14/01/2018
মুসলিম ও ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ান এন্ড ওয়ার্ডস এক্ট আইন অনুযায়ী কারা কারা অভিভাবক হতে পারেন? মুসলিম আইনে বাবাই একমাত্র অভিভাবক।তার মৃত্যুতে অন্য কেউ অভিভাবক নিযুক্ত হবেন। তবে একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মা সন্তানদের অভিভাবক বা তত্ত্বাবধানের অধিকারীনী। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক অভিভাবক নন। নাবালকের নিকট-আত্নীয় নাবালকের প্রকৃতিগত অভিভাবক বলে গণ্য হয়। অনেক সময় কোন বিশেষ ব্যক্তিকে অভিভাবকের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। অভিভাবকের শ্রেণীবিভাগ: ১.স্বাভাবিক অভিভাবক : মুসলিম আইনে পিতা জীবিত থাকলে তিনিই নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির স্বাভাবিক ও আইনানুগ অভিভাবক। নাবালকের পক্ষে কোন কাজ সম্পন্ন করতে হলে পিতাকে আদালতের হুকুমের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ২.আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক: ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ান এন্ড ওয়ার্ডস এক্ট এর ৮ নং ধারা মতে, নাবালকের অভিভাবক নিয়োগের জন্য আদালতে দরখাস্ত করতে হবে।আদালত সেই দরখাস্ত পরীক্ষা করে দেখবেন এবং প্রয়োজন মনে করলে নাবালকের কল্যাণের জন্য অভিভাবক নিযুক্ত করবেন। আদালত যাকে অভিভাবক নিয়োগ করবেন তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারবেন না। এবং ১০ নং ধারা অনুযায়ী অনুমোদিত ফরমে তা করতে হবে। এছাড়াও সন্তানের অভিভাবকত্বকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় - সন্তানের অভিভাবকত্ব সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকত্ব নীচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। সন্তানের অভিভাবকত্ব: ছেলের ৭ বছরের পরে ও মেয়ের বয়ঃসন্ধির পর পিতা নাবালকের অভিভাবকত্বের অধিকার পান। তবে পিতার এই অধিকার চূড়ান্ত নয়। সবক্ষেত্রেই আদালত সন্তানের কল্যাণকে প্রাধান্য দেবেন। পিতার আচরণের কারণে (যেমন-পিতা যদি কখনই সন্তানের ভরণপোষণ না দেয়) সন্তানদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। কারণ বাবা তার আচরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন যে সে সন্তানের কল্যাণে আগ্রহী নয়। আবার মা যদি বাবার আর্থিক সাহায্য ছাড়াই সফলভাবে সন্তানদের নিজ খরচে লালনপালন করে, সেক্ষেত্রে আদালত সন্তানের পিতার কাছে দিতে অস্বীকার করতে পারে। নিচের ব্যক্তিরা সন্তানের অভিভাবক হবেন। এছাড়াও মা ও অন্যান্য মহিলাদের অবর্তমানে এরা নাবালকের জিম্মাদারিত্বের অধিকারী হবেন, তারা হলেন - ক. বাবা; খ. বাবার বাবা, যত উপরের দিকে হোক; গ. আপন ভাই; ঘ. রক্ত সম্পর্কীয় (স্বগোত্রীয়) ভাই; ঙ. আপন ভাইয়ের ছেলে; চ. রক্ত সম্পর্কীয় (স্বগোত্রীয়) ভাইয়ের ছেলে; ছ. বাবার আপন ভাই; জ. বাবার আপন ভাইয়ের ছেলে; ঝ. বাবার রক্তসম্পর্কীয় (স্বগোত্রীয়) ভাই; ঞ. বাবার রক্তসম্পর্কীয় (স্বগোত্রীয়) ভাইয়ের ছেলে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন অবিবাহিতা নাবালিকার অভিভাবক যদি রক্ত সম্পর্কের কারণে নিষিদ্ধ স্তরের কেউ না হয়, সেক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের অধিকার সে পাবে না। যেমন- চাচাতো ভাই অভিভাবক হতে পারবে না। যে ক্ষেত্রে এরকম কোন আত্নীয়ও নেই সেক্ষেত্রে আদালত নাবালকের জন্য উপযুক্ত অভিভাবক নিয়োগ করতে পারে। সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকত্ব: নাবালকের সম্পত্তির ৩ ধরনের অভিভাবক হতে পারে। যেমন - ১. আইনগত অভিভাবক ২. আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক। ৩. কার্যতঃ অভিভাবক। ১. আইনগত অভিভাবক: নিচের আইনগত অভিভাবকরা মুসলিম আইনে নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক হবে বাবা; বাবার ইচ্ছাপত্র (উইল) অনুযায়ী নিয়োগকৃত নির্বাহক; বাবার বাবা (দাদা); বাবার বাবার ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী নিয়োগকৃত নির্বাহক; এইসব আইনগত অভিভাবকগন নাবালকের খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রয়োজনে তার অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারেন। কিন্তু নাবালকের ভরণপোষণ, উইলের দাবি, ঋণ, ভূমি কর পরিশোধ ইত্যাদির জন্য স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন শুধুমাত্র নিচের কারনে - ক) যখন ক্রেতা দ্বিগুণ দাম দিতে চাইছে; খ) যখন সম্পত্তিটি ধ্বংসের পথে এবং গ) যখন সম্পত্তির আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। আইন সম্মত অভিভাবকের অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা আছে কি? নাবালকের সম্পত্তির আইন সম্মত অভিভাবকগন নাবালকের মালপত্র এবং অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা বন্ধক দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ২. আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক: আইনগত অভিভাবক না থাকলে আদালত নাবালকের সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য কোন যোগ্য ব্যক্তিকে অভিভাবক হিসাবে নিয়োগ করতে পারেন। আদালত নিযুক্ত অভিভাবককে নাবালকের অস্্থাবর সম্পত্তি এমন যত্ন সহকারে হেফাজত করতে হবে যেমন ভাবে সাধারণ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন কোন লোক তার নিজের সম্পত্তি হেফাজত করে। আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবকের অস্থাবর অথবা স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা আছে কি? আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক আদালতের অনুমতি ছাড়া কোন কারণেই নাবালকের স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তির কোন অংশ বিক্রি, বন্ধক, দান, বিনিময় বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তর করতে পারবে না। ৩. কার্যত: অভিভাবক বা বাস্তবিক অভিভাবক: নাবালকের আইনগত অভিভাবক বা আদালত নিযুক্ত অভিভাবক না হলেও কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির কার্যতঃ অভিভাবক হতে পারে। এ ধরনের অভিভাবক হলেন কার্যতঃ অভিভাবক অর্থাত্ আইনগতভাবে না হলেও বাস্তবে অভিভাবক হিসেবে কাজ করছে।কার্যতঃ অভিভাবক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তির কোন স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকারই হস্তান্তর করতে পারে না। হস্তান্তর করলেও তা বাতিল হবে। কার্যত অভিভাবক কর্তৃক অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা আছে কি? নাবালকের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে (যথা: খাদ্য, বস্ত্র বা সেবা সুশ্রুষার জন্য) কার্যত অভিভাবক তার হেফাজতের জিনিসপত্র ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় ও বন্ধক দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আদালত কখন এবং কেন অভিভাবক নিয়োগ করেন? অনেক সময় নাবালকের বাবা-মা বর্তমান থাকে না কিংবা তারা দায়িত্ব পালনে অপারগ হন সেই ক্ষেত্রে আইন মানবিক কারণে নাবালকের বিষয়-সম্পত্তি, ভরণপোষণ, শিক্ষা সর্বোপরি সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য একজন অভিভাবক নিযুক্ত করেন। অনেক সময় এই প্রকার অভিভাবককে অস্থায়ী বাবা-মা হিসাবে গন্য করা হয়। একজন অভিভাবক নাবালকের ও তার সম্পত্তির তত্ত্বাবধানে ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিযুক্ত থাকেন।মূলতঃ নাবালকের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানই অভিভাবকের মূল দায়িত্ব। নাবালিকা স্ত্রীর অভিভাবক: যে বালিকা বিবাহিতা কিন্তু যৌন যোগ্যতা অর্জন করে নাই সেই বালিকার অভিভাবকত্ব স্বামীর পরিবর্তে বালিকার মাতা অর্জন করবেন। নাবালিকা বিবাহিতা মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বাভাবিক অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে বাধা অবৈধ। বিয়ে-বিচ্ছেদের পর মার অভিভাবকত্ব: সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিচ্ছেদপ্রাপ্ত দম্পত্তির মধ্যে প্রায়ই বিরোধ তৈরী হয়। মা কিছু সময় পর্যন্ত সন্তানের জিম্মাদার থাকেন। মুসলিম আইনে মা নিচের সময় পর্যন্ত সন্তানের জিম্মাদার থাকতে পারেন। যেমন - ১। ছেলে সন্তানের সাত বছর বয়স পর্যন্ত; ২। মেয়ে সন্তানের বয়ঃসন্ধি কাল পর্যন্ত; সন্তানের বয়স শর্ত অনুযায়ী থাকলেও মা জিম্মাদার থাকতে পারবেন না নিচের কারণগুলো জন্য - আদালতের আদেশ ছাড়া মাকে জিম্মাদারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অসত্ জীবনযাপন করলে; মা পুনরায় বিয়ে করলে; সন্তানের প্রতি অবহেলা করলেও দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে এবং বিয়ে থাকা অবস্থায় বাবার বসবাসস্থল থেকে দূরে কোথাও বসবাস করলে। উপরোক্ত কারনগুলো ব্যতীত আদালতের আদেশ ছাড়া মাকে জিম্মাদারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তালাক হওয়ার কারণে মা জিম্মাদারিত্বের অধিকার হারান না। কিন্তু মা যদি অনাত্নীয় এমন কাউকে বিয়ে করেন যিনি সন্তানের সাথে রক্ত সম্পর্কের কারণে নিষিদ্ধ স্তরের কেউ নন, এরকম ক্ষেত্রে মা পুনরায় বিয়ে করায় জিম্মাদারিত্বের অধিকার হারাবেন। অবশ্য আদালত যদি মনে করে দ্বিতীয় বিয়ে করা সত্ত্বেও মার সাথে থাকলেই সন্তানের কল্যাণ হবে, তবে আদালত মাকে অনেক সময় সন্তানের অভিভাবকত্ব দিতে পারেন। উদাহরণ:আকাশ ও মলির বিয়ে হয়েছে ৫ বছর। তাদের একটি ছেলে সন্তান আছে। দু'জনের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় আকাশ মলিকে তালাক দেয় ও চার বছরের ছেলেকে নিজের কাছে রাখে। মলিকে সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে দেয় না। আইন অনুযায়ী মলি তার ছেলেকে ৭ বছর পর্যন্ত রাখতে পারবে। আকাশ এই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করতে পারবে না। অভিভাবকত্ব বা জিম্মাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করবে আদালত। সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারিত্ব নিয়ে মা-বাবা কেউ আদালতের কাছে গেলে আদালত সন্তানের স্বার্থ বা মঙ্গল যার কাছে বেশি নিরাপদ মনে করবে তাকেই অভিভাবকত্বের অধিকার দেবে। মা মারা গেলে কারা নাবালকের অভিভাবক হতে পারবে? যখন কোন নাবালকের মা মারা যায় বা অন্য কোন কারণে অভিভাবকত্বের অধিকার হারিয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে নিচের মহিলা আত্নীয়রা তার জিম্মাদারিত্বের অধিকার পাবে। তারা হলেন - ১। মা-এর মা, যত উপরের দিকে হোক (যেমন-নানী, নানীর মা); ২। পিতার মা, যত উপরের দিকে হোক (দাদী, দাদীর মা); ৩। আপন বোন (যাদের বাবা-মা একই); ৪। বৈপিত্রেয় বোন (মা একই কিন্তু বাবা ভিন্ন); ৫। আপন বোনের মেয়ে, যত নিচের দিকে হোক; ৬। বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে, যত নিচের দিকে হোক; ৭। আপন খালা, যত উপরের দিকে হোক; ৮। বৈপিত্রেয় খালা, যত উপরের দিকে হোক এবং ঌ। পূর্ণ ফুফু, যত উপরের দিকে হোক। উপরের উল্লিখিত মহিলারা না থাকলে নাবালকের যারা অভিভাবক হতে পারে তারা জিম্মাদারিত্বের অধিকার পাবে। অভিভাবক নিয়োগের ব্যাপারে আদালত কোন কোন বিষয় বিবেচনা করবে? আদালত কোন নাবালকের অভিভাবক নিয়োগ ঘোষণা করার সময় আইনে বর্ণিত বিধান সাপেক্ষে নাবালক যে আইনের আওতাভুক্ত তার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই নাবালকের মঙ্গলের জন্য যা ভালো বলে মনে করবেন সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। নাবালকের মঙ্গলের জন্য কোনটি ভালো হবে তা বিবেচনা কালে আদালত যে যে বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখবেন তা হলো - -নাবালকের বয়স, লিঙ্গ ও ধর্ম -প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র ও সামর্থ্য -নাবালকের অন্যান্য আত্নীয়দের চরিত্র ও সামর্থ্য -মৃত মা-বাবার কোন ইচ্ছা থাকলে (সন্তান কার কাছে মানুষ হবে) সে ইচ্ছা এবং -নাবালকের বা তার সম্পত্তির সাথে প্রস্তাবিত অভিভাবকের বর্তমান অথবা পূর্বের কোন সম্পর্ক থেকে থাকলে সে সম্পর্ক কিরূপ তা । নাবালকের বয়স যদি এমন হয় যে,সে ভালো মন্দ বুঝে মতামত দেবার মত হয় তবে আদালত তার অভিমতবোধ বিবেচনা করবেন। যে ক্ষেত্রে নাবালকের বয়স তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয় অথবা যথেষ্ট কিন্তু সে কোন মতামত প্রকাশ করেনা সেক্ষেত্রে আদালত নাবালকের ব্যক্তি আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তি তার অভিভাবকত্ত্বের অধিকারী তার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেবেন।