01/06/2022
দেওয়ানী মামলার বিভিন্ন ধাপ সমূহঃ
যেসব মামলার বিচার দেওয়ানি আদালতে হয় সেগুলোকেই দেওয়ানি মামলা বা Civil Case বলা হয়।দেওয়ানি কার্যবিধি আইনের ৯ ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে। যদি কোন মামলায় সম্পত্তি বা পদের অধিকার নিয়ে (আইনগত) বিষয়ে প্রশ্ন উঠে, তবে সেই মামলাটি দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা হিসেবে গন্য হবে।
অধিকার বা পদ সংক্রান্ত মামলা , ঘোষণা মামলা ,দলিল বাতিল ,চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ,বাটোয়ারা মামলা , চুক্তি রদ , সুনির্দিষ্ট চুক্তি সম্পাদনের মামলা ,দখল পুনঃরুদ্ধার সংক্রান্ত মামলা ,দলিল সংশোধন, অর্পিত সম্পত্তি পুনঃরুদ্ধার মামলা, আদেশমূলক নিষেধাজ্ঞা মামলা,ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ মামলা , অগ্রক্রয় মামলা, ইজমেন্ট মামলা,টাকার মামলা, ভুমি জরিপ সংক্রান্ত মামলা ,আর্বিট্রেশন মামলা , পারিবারিক মামলা,উওরাধিকার সংক্রান্ত মামলা , বিবাহ বিচ্ছেদ , খোরপোষ , দেন-মোহর ,অভিভাবকত্ব , দাম্পত্য অধিকার পুনঃরুদ্ধার মামলা ,অফিস সংক্রান্ত মামলা ঘোষনা মামলা ,আদেশমূলক নিষেধাজ্ঞা, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ,নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা , চুক্তি রদ সংক্রান্ত মামলা ,চাকরি হতে অপসারণের নির্দেশ বেআইনি ঘোষণার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মামলা।সরকার বা স্থানীয় স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা কর্তৃক বা তার বিরুদ্ধে করা মামলা,বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা।জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ।
একটি দেওয়ানী মোকদ্দমার সম্পূর্ণ বিচার পরিচালিত হয় দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ সালের আইন দ্বারা ।এই আইনের মধ্যে ১৫৮ টি ধারা ও ৫১ টি আদেশ আছে ।
(১) মামলা দায়ের/আর্জি দায়ের:
দেওয়ানী মোকদ্দমা শুরু হয় এখতিয়ারভুক্ত আদালতের নিকট আর্জি দাখিলের মধ্যে দিয়ে ।আর্জিতে বাদীর দাবীর স্বপক্ষে বিস্তারিত বিবরণসহ যেসকল দলিলাদির উপর ভিত্তি করে বাদীর মামলার প্রমান নির্ভর করে সেই সকল দলিল ও কাগজপত্র দাখিল করতে হবে । তাছাড়া ডাক টিকেটযুক্ত সমন-নোটিশ ও প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি দাখিল করতে হবে ।
(২) আর্জি ফেরত/প্রত্যাখ্যান :—
আর্জি দাখিলের পর আদালত যদি মনে করেন যে আর্জি ফেরত বা প্রত্যাখ্যান হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, সেক্ষেএে আর্জি ফেরত/প্রত্যাখ্যান করে দিবেন।
(৩) সমন জারী/সমন ফেরত :—
আদালত কর্তৃক আর্জি ফেরত/প্রত্যাখ্যান না করা হলে আদালত সমন জারীর মাধ্যমে মামলার সকল বিবাদীগণকে নির্দিষ্ট তারিখে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য ও তাদের দাবীর স্বপক্ষে জবাব দাখিলের জন্য নির্দেশ প্রদান করবেন।
(৪) লিখিত জবাব দাখিল :—
সমন পাওয়ার পর বিবাদীগণ সমনে উল্লেখিত তারিখে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত জবাব দাখিল করবেন ।যদি বিবাদীগণ তাহাদের দাবীর স্ব-পক্ষে লিখিত জবাব প্রস্তুত করতে না পারেন কিংবা প্রয়োজনীয় দলিলাদি যথা সময়ে সংগ্রহ করতে না পারেন তবে বিবাদী আদালত হইতে সময় নিতে পারেন ।বিবাদী জবাব দাখিলের জন্য ২ মাস সময় পাবেন এবং বিবাদী যদি সরকার হয় তাহলে ৩ মাস সময় পাবেন।
(৫) একতরফা শুনানী/প্রথম শুনানী:—
যদি বিবাদীগণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করতে ব্যর্থ হন তবে আদালত বিরোধীয় বিষয়ে বিবাদীগনের দাবী নেই মর্মে ধরে নিয়ে মোকদ্দমাটি একতরফাভাবে নিষ্পত্তি করবেন ।যদি বিবাদী জবাব দাখিল করেন তবে আদালত মামলাটিকে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর করবেন ।
(৬) বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR):—
বাদীর আর্জির বিপরিতে বিবাদী তাহার দাবীর স্বপক্ষে জবাব দাখিলের পর যখন উভয় পক্ষ আদালতে হাজির থাকবেন তখন আদালত শুনানী মুলতবী রেখে উভয়ের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া মামলার বিরোধসমুহ মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করবেন ।
(৭) ইস্যু গঠন/বিচার্য বিষয় নিধারর্ণ :—
মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হইলে আদালত বাদীর আর্জি ও বিবাদীর জবাবের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা অর্জন করার পর কোন কোন বিষয়ের উপর মোকদ্দমাটি বিচার হবে তাহা নিধারর্ণ করবেন ।মুলত এটি হচ্ছে ইস্যু গঠন বা বির্চার্য বিষয় নিধারর্ণ করা ।
(৮) তথ্য উদঘাটন ও পরিদর্শন/৩০ ধারার পদক্ষেপ :—
পক্ষগণের মধ্যে বিরোধের বিষয়গুলো নিধার্রনের পর নির্ধারিত শর্ত ও সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে কোন পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলার বিরোধ নিষ্পত্তির সহায়ক কোন দলিল বা কোন স্বীকারোক্তি সম্পর্কে একপক্ষ অপর পক্ষকে প্রয়োজনীয় কোন বিষয় বা তথ্য প্রকাশের জন্য প্রশ্নজারী করতে পারেন এবং অপর পক্ষ যথা সময়ে উক্ত প্রশ্নের উওর প্রদান করবেন ।
(৯) চুড়ান্ত শুনানীর জন্য তারিখ নির্ধারণ :—
আদালত মোকদ্দমার চুড়ান্ত শুনানীর জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন এবং পক্ষদ্বয়গণকে তাদের নিজ নিজ পক্ষে মামলা প্রমানের জন্য সাক্ষীর তালিকা দিতে বলবেন ।
(১০) চুড়ান্ত শুনানী :—
এই পর্যায়ে আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষীগণদের জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করবেন ।একপক্ষের সাক্ষীকে অপর পক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী জেরা করবেন এবং আদালত তাহা লিপিবদ্ধ করবেন । কোন প্রকারের দালিলিক সাক্ষ্য থাকলে পক্ষগণ তাহা আদালতে উপস্থাপন করবেন ।প্রথম যেদিন চুড়ান্ত শুনানী শুরু হবে সেটি হচ্ছে Peremptory Hearing বা PH কিন্তু আদালত যদি এই দিনে মামলার সকল সাক্ষীর জবানবন্দী -জেরা ও দালিলিক সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করতে না পারলে পরবর্তীতে পূর্ণরায় আদালত শুনানীর জন্য তারিখ দিবেন এটাকে Further Hearing বা FH বলে ।
(১১)যুক্তিতর্ক:—
মামলার পক্ষগণের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাহাদের নিযুক্ত আইনজীবী মোকদ্দমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল বিষয় সংক্ষিপ্ত আকারে আদালতের সামনে উপস্হাপন করবেন । যুক্তিতর্ক অবশ্যই আইনসম্মত গ্রহণযোগ্য হতে হবে।যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন ।
১২) রায় ঘোষণা:—
সাধারণত যুক্তিতর্ক শুনানির পর আদালত একটি নিদিষ্ট তারিখে মামলার রায় ঘোষণা করবেন ।রায়ের মধ্যে পক্ষগণের বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু, বাদী -বিবাদীর সাক্ষীর জেরা- জবানবন্দীর বিশ্লেষণ ,বিচার্য বিষয়,সিদ্ধান্ত সম্পর্কে যুক্তি সঙ্গত আলোচনা,সর্বশেষ আদেশ ইত্যাদি ধারাবাহিক ভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে ।
(১৩) ডিক্রি প্রস্তুত:—
আদালত রায় ঘোষণার পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে ডিক্রি প্রস্তুত করবেন ।ডিক্রি সাধারণত দুই প্রকারের হয় যথা :- প্রাথমিক ডিক্রি ও চুড়ান্ত ডিক্রি ।বিশেষ কিছু দেওয়ানী মোকদ্দমার ক্ষেএে প্রথমে প্রাথমিক ডিক্রি পরে চুড়ান্ত ডিক্রি দেওয়া হয় ।
(১৪) ডিক্রি জারী :—
যদি কোন মোকদ্দমায় প্রাথমিক ডিক্রি হয় এবং উক্ত ডিক্রিতে উভয় পক্ষকে নিধার্রিত সময়ের মধ্যে ডিক্রি কার্যকর করার জন্য নিদের্শনা থাকলে তদানুসারে বিবাদী ডিক্রি কার্যকর করা হইতে বিরত থাকলে বাদী ডিক্রি জারীর জন্য আদালতে দরখাস্ত করতে পারেন ।
(১৫) রিভিউ/পূর্ণ:মুল্যায়ন :—
মোকদ্দমার বিচারকালে গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি সম্পর্কে পক্ষগণ আদালতকে অবগত করতে ব্যর্থ হলে বা উক্ত দলিল সমূহ মামলার নথিতে থাকা স্বত্তেও ভুলবশত বিচারে প্রমাণ না হলে বা অন্যকোন সঙ্গত কারণে ন্যায় বিচার ব্যাহত হলে সংক্ষুদ্ধ পক্ষ রায়টি রিভিউ করার জন্য উক্ত আদালতে আবেদন করতে পারেন ।
(১৬) আপীল ও রিভিশন:—
নিম্ন আদালতের রায়ে মামলার যেপক্ষ সংক্ষুদ্ধ হবে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই পক্ষ উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপীল কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে রিভিশন করতে পারেন । আপীল আদালত শুনানী শেষে নিম্ন আদালতের রায় বহাল বা বাতিল করতে পারেন ।
ধন্যবাদ।
মডারেটর,
HM Lawyers & Law Firm