01/11/2025
#বন্ধু_বন্ধু_আমার
বন্ধুর পরিচয়ঃ
বন্ধুর পরিচয় হলো এমন এক আন্তরিক সম্পর্ক, যেখানে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি, বিশ্বাস এবং ত্যাগের মনোভাব থাকে। প্রকৃত বন্ধু সুখে-দুঃখে পাশে থাকে, মন খুলে কথা বলার সুযোগ দেয় এবং প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক বয়স বা সময়সীমার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি একে অপরের প্রতি যত্নের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। মানুষের নিরন্তর পথ চলায় অক্সিজেনের কাজ করে বন্ধুত্ব। যে কথা কাউকে বলা যায় না, তার আগল অকপটে খুলে দেয়া যায় বন্ধুর সামনে। বন্ধু কখনো শিক্ষক, কখনো সকল দুষ্টুমির একমাত্র সঙ্গী। মনের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস, আবেগ আর ছেলেমানুষী হুল্লোড়ের অপর নামই তো বন্ধুত্ব।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমনি একটি বিশেষ জাতের মানুষ।
ডঃ এ.পি জে আব্দুল কালাম বলেছেন,
একটি বই একশোটি বন্ধুর সমান কিন্তু একজন ভালো বন্ধু পুরো একটি লাইব্রেরির সমান।
বন্ধুত্বের ভিত্তিঃ
আন্তরিকতা ও ভালোবাসাঃ
এটি বন্ধুত্বের ভিত্তি, যা একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থেকে তৈরি হয়।
সুখে-দুঃখে পাশে থাকাঃ
বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থাকা এবং সুখে-দুঃখে ভাগ করে নেওয়া।
বিশ্বস্ততা ও সমর্থনঃ
একজন সত্যিকারের বন্ধুকে বিশ্বাস করা যায় এবং সে আপনাকে সমর্থন করে। এটি আপনার ভালো-মন্দ সকল অবস্থায় পাশে থাকে।
গ্রহণযোগ্যতাঃ
একজন ভালো বন্ধু আপনাকে আপনি যেমন, তেমনই গ্রহণ করে এবং সম্মান করে।
ত্যাগের মানসিকতাঃ
প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করা এবং একে অপরের জন্য কিছু করার ইচ্ছা বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রকৃত আগ্রহঃ
একজন বন্ধু আপনার জীবনে প্রকৃত আগ্রহ দেখায় এবং আপনাকে নিজের সম্পর্কে আরও ভালো বোধ করতে সাহায্য করে।
স্বতঃস্ফূর্ততাঃ
বন্ধুত্বে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না, বরং এটি স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাবলীল হয়।
বন্ধুত্বের ইচ্ছেকে সম্মান জানানোঃ
বন্ধুর ইচ্ছাকে সবসময় সম্মান জানানো উচিত। যদি তা পছন্দ না হয়, তবে সরাসরি বলুন। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা অবশ্যই জরুরী। সমালোচনা করুন, তবে কটুক্তি নয়। বন্ধুর সমালোচনা বন্ধুরা করবে না তো কে করবে? তবে সমালোচনার ভাষা ব্যবহারে সচেতন হওয়ায় খুবই প্রয়োজন। একবার ভুল হলে তাকে ছুঁড়ে না ফেলে তা শুধরে নেওয়াই প্রকৃত বন্ধুর দায়িত্ব। বন্ধুর প্রতি বিনয়ী হওয়া বন্ধুত্বের প্রধান হাতিয়ার।বন্ধুত্বের ইচ্ছেকে সম্মান জানানো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ফুয়েলের মতো কাজ করে
প্রতিনিয়ত বন্ধুর ভালো চাওয়াঃ
অ্যারিস্টটল বলেছেন, আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু সে-ই যে আমার কল্যাণ কামনা করে কেবল আমার কল্যাণেরই জন্যে।
ভালো বন্ধু সবসময় বন্ধুর ভালো চায়। নিজের ভালো হোক সকলেই চায়, তবে তার জন্য বন্ধুর ক্ষতি হোক এমন ভাবা কিন্তু প্রকৃত বন্ধুর পরিচায়ক নয়। প্রকৃত বন্ধু চাইবেন তার নিজের উন্নতির পাশাপাশি আপনারও উন্নতি হোক। যেখানে কিংবা যত দূরেই থাকুন না কেন, বন্ধুর কল্যাণ কামনাই প্রিয় বন্ধুর পরিচায়ক।
বন্ধুত্বে সৎ থাকাঃ
বন্ধুত্বে অবশ্যই সৎ থাকতে হবে। মিথ্যা তথ্য কিংবা ধারণা দিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়া যায়, কিন্তু গড়লেও তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আপনি যা সেটাই প্রকাশ করা এবং অযথা কৃত্রিমতা বর্জন করে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বন্ধুর কাছে স্বচ্ছ ধারণা তুলে ধরাই হচ্ছে প্রকৃত বন্ধুর দায়িত্ব। মনের মতো বন্ধু পেতে সততার কোনো বিকল্প নেই। সততা প্রিজারভেটিভ ছাড়াই সম্পর্কের বৃক্ষকে সতেজ রাখে।
বন্ধুকে সময় দেওয়াঃ
দীর্ঘদিনের বন্ধুরা একে অন্যের পেছনে সময় ব্যয় করে। মানুষের পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রতিনিয়ত সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। বন্ধুরা হয়তো আগের মতো সময় দিতে পারে না। এর ফলে যে দুই বন্ধুর মধ্যে সম্পর্কের ব্যাঘাত ঘটবে তা কিন্তু না। নতুন বন্ধুদের পাশাপাশি পুরোনো সম্পর্কগুলোকে ঝালাই করে নিতে হয় প্রতিনিয়ত। দৈনন্দিন ব্যস্ততায় পুরোনো বন্ধুত্বকে হারিয়ে ফেলা একদমই উচিত নয়। আপনার বন্ধু আর আপনার মাঝখানে কেবল এক মুঠোফোন দূরত্ব। বন্ধুকে মনে করুন, পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করুন।
উত্তম শ্রোতা হওয়াঃ
বন্ধুত্বে ভালো শ্রোতা হওয়াও খুব জরুরি। বন্ধুর সাথে আড্ডায় কেবল নিজের কথাগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। বন্ধুকেও কথা বলতে দেওয়া এবং আলোচনায় উৎসাহিত করার মধ্য দিয়ে দুজনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা পরষ্পরের বুঝে নিতে সহজ হয়। বন্ধুর সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, বন্ধুর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন বিষয় নিয়ে উপহাস না করাই প্রকৃত বন্ধুর দায়িত্ব। বন্ধু মানেই কেবল আমার সবটুকু কথা তাকে বলে ফেলা নয়, বরং তার কথাগুলোকেও আপন করে নেওয়া।
বন্ধুত্বকে টিকিয়ে রাখতে শেখাঃ
একজন প্রকৃত বন্ধুকে অবশ্যই জানতে হবে কিভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়। অনেকেই জানে না যে বন্ধুত্ব কিভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়। ফলে কারণে-অকারণে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়, দূরত্ব তৈরি হয়, বন্ধুত্ব ক্রমেই হারিয়ে যায়। বিপরীতে যারা দীর্ঘদিন বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, তারা এর মূল বিষয়টি জানে। এতে থাকতে হয় স্বাভাবিকতা, প্রাণ চাঞ্চল্য। বন্ধুত্বের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি, রাগ, অনুরাগ, ব্যস্ততা, এড়িয়ে চলা, নার্ভাস ভাব ইত্যাদি দূরে রাখা শিখতে হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিতে প্রকৃত বন্ধুঃ
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যারা আমার প্রেমে পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার খাতিরে সমবেত হয়, যারা আমার খাতিরে পরস্পরের খবরাখবর নেয় ও পারস্পরিক যোগাযোগ বহাল রাখে, আমার ভালোবাসা তাদেরই প্রাপ্য। ’
প্রিয় নবীজি (সঃ) বলেছেন, লোক তার সঙ্গীর স্বভাব-চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত। অতএব সে যেন খেয়াল রাখে কার সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করছে।
////////////////////////////////////////////////
অ্যাডভোকেট আবদুল কাইয়ুম ভূঁইয়া
বাংলাদেশের সহকারী এটর্নি জেনারেল
তাং ১/১১/২০২৫ ইং