28/07/2026
বাংলাদেশের আইনে স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হলেই সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার বা মায়ের কাছে থাকবে—এমন সরল নিয়ম নেই। সন্তানের হেফাজত (custody/হিযানত) এবং অভিভাবকত্ব (guardianship) দুটি পৃথক বিষয়। আদালতের মূল বিবেচনা হলো সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ (welfare of the minor)।
১. ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে?
সাধারণভাবে মুসলিম পারিবারিক আইনে ছোট সন্তানের দৈহিক হেফাজতের (custody) ক্ষেত্রে মায়ের অগ্রাধিকার স্বীকৃত হলেও, এটি অবিচ্ছেদ্য বা চূড়ান্ত অধিকার নয়। সন্তানের বয়স, লিঙ্গ, পারিবারিক পরিস্থিতি, মা-বাবার চরিত্র ও সক্ষমতা এবং সর্বোপরি সন্তানের কল্যাণ বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
অর্থাৎ, "ডিভোর্স হয়েছে, তাই ছেলে বাবার কাছে এবং মেয়ে মায়ের কাছে"—এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় আইনগত নিয়ম নেই।
২. মুসলিম আইনে মায়ের হেফাজতের প্রচলিত নীতি
মুসলিম আইনে প্রচলিত হিযানত নীতিতে সাধারণত—
ছেলে সন্তান—প্রচলিত সুন্নি হানাফি মত অনুযায়ী, সাধারণভাবে মায়ের হেফাজতের বয়সসীমা ৭ বছর পর্যন্ত ধরা হয়।
মেয়ে সন্তান—সাধারণভাবে বয়ঃসন্ধি (puberty) পর্যন্ত মায়ের হেফাজতের কথা বলা হয়।
তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বয়সসীমা পূর্ণ হলেই সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার কাছে চলে যাবে না।
আদালত সন্তানের welfare বা কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে পারে। ফলে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সন্তান মায়ের কাছেই থাকতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে বাবার কাছেও থাকতে পারে।
৩. Guardians and Wards Act, 1890-এর ভূমিকা
সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো The Guardians and Wards Act, 1890।
ধারা ৭ — Guardian নিয়োগ বা ঘোষণা
ধারা ৭ অনুযায়ী, আদালত যদি সন্তানের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে, তাহলে কোনো ব্যক্তিকে সন্তানের guardian হিসেবে নিয়োগ বা ঘোষণা করতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—guardian হওয়া এবং custody পাওয়া এক জিনিস নয়।
একজন পিতা সন্তানের আইনগত guardian হতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে সন্তান মায়ের কাছে থেকে তার দৈনন্দিন যত্ন, শিক্ষা ও লালন-পালন পেতে পারে।
৪. ধারা ১৭ — সন্তানের Welfare সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
Guardians and Wards Act, 1890-এর ধারা ১৭ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধারার অধীনে guardian নির্ধারণের সময় আদালত সন্তানের—
বয়স,
লিঙ্গ,
ধর্ম,
সম্ভাব্য guardian-এর চরিত্র,
তার সক্ষমতা,
সন্তানের সঙ্গে আত্মীয়তার নৈকট্য,
সন্তানের সঙ্গে পূর্ববর্তী সম্পর্ক,
এবং সন্তান যথেষ্ট বুদ্ধিমান হলে তার নিজের পছন্দ
বিবেচনা করতে পারে।
অতএব, মা বা বাবা—কে বেশি উপযুক্ত, সেটি শুধু সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়; সন্তানের সার্বিক কল্যাণের ভিত্তিতে বিচার করা হয়।
সহজ সূত্র:
Child Custody = শুধু মা বা বাবার অধিকার নয়; মূল প্রশ্ন হলো সন্তানের সর্বোত্তম কল্যাণ কোথায়।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তেও minor-এর welfare-কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫. মা-বাবা দুজনেরই কি সন্তানের কাছে যাওয়ার অধিকার আছে?
ডিভোর্সের পর সন্তান একজনের custody-তে থাকলেও, অপর পক্ষের সঙ্গে সন্তানের দেখা-সাক্ষাৎ বা visitation-এর ব্যবস্থা আদালত করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ—
সন্তান মায়ের কাছে থাকবে;
বাবা নির্দিষ্ট দিনে সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন;
ছুটির দিনে সন্তান বাবার সঙ্গে থাকতে পারে;
ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে;
আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী সাক্ষাতের সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারে।
তবে visitation বা custody জোর করে আদায় করার বিষয় নয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, minor-এর custody বা visitation-এর দাবি জোর প্রয়োগ করে বাস্তবায়ন করা যায় না; বিষয়টি মূলত minor-এর welfare-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
৬. Family Court কোন আইনে সিদ্ধান্ত দেয়?
বাংলাদেশে বর্তমানে Family Courts Act, 2023 প্রাসঙ্গিক। এর ধারা ৫ অনুযায়ী Family Court-এর একচেটিয়া এখতিয়ারের মধ্যে রয়েছে—
A.বিবাহ বিচ্ছেদ,
B.দাম্পত্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা,
C.দেনমোহর,
D.ভরণপোষণ,
E.সন্তানের guardianship ও custody।
অর্থাৎ, ডিভোর্সের পর সন্তান কার custody-তে থাকবে—এ নিয়ে বিরোধ হলে Family Court-এ প্রতিকার চাওয়া যায়।
৭. বাবা-মায়ের মধ্যে কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
Custody বা হেফাজত
সন্তান বাস্তবে কার কাছে থাকবে এবং কে তার দৈনন্দিন যত্ন নেবে।
Guardianship বা আইনগত অভিভাবকত্ব
সন্তানের আইনগত বিষয়ে কে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে।
অনেক ক্ষেত্রে মা সন্তানের custody-তে থাকলেও বাবা আইনগত guardian হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তাই "সন্তান মায়ের কাছে থাকছে" মানেই "বাবার সব আইনগত অধিকার শেষ"—এটি সঠিক নয়।
৮. কোন কোন কারণে মা custody হারাতে পারেন?
মায়ের custody কোনো absolute right নয়। যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে মায়ের কাছে থাকলে সন্তানের কল্যাণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাহলে আদালত custody পরিবর্তন করতে পারে।
যেমন—
সন্তানের প্রতি গুরুতর অবহেলা;
নির্যাতন বা abuse;
অনৈতিক বা ক্ষতিকর পরিবেশ;
সন্তানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা;
সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ অবহেলা;
এমন জীবনযাপন যা সন্তানের welfare-এর পরিপন্থী;
আদালতের আদেশ অমান্য করা;
অন্য কোনো গুরুতর কারণে সন্তানের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
Guardians and Wards Act-এর ধারা ৩৯-এ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আদালত কর্তৃক guardian অপসারণের কারণগুলো উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে abuse, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ill-treatment বা proper care না নেওয়া ইত্যাদি রয়েছে।
৯. বাবা কি শুধু বাবা হওয়ার কারণে custody পাবেন?
না।
বাবা সন্তানের পিতা—এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু custody-এর ক্ষেত্রে আদালত শুধু পিতৃত্বের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে না। আদালত দেখবে—
সন্তানের জন্য কোন custody arrangement সবচেয়ে ভালো?
যদি মা সন্তানের যথাযথ যত্ন নেন এবং সন্তানের welfare মায়ের কাছে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়, তাহলে বাবা guardian হওয়ার দাবি রাখলেও সন্তান মায়ের custody-তে থাকতে পারে।
আবার মা যদি সন্তানের জন্য অনুপযুক্ত হন এবং বাবার কাছে সন্তানের welfare বেশি নিশ্চিত হয়, তাহলে সন্তান বাবার custody-তেও যেতে পারে।
১০. সন্তান যদি বড় হয়, তার মতামত কি বিবেচনা করা হবে?
হ্যাঁ।
Guardians and Wards Act, 1890-এর ধারা ১৭(৩) অনুযায়ী, সন্তান যদি এমন বয়সে পৌঁছে যে সে বুদ্ধিসম্পন্ন ও যুক্তিসঙ্গত পছন্দ প্রকাশ করতে সক্ষম, আদালত তার পছন্দ বিবেচনা করতে পারে। তবে সন্তানের মতামতই একমাত্র সিদ্ধান্তকারী বিষয় নয়; আদালত সামগ্রিক welfare বিবেচনা করবে।
১১. বাবা-মা দুজনই যদি custody দাবি করেন তাহলে কী হবে?
ধরা যাক—
মা বলেন:
"সন্তান ছোট, এতদিন আমি লালন-পালন করেছি। তাই সন্তান আমার কাছে থাকবে।"
বাবা বলেন:
"আমি সন্তানের পিতা, আমার আর্থিক সক্ষমতা বেশি, তাই সন্তান আমার কাছে থাকবে।"
এক্ষেত্রে আদালত শুধু কার আর্থিক সামর্থ্য বেশি তা দেখবে না। বরং বিবেচনা করতে পারে—
সন্তান বর্তমানে কার কাছে আছে;
কে এতদিন যত্ন নিয়েছে;
সন্তানের বয়স;
সন্তানের শিক্ষা;
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা;
বাবা-মায়ের চরিত্র ও আচরণ;
সন্তানের সঙ্গে কার সম্পর্ক কেমন;
সন্তানের নিজের পছন্দ;
সন্তানের মানসিক স্থিতিশীলতা;
বাবা বা মায়ের নতুন বিবাহের প্রভাব;
সন্তানের ভাই-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক;
সামগ্রিকভাবে কোন পরিবেশ সন্তানের জন্য ভালো।
সুতরাং, custody মামলা মূলত বাবা-মায়ের "অধিকার" নিয়ে নয়; সন্তানের "কল্যাণ" নিয়ে।
১২. সন্তানকে জোর করে নিয়ে গেলে কী হবে?
যদি কোনো পক্ষ আদালতের custody order অমান্য করে বা শিশুকে অন্য পক্ষের custody থেকে সরিয়ে নেয়, তাহলে উপযুক্ত আইনগত প্রতিকার চাওয়া যায়।
Guardians and Wards Act, 1890-এর ধারা ২৫ অনুযায়ী, কোনো ward guardian-এর custody থেকে চলে গেলে বা সরিয়ে নেওয়া হলে, আদালত যদি মনে করে যে guardian-এর কাছে ফেরত দেওয়া শিশুর welfare-এর জন্য উপকারী হবে, তাহলে আদালত ফেরত দেওয়ার আদেশ দিতে পারে।
তবে বাস্তবে শিশুকে নিজে গিয়ে জোরপূর্বক উদ্ধার করার পরিবর্তে আদালতের আদেশের মাধ্যমে প্রতিকার নেওয়াই আইনসম্মত ও নিরাপদ পদ্ধতি।
১৩. ডিভোর্সের পর বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব কি শেষ?
না।
ডিভোর্সের কারণে বাবা সন্তানের প্রতি তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যান না। সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে আইনগত দাবি থাকতে পারে। Custody মায়ের কাছে থাকলেও সন্তানের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহনের বিষয়ে বাবার দায়িত্বের প্রশ্ন আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।
১৪. একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক, রহিম ও করিমার ডিভোর্স হয়েছে। তাদের ৫ বছরের একটি ছেলে সন্তান আছে।
সন্তান জন্মের পর থেকেই করিমার কাছে আছে এবং করিমা সন্তানের ভালোভাবে যত্ন নিচ্ছেন। রহিম সন্তানের বাবা এবং আইনগত অভিভাবকত্বের দাবি রাখেন।
এক্ষেত্রে—
সন্তান ছোট হওয়ায় মায়ের custody-এর দাবি শক্তিশালী হতে পারে;
কিন্তু আদালত শুধু বয়সের নিয়মে সিদ্ধান্ত নেবে না;
সন্তানের welfare বিবেচনা করবে;
রহিমকে সন্তানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে;
রহিমকে সন্তানের ভরণপোষণে অংশ নিতে হতে পারে;
যদি প্রমাণ হয় যে করিমার কাছে থাকা সন্তানের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে custody পরিবর্তনও হতে পারে।
১৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭টি কথা
১. ডিভোর্স হলেই সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার কাছে চলে যায় না।
২. ডিভোর্স হলেই সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে মায়ের কাছেও স্থায়ীভাবে থেকে যায় না।
৩. ছোট সন্তানের ক্ষেত্রে প্রচলিত মুসলিম আইনে মায়ের হেফাজতের অগ্রাধিকার থাকতে পারে।
৪. কিন্তু Guardians and Wards Act, 1890-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী সন্তানের welfare অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. Custody এবং guardianship এক বিষয় নয়।
৬. অপর পক্ষের visitation/সাক্ষাতের অধিকার আদালত নির্ধারণ করতে পারে।
৭. বাংলাদেশে custody ও guardianship সংক্রান্ত বিরোধে Family Courts Act, 2023-এর ধারা ৫ এবং Guardians and Wards Act, 1890 অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন
সারকথা
"ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে?"—এর সবচেয়ে সঠিক আইনগত উত্তর হলো: সন্তান যার কাছে থাকলে তার সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত হবে, আদালত মূলত সেই বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেবে। মায়ের প্রচলিত হেফাজতের অধিকার বা বাবার প্রাকৃতিক/আইনগত অভিভাবকত্ব—কোনোটিই সন্তানের welfare-এর ঊর্ধ্বে নয়।
নোট: মুসলিম, হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী পরিবারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আইন ও custody-এর নীতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। উপরের আলোচনা মূলত বাংলাদেশের Family Court কাঠামো, Guardians and Wards Act, 1890 এবং মুসলিম পারিবারিক আইনের সাধারণ নীতির আলোকে করা হয়েছে।
বিঃ দ্রঃ- নিজে জানুন এবং অন্য কে জানতে সাহায্য করুন।
Adv Abdullah Al Lali
Khulna & Dhaka Judge court.