওয়া — অর্থাৎ কার্যত না করার স্বাধীনতা দেওয়া।
নয়. সমতার লঙ্ঘন — ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের দাবি
সচিবালয়ের নির্দেশনার একটি প্রায়ই উপেক্ষিত কিন্তু সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সমতার প্রশ্ন।
সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। ২৯ অনুচ্ছেদ প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সকল নাগরিকের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয় এবং বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়ন নিষিদ্ধ করে।
বাস্তবে কী হয়েছে? সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তা, এমনকি মন্ত্রণালয়ের সিভিল কর্মকর্তা — সবাই তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজ করেন। কিন্তু বিচারিক কর্মকর্তারা কাজ করেন সেই মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ছায়ায় যার বিরুদ্ধে মামলায় তাদের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত দিতে হয়।
এই কাঠামোগত অসমতা সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাইকোর্ট বিভাগ তাই ঠিকই বলেছেন যে এই অসমতা ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং এই বৈষম্য দূর করা একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
দশ. আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। এই চুক্তির ১৪ অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করে যে প্রতিটি নাগরিক একটি যোগ্য, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারিক সংস্থার কাছে ন্যায্য শুনানির অধিকারী।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি ধারাবাহিকভাবে ব্যাখ্যা করে আসছেন যে এই বিধান শুধু পৃথক বিচারকের সিদ্ধান্তমূলক স্বাধীনতার দাবি করে না — প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতারও দাবি করে, অর্থাৎ বিচার বিভাগকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা — একটি পৃথক সচিবালয়সহ — হলো পৃথক বিচারিক স্বাধীনতার কাঠামোগত পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা তাই এই নির্দেশনাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
এগারো. বৃহত্তর সাংবিধানিক তাৎপর্য
এই নির্দেশনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না — বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নির্বাহী আধিপত্যের অধীনে থেকেছে। মাসদার হোসেন মামলা ছিল একটি জলবিভাজক মুহূর্ত — আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বিচারিক বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে ফাঁকটি বন্ধ হয়নি।
বর্তমান রায় সেই ফাঁক বন্ধ করার প্রয়াস। পৃথক সচিবালয়ের নির্দেশনা হয়তো রায়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ নয় — কিন্তু এটি হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ একটি পৃথক সচিবালয় ছাড়া বিচারিক স্বাধীনতার অন্যান্য সব দিক শুধু তত্ত্বে থেকে যাবে।
নিজস্ব সচিবালয় ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট পারে না:
(ক) বিচারিক কর্মকর্তাদের সার্ভিস রেকর্ড স্বাধীনভাবে রক্ষা করতে;
(খ) নির্বাহী প্রভাবমুক্তভাবে পদায়ন ও বদলির সিদ্ধান্ত নিতে;
(গ) নিজের বাজেট ও অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করতে;
(ঘ) প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে;
(ঙ) আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বাধীনভাবে শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে।
এগুলো প্রশাসনিক সুবিধা নয় — সাংবিধানিক আবশ্যিকতা। আদালতের নির্দেশনা বিচারিক অতিক্রমণ নয় — এটি সাংবিধানিক শাসন।
বারো. সরকারের আপিলের যুক্তি: নিরপেক্ষ পর্যালোচনা
বাংলাদেশ সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকারের মূল আপত্তি হলো হাইকোর্ট বিভাগ পৃথক সচিবালয় স্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মাধ্যমে তার সাংবিধানিক এখতিয়ার অতিক্রম করেছেন। একজন সৎ গবেষকের কর্তব্য হলো এই যুক্তিকে ন্যায্যভাবে উপস্থাপন করা এবং তারপর তার মূল্যায়ন করা।
১২.১ সরকারের যুক্তির সারাংশ
সরকারের পক্ষ থেকে যে আইনি যুক্তিগুলি সম্ভবত উপস্থাপন করা হবে তা মোটামুটি এরকম:
প্রথম যুক্তি হলো ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতি। সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা নির্বাহী বিভাগের কাজ। একটি সচিবালয় কীভাবে, কোথায়, কত কর্মী নিয়ে গঠিত হবে — এই সিদ্ধান্তগুলো নীতিনির্ধারণী প্রকৃতির এবং সেগুলো বাজেট, সংসদীয় অনুমোদন ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের উপর নির্ভরশীল। আদালত যদি এই ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ আদেশ দেন, তাহলে তিনি নির্বাহী বিভাগের ভূমিকায় অভিষিক্ত হন।
দ্বিতীয় যুক্তি হলো সংসদের প্রাথমিক ভূমিকা। সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয়ের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। সংসদ সচিবালয়ের ক্ষেত্রে ৭৯ অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ আছে। কিন্তু বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে এমন কোনো সাংবিধানিক সুনির্দিষ্ট আদেশ নেই। এটি তাই সংসদের বিবেচনার বিষয়।
তৃতীয় যুক্তি হলো তিন মাসের সময়সীমার অবাস্তবতা। একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সরকারি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদে আইন পাস, জনবল কাঠামো নির্ধারণ, ভবন ও লজিস্টিক ব্যবস্থা, বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কাঠামো পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। তিন মাসে এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রশাসনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।
চতুর্থ যুক্তি হলো কুদরত-ই-এলাহী পানির নীতি। আপিল বিভাগ ৪৪ ডিএলআর (এডি) ৩১৯ মামলায় বলেছিলেন আদালত প্রশাসনিক কাঠামো ডিজাইন করার ক্ষমতা রাখেন না। এই নজির হাইকোর্ট বিভাগের অতিক্রম করা উচিত ছিল না।
১২.২ যুক্তিগুলির ন্যায্য মূল্যায়ন
এই যুক্তিগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয় — এর মধ্যে কিছু বৈধ সাংবিধানিক উদ্বেগ আছে। একটি সৎ বিশ্লেষণ স্বীকার করে নেয় যে ক্ষমতা পৃথকীকরণের নীতি শুধু নির্বাহী বিভাগের জন্য নয়, বিচার বিভাগের জন্যও প্রযোজ্য — আদালতও তাঁর সাংবিধানিক সীমানার মধ্যে থাকেন।
তিন মাসের সময়সীমার প্রশ্নে সরকারের উদ্বেগে একটি বাস্তব মাত্রা আছে। একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয় স্থাপন — নতুন আইন প্রণয়ন, জনবল নিয়োগ, বাজেট বরাদ্দ, ভবন ও অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ — এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি বাস্তবিকভাবে তিন মাসে সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে।
তবে এই স্বীকৃতির পাশাপাশি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতি-যুক্তিও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথমত, আদালত সম্পূর্ণ একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে বলেননি। তিনি সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের 'প্রস্তাব অনুযায়ী' স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন — অর্থাৎ ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, সেটি বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। এটি নতুন নির্মাণ নয়, অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার নির্দেশ।
দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বারো বছরের নিষ্ক্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা ১১২ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের অনিবার্য অংশ। সময়সীমা ছাড়া কোনো আদেশ কার্যকরভাবে প্রয়োগযোগ্য নয় — এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি।
তৃতীয়ত, সরকার নিজেই আদালতে বলেছে এতে তাদের 'কোনো আপত্তি নেই' — আপিলে তাই 'এখতিয়ার নেই' বলার বিষয়টি স্ববিরোধী।
সামগ্রিকভাবে বলা যায় — আপিলটি বৈধ সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে, বিশেষত সময়সীমার বাস্তবসম্মততা ও ক্ষমতার সীমানার প্রশ্নে। আপিল বিভাগ সেই প্রশ্নগুলির বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু এটি কখনো এমন বিতর্কে পরিণত হওয়া উচিত নয় যে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় দরকার কিনা — কারণ সেই প্রশ্নের উত্তর আইন, সংবিধান ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষা তিনটিই একসুরে দিয়েছে।
তেরো. উপসংহার: আইন, সংবিধান ও জাতির ইচ্ছা
এই গবেষণাপত্রের শেষে এসে পাঠকের সামনে তিনটি স্তরের বিষয় একত্রে উপস্থিত রাখা দরকার — আইনি যুক্তি, সাংবিধানিক দর্শন এবং জাতির গভীরতম প্রত্যাশা।
আইনি স্তর
বিশুদ্ধ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, হাইকোর্ট বিভাগের সচিবালয় নির্দেশনা আর্টিকেল ২২, ১০৭, ১০৯ ও ১১২-এর সমন্বিত পাঠে সমর্থিত। মাসদার হোসেন মামলার নজির অনুসরণ করলে এই নির্দেশনা একটি স্বাভাবিক পরিণতি। সরকারের আপিল যে আইনি প্রশ্নগুলি তুলছে — বিশেষত তিন মাসের সময়সীমার বৈধতা ও ক্ষমতার সীমানা সম্পর্কে — সেগুলো আপিল বিভাগের বিবেচনার যোগ্য। তবে যদি আপিল বিভাগ সময়সীমাটি পরিমার্জন করেনও, বা প্রক্রিয়াটি সংসদের মাধ্যমে করার নির্দেশ দেন, তাতেও মূল প্রশ্নটি অপরিবর্তিত থাকে: একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
সাংবিধানিক দর্শনের স্তর
সাংবিধানিক দর্শনের দিক থেকে, ক্ষমতার ত্রিভুজে বিচার বিভাগকে একটি স্বতন্ত্র, সমকক্ষ ও স্বনির্ভর অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে লক্ষ্য ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতারা নির্ধারণ করেছিলেন, তা আজও অর্জিত হয়নি। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ একটি রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল — সেই লক্ষ্য পূরণে একটি পৃথক সচিবালয় একটি যন্ত্র নয়, একটি পূর্বশর্ত।
বিচার বিভাগ যদি তার নিজের কর্মকর্তাদের পদায়ন, বেতন, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও শৃঙ্খলার জন্য নির্বাহী মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী থাকে, তাহলে ক্ষমতা পৃথকীকরণ একটি কাগুজে সত্য — জীবনের সত্য নয়। আপিল বিভাগ চাইলে সময়সীমা বাড়াতে পারেন, প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে পারেন — কিন্তু লক্ষ্যটি অর্থাৎ পৃথক সচিবালয়টি — সাংবিধানিকভাবে অপরিহার্য।
জাতির ইচ্ছার স্তর
এই দুটি স্তরের ঊর্ধ্বে আছে একটি গভীরতর প্রশ্ন: বাংলাদেশের মানুষ কী চান?
১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ শুধু ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ করেনি। তারা যুদ্ধ করেছিল একটি ন্যায়সংগত সমাজের জন্য — যেখানে আইনের সামনে সবাই সমান, যেখানে বিচার পাওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনের মুখের দিকে তাকাতে হবে না, যেখানে একজন সাধারণ মানুষও আদালতে গিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাবে।
সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না যদি বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের উপর প্রশাসনিকভাবে নির্ভরশীল থাকে। একজন বিচারক যখন জানেন যে তাঁর পদোন্নতির ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে আছে, তখন তিনি যতই সৎ হোন না কেন, একটি অদৃশ্য চাপ তাঁকে ঘিরে থাকে। এই চাপ থেকে মুক্তির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হলো একটি পৃথক বিচারিক সচিবালয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যখন রাস্তায় নেমেছিল, তখন তারা শুধু একটি সরকারের পতন চায়নি — তারা চেয়েছিল একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে, যেখানে বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ তার নিজের জায়গায় দাঁড়াবে। পৃথক বিচারিক সচিবালয় সেই নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি দৃশ্যমান চিহ্ন।
আপিল বিভাগ একটি সিদ্ধান্ত নেবেন। সেই সিদ্ধান্তে তারা সময়সীমা পরিবর্তন করতে পারেন, প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিতে পারেন, সরকারকে সংসদের মাধ্যমে আইন করার নির্দেশ দিতে পারেন — এই সবই আপিল বিভাগের সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যে। কিন্তু যদি আপিল বিভাগ পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তাটিই খারিজ করে দেন, তাহলে তা হবে আইনের কথার বিরুদ্ধে নয় — বরং জাতির সেই গভীর প্রত্যাশার বিরুদ্ধে, যা ১৯৭১ সালে জন্ম নিয়েছিল এবং ২০২৪ সালে আবার জেগে উঠেছিল।
সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল। আইন একটি যন্ত্র। কিন্তু একটি জাতির ইচ্ছাই হলো সেই প্রাণ যা সংবিধান ও আইন উভয়কে অর্থ দেয়। বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছা সুস্পষ্ট: তার