10/11/2022
🎯🎯🎯আয়কর রিটার্ন দাখিল করার ১০টি নিঞ্জা টেকনিক
⛳সময় ও নদীর স্রোত কাহারো জন্যই অপেক্ষা করে না। ঠিক একইভাবে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিবারের ন্যয় এই বারেও আমাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময় শুরু হয়ে গেছে। তাই আমরা চাই বা না চাই, আমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক তথাপি আইনের অনুশাসন ও সুনাগরিকের দায়িত্ব প্রতিপালন সরূপ আমাদের প্রত্যেক করদাতাদের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যাদের আয় আছে এবং যাদের আয় নাই কিন্তু ই-টিন আছে তাদের প্রত্যেকেই আবশ্যিকভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
আমাদের দেশে রিটার্ন দাখিল করাকে অনেকে ঝক্কির বিষয় বলে মনে করেন। আমাদের মাঝে অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা এই যে, ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করলেই ট্যাক্স অফিসের নজরে পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে, রিটার্ন দাখিল না করলেই বরঞ্চ ট্যাক্স অফিসের নজরে পড়বে।যেহেতু, আয়কর রিটার্ন দাখিল করতেই হবে তাই কৌশলী হওয়ার বিকল্প অন্য কিছু নেই। কেননা, শুধুমাত্র কৌশলী হলেই আমরা আমাদের করের বোঝা শুধু কমাতেই পারব না বরঞ্চ আমরাও যেকোন ঝক্কি ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকব।
নিম্নে রিটার্ন দাখিল করার ১০টি নিঞ্জা টেকনিক নিয়ে আলোচনা করা হলঃ
🔴পুনশ্চঃ এই নিবন্ধের ১০টি অংশ। ট্যাক্স রিটার্ন নিয়ে তথ্য সমৃদ্দ হতে চাইলে সমগ্র নিবন্ধটি পড়ুন এবং পড়ার পড়েও যদি কোন কনফিউশন থাকে তাহলে কমেন্ট বক্সে জানান। যদি আপনার প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানার পরিধির মধ্যে থাকে তাহলে আমারা সময়মত উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। পাশাপাশি যদি এমন হয় যে, ইতিমধ্যেই আপনি সমগ্র বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন তাহলে দয়া করে নিবন্ধটি ইগ্নোর করুন। চলুন, এবার শুরু করা যাক।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-১
🟢ট্যাক্স রিটার্ন দেয়ার যোগ্য কে?🟢
প্রথমেই দেখতে হবে যে, আমি ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেয়ার যোগ্য কিনা। যদি টিন থাকে অথবা টিন নাই কিন্তু আয় আছে তাহলে আমাকে ই-টিন করে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। তারপরও যদি আপনার মনে কোন সন্দেহ জাগে সত্যিই আমি ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেয়ার যোগ্য কিনা তাহলে আয়কর নির্দেশিকা ২০২২-২৩ অনলাইন ভার্সনের ১ নং পৃষ্টায় এক বার চোখ বুলিয়ে নিন (এই পেজে আয়কর নির্দেশিকা অনলাইন ভার্সনের ২০২২-২৩ লিংক দেয়া আছে, সেখানে ক্লিক করুন)।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-২
🟢লেভেল জিরো 🟢
অনেকেই আমাদের প্রশ্ন করে “আমি কখন টিন করব?” এর সহজ উত্তর হচ্ছে যেই বছর আপনার আয় শুরু হবে সেই বছর আপনাকে ই-টিন করতে হবে এবং ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। যেমন ধরুন, ফারিয়া নামক একজন ব্যক্তি ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে চাকুরীতে যোগদান করেছেন কিংবা কোন ব্যবসা শুরু করেছেন, তাহলে তাকে এই বছর থেকে আবশ্যিকভাবে ই-টিন করতে হবে এবং রিটার্ন জমা দিতে হবে। তার জন্য এই বছর রিটার্ন জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ যখন থেকে আয় শুরু হবে কিংবা কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হবে তখন থেকে ই-টিন করা ও রিটার্ন দাখিল করতে হবে। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ই-টিন থাকলে আয় থাকুক বা না থাকুক আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৩
🟢করমুক্ত আয় বা আয়ের কর মওকুফ মানে ট্যাক্স রিটার্ন মওকুফ নয়
আমার আয় করমুক্ত এর অর্থ এই নয় যে আমার ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে না। উদাহরণ সরূপ, আমরা ফ্রিলান্সারদের আয় নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
আমাদের মধ্যে যারা ফ্রিলান্সিং করে যারা আয় করে তাদের মধ্যে অনেরকেরই মনে প্রশ্ন জাগে “ফ্রিলান্সিং বা প্রবাসীদের আয় কি সত্যিই করমুক্ত?” এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে যদি আয়টি আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ৬ষ্ঠ তফসীলের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে আনয়ন করা হয় এবং আবশ্যিকভাবে যদি ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করা হয় তবেই টা করমুক্তের আওতায় পড়বে। মোদ্দকথা, করমুক্ত দাবি করতে হলে ৩টি প্রধান শর্ত পালন করতে হবে। যথাঃ
১)আয়টি আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ৬ষ্ঠ তফসীলের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে;
২) অর্জিত অর্থ (ফরেন রেমিট্যান্স) ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আনতে হবে;
৩) প্রতি বছর ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
আসুন শর্ত সমূহ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা যাক।
এবার ১ম শর্ত, ফ্রিলান্সারদের জন্য করমুক্ত খাত নিয়ে আলোচনায় আশা যাক। সরকার নির্ধারিত খাত অর্থাৎ আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ৬ষ্ঠ তফসীলে অন্তর্ভুক্ত খাতসমূহ নিম্নরূপ(আয়কর নির্দেশিকা ২০২২-২৩ এর অনলাইন ভার্সন এর ৫৫ পাতায় উল্লেখ করা আছে)।
২য় শর্ত, অর্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, আমার টাকা করমুক্ত দাবি করতে হলে অবশ্যই ব্যাংকের মাধ্যমে আনার প্রমাণপত্র অর্থাৎ ব্যাংক একাউন্ট এর স্টেটমেন্ট ও রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে।
৩য় শর্ত, প্রতি বছর ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে হবে। অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, আমার আয় তো কর মুক্ত তাহলে আমি কেন ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিব? আপনি যদি আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ধারা ৪৪ এর উপধারা (৫) পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, এখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে অর্জিত আয় করমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে না।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৪
🟢শেষ থেকে শুরু🟢
ড্যাটা, ড্যাটা এবং ড্যাটা। এই ড্যাটা মানে কোন সবজি না, এই ড্যাটা মানে তথ্য। অর্থাৎ রিটার্ন জমা দেয়া মানে আমার সমস্ত আর্থিক তথ্য জমা দেয়া। আর্থিক তথ্য জমা দেয়ার সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে, ডকুমেন্ট সংগ্রহ করা। অর্থাৎ অর্থ বছরের সর্বশেষ তারিখ ৩০ জুন ২০২২ থেকে শুরু করে আগের সব আর্থিক লেনদেনের তথ্য একাট্টা করতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে আমরা কি কি ডকুমেন্ট সংগ্রহ করব? এর উত্তর হচ্ছে, প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে যে, আমি কোন শ্রেণীর করদাতা। অর্থাৎ, আমি চাকুরীজীবী অথবা ব্যবসায়ী অথবা ডাক্তার ইত্যাদি। আমি যেই শ্রেণীর করদাতা সেই শ্রেণি অনুযায়ী ডকুমেন্ট সংগ্রহ করব। এই পেজে একটি চেকলিস্ট দেয়া আছে। আপনি প্রয়োজন মনে করলে, সেই চেকলিস্ট অনুযায়ী মিলিয়ে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে পারেন।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৫
🟢সব কিছু ভাগভাগি করে নিন🟢
আপনার যে সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম হয়েছে, সেগুলেকে মোটা দাগে ভাগ করুন। অর্থাৎ আপনার সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ৬টি ভাগে ভাগ করে নিলে আপনার ট্যাক্স রিটার্ন পূরণ করতে সুবিধা হবে। যথাঃ ১) আয়ের হিসাব {কোন কোন খাত থেকে আয় হচ্ছে যেমন, বেতন খাত, FDR এর মুনাফা, করমুক্ত আয় (ফ্রিলান্সারদের আয়) ইত্যাদি}। ২) ব্যয়ের খাত (কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে যেমন, পারিবারিক খরচ, বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়া ইত্যাদি)। ৩) পূর্ববর্তী সম্পদ (৩০ শে জুন ২০২১ পর্যন্ত যেই সম্পদ গুলো অর্জিত হয়েছে, যেমন, জমি-জমা, ব্যাংকের টাকা, গাড়ি ইত্যাদি)। ৪) বর্তমান সম্পদ (১ লা জুলাই ২০২১ থেকে ৩০ শে জুন ২০২২ পর্যন্ত অর্জিত সম্পদ, যেমন, জমি-জমা, ব্যাংকের টাকা, গাড়ি ইত্যাদি)। ৫) দান ও ঋণ ৬) বিনিয়োগ (সরকার নির্ধারিত বিনিয়োগের খাত, যেমন, সঞ্চয় পত্র, জীবন বীমার প্রিমিয়াম ইত্যাদি)। মোদ্দকথা, একটি ট্যাক্স রিটার্নে সাম্ভাব্য সকল তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করুন । প্রথমেই বের করার চেষ্টা করুন আপনার আয় কোনটি। এই আয়ের উপরই কর নির্ধারণ হবে। তারপর সারা বছর কি কি খাতে খরচ করেছেন তার একটি হিসাব করুন। এরপর আপনার সম্পত্তি চিহ্নিত করুন। যেমন ধরুন, আপনি গাড়ি কিনেছেন। এই গাড়ি ক্রয় করা ব্যয় নয় বরঞ্চ সম্পদ। এভাবে সম্পদগুলো আলাদা করুন। এবার দান নিয়ে কথা বলা যাক। তারপর ধরুন, আপনি যদি আপানর স্ত্রীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে কোন অর্থ দান করে থাকেন তাহলে তার স্বপক্ষে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করুন। এখানে একটি বিষয় হচ্ছে যে, দানের ক্ষেত্রে দানের বিষয় দুইজনের ট্যাক্স ফাইলে প্রতিফলন থাকতে হবে। যেমনঃ ধরুন, জনাব রহিম তার স্ত্রী মিসেস করিমন বিবিকে ৫ লক্ষ টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে দান করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, দুই জনের ট্যাক্স ফাইলে এই ৫ লক্ষ টাকা দানের তথ্য প্রকাশ করতে হবে। অর্থাৎ জনাব রহিমের ট্যাক্স ফাইল থেকে ৫ লক্ষ টাকা দান হিসেবে বিয়োগ হবে অন্যদিকে মিসেস করিমন বিবির ফাইলে ৫ লক্ষ টাকা দান হিসেবে যোগ হবে। তথাপি, দানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করতে হবে। অর্থাৎ, তাদের বলতে হবে যে, তারা কি কারণে একজন আরেকজনকে দান করেছেন। সর্বশেষে হচ্ছে, ঋণ। ঋণ অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে হতে হবে এবং ঋণের স্বপক্ষে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে হবে।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৬
🟢সরকারী বনাম বেসরকারি🟢
সরকারী চাকুরীজীবীদের মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস (যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) ব্যতিত সকল আয় করমুক্ত। অর্থাৎ, সরকারী চাকুরীজীবীদের মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস (যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) করযোগ্য আয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কাদের আয় সরকারী চাকুরীজীবীদের আয়ের মত ট্যাক্স গণনা হবে? এর উত্তর হচ্ছে, আয়কর নির্দেশিকা অনলাইন ভার্সন এর পেজ ২১ পৃষ্টায় একটা তালিকা দেয়া আছে সেই তালিকায় যারা পড়ে তারা সরকারী চাকুরীজীবী হিসেবে গণ্য হবে।
অন্যদিকে, যারা বেসকারি চাকুরীজীবী তাদের মূল বেতন, উৎসব ভাতা, সম্মানী ভাতা, ওভারটাইম ভাতা ইত্যাদি সব করযোগ্য আয়। কিন্তু, কিছু শর্ত সাপেক্ষে চিকিৎসা ভাতা, বাড়ী ভাড়া ভাতা, যাতায়াত ভাতার কিছু অংশ করমুক্ত।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৭
🟢অডিটে পড়ার কারণ🟢
অডিট আপত্তি আয়কর আইনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটি আয়কর নথি বিভিন্ন কারণে অডিটে পড়তে পারে। সাধারণত আয়-ব্যয়, সম্পদের ধারাবাহিকতা বা অসামাঞ্জস্যতাই অডিটের পড়ার মূল কারণ। উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করা হল।
ঘটনার বিবরণ-১
মো. মনির একজন বাড়িওয়ালা। তিনি প্রতি বছর বাড়িভাড়া বাবদ ১২ লাখ টাকা আয় করেন। সঠিকভাবে কর পরিশোধ করেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়কর নথি কর অফিসে জমা করেছেন। কিন্তু তার ফাইল অডিটে পড়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, তিনি তো সঠিকভাবে আয়কর পরিশোধ করলেন, তাহলে কেন তার ফাইল অডিটে পড়লো।
ঘটনার বিশ্লেষণ
যদিও মো. মনির সঠিকভাবে আয়কর পরিশোধ করেছেন কিন্তু তিনি আইনানুগ দায়িত্বে অবেহেলা করেছেন। যেমন, তিনি বাড়িভাড়া ব্যাংকে রাখেননি। কোনো ধরনের কোনো হিসাবের খাতা তৈরি করেননি। এছাড়াও তিনি বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্রও জমা দেননি। সুতরাং, আয়কর রিটার্ন শুধু জমা দিলেই হবে না, আয়কর রিটার্নের সঙ্গে আয়ের স্বপক্ষে দলিলাদিও জমা দিতে হবে।
উদাহরণটি যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে সহজেই বোধগম্য হবে, পরিপূর্ণ দলিলাদি দাখিলের অভাবেই আয়কর নথি অডিট আপত্তির আওতায় আসতে পারে। এছাড়াও আরোও কয়েকটি কারণ নিম্নে দেয়া হল-
১) কর-অব্যাহতি প্রাপ্ত আয় প্রদর্শন করা হয়েছে এরূপ ক্ষেত্রে কর-অব্যাহতি প্রাপ্ত আয়ের সপক্ষে উপযুক্ত দলিলাদি উপস্থাপন করা হয় নাই।
২) যে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আয় বছরে এক বা একাধিক উৎস হতে ৫লক্ষ টাকার অধিক ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু উক্ত ঋণের সপক্ষে ব্যাংক দলিল উপস্থাপন করা হয় নাই অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা নেয়ার প্রমানপত্র নাই।
৩) সংশ্লিষ্ট অর্থ বছরে কোন দান গ্রহণ করলে এবং ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহৃত না হলে।
৪) রিটার্নে কোন বছর কর ফেরত দাবী করলে এবং এর স্বপক্ষে কোন তথ্য প্রমাণ না থাকলে।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৮
🟢ফাইল অডিটে পড়লে করণীয়🟢
যদি ট্যাক্স ফাইল অডিট আপত্তি হয়েই যায় তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে অডিট আপত্তির মোকাবিলা করতে হবে। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যখন অডিটের নোটিশ আসে তখন সেই নোটিশে আয়কর নথি অডিটে পড়ার কারণ উল্লেখ থাকে। একজন করদাতার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে কারণগুলোর যথাযথ অনুসন্ধান করা। অর্থাৎ, কারণগুলোর জবাব খুঁজে বের করা।
প্রত্যেকটি কারণের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়াও যেসব নথিপত্র তলব করা হয়েছে যতটুকু সম্ভব সেসব নথিপত্র দাখিল করতে হবে। যেমনঃ ধরুন, মোকলেস সাহেবের বেতনের ব্যাংক বিবরণী তলব করা হয়েছে। তাহলে মোকলেসকে অডিটের জবাবের সঙ্গে ব্যাংক বিবরণী দাখিল করতে হবে। মোদ্দাকথা, দলিলাদি বা ডকুমেন্টের কোনো বিকল্প নেই।
ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘Prevention is better than cure’ অর্থাৎ রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। তাই আয়কর নথি দাখিল করার সময় আয় ও সম্পদের ধরন অনুযায়ী একটা চেকলিস্ট তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে(এই পেজের অন্য একটি পোস্টে একটি চেকলিস্ট দেয়া আছে) এবং সে অনুযায়ী দলিলাদি সংগ্রহ করে রিটার্ন এর সাথে জমা দিতে হবে। তাহলেই অডিটে পড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।
🔷নিঞ্জা টেকনিক-৯
🟢সার্বজনীন স্বনির্ধারনী বনাম সাধারণ🟢
একটি রিটার্ন সাধারণত ২টি পদ্ধতিতে দাখিল করা যায়।
সার্বজনীন স্বনির্ধারনী পদ্ধতি
সার্বজনীন স্বনির্ধারনী পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে করদাতা তার নিজের আয় নিজে নিরূপণ করে থাকেন এবং প্রযোজ্য হারে আয়কর পরিশোধ করেন। এই পদ্ধতিতে একজন করদাতাকে তার আয়কর রিটার্ন প্রতি বছর ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে অথবা উপ-কর কমিশনার কর্তৃক মঞ্জুরকৃত বর্ধিত সময় (টাইম পিটিশনের আবেদন মঞ্জুর করা সাপেক্ষে) ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। এভাবে করদাতাকে যে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র প্রদান করা হয় তাই কর নির্ধারণী আদেশ বলে গণ্য হয়।
পরবর্তীতে, এই রিটার্ন যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত মাপকাঠির ভিত্তিতে অসংগতি ধরা পড়ে তাহলে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হলে নোটিশের মাধ্যমে করদাতাকে অবহিত করা হবে।
সাধারণ পদ্ধতিতে রিটার্ন
একজন করদাতা যখন ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে অথবা উপ-কর কমিশনার কর্তৃক মঞ্জুরকৃত বর্ধিত সময় (টাইম পিটিশনের আবেদন মঞ্জুর করা সাপেক্ষে) এর মধ্যে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল জমা দিতে ব্যর্থ হয় এবং করদাতার কর নির্ধারণ উপ-কর কমিশনার এর উপর অর্পণ করে থাকেন তখন তাকে সাধারণ পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করা বলে। এই পদ্ধতির আওতায় দাখিলকৃত রিটার্নের ক্ষেত্রে প্রাপ্তি স্বীকারপত্রটি কর নির্ধারণ আদেশ বলে গণ্য হয় না।
সাধারণত এই পদ্ধতিতে করদাতাকে নোটিশ প্রদান করে শুনানির মাধ্যমে কর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
🟢কমন প্রশ্ন 🟢
প্রশ্নঃ আমার ই-টিন আছে কিন্তু আমার আয় তিন লক্ষ টাকার নিচে আমাকে কি ট্যাক্স দিতে হবে কিংবা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে ?
জবাবঃ নিয়মানুযায়ী ই-টিন বা টিন থাকলে রিটার্ন জমা দিতে হবে তবে, যেহেতু আপনার আয় তিন লক্ষ টাকার নিচে তাই ট্যাক্স দিতে হবে না।
প্রশ্নঃ আমি ছাত্র/ গৃহিণী, ব্যাংক একাউন্ট খোলার জন্য ই-টিন করেছিলাম, আমাকে কি ট্যাক্স দিতে হবে কিংবা ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে ?
জবাবঃ যেহেতু, ই-টিন আছে তাই আয় থাকুক আর না থাকুক রিটার্ন জমা দিতে হবে, আর করযোগ্য আয় না থাকলে ট্যাক্স দিতে হবে না।
প্রশ্নঃ আমার ই-টিন ৩বছর আগে করেছিলাম কিন্তু রিটার্ন জমা দেই নাই, এখন আমি কি করব?
জবাবঃ আপনার যদি ৩ বছর আগে থেকে করযোগ্য আয় থাকে তাহলে আপনার ৩ বছরের রিটার্ন দেয়া উত্তম তবে খেয়াল রাখতে হবে সেক্ষেত্রে সরল সুদ ও জরিমানা হতে পারে। আর যদি করযোগ্য আয় না থাকে তাহলে বর্তমান কর বছরের রিটার্নটি জমা দিতে পারেন।
প্রশ্নঃ আমার বাবা আমাকে ৫ কাঠা জায়গা দান করেছে, আমাকে কি ট্যাক্স দিতে হবে?
জবাবঃ ট্যাক্স দিতে হবে না, কিন্তু রিটার্নে দেখাতে হবে, পাশাপাশি দান দলিল ও আনুসাঙ্গিক কাগজপত্র যেমনঃ পর্চা, মিউটিসন ইত্যাদি দিতে হবে।
প্রশ্নঃ আমার বাবা মারা গেছে এখন তার সম্পত্তি কিভাবে আমার ট্যাক্স ফাইলে অন্তর্ভুক্ত করব?
জবাবঃ বাবার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকার সুত্রে বণ্টন হবে। এ ক্ষেত্রে উক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকারিদের সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্তি করতে প্রমানপত্র হিসেবে বণ্টন নামা দলিল বা অন্য কোন যৌক্তিক প্রমান পত্র থাকতে হবে। যেহেতু উক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত তাই এই সম্পদের উপর কোন কর ধার্য হবে না। এ ক্ষেত্রে উপ-কর কমিশনার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
ন্যতম কর কি এবং সেটা কত?
জবাবঃ নুন্যতম কর মানে হল, ১ টাকা ট্যাক্স হলেও সরকার নির্ধারিত একটি কর আছে সেটি দিতে হবে, যেমনঃ ঢাকা(উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি কর্পোরেশনের জন্য নুন্যতম কর ৫ হাজার অর্থাৎ কারো যদি ১ হাজার টাকাও ট্যাক্স হয় তাও ৫ হাজার টাকা ট্যাক্স দিতে হবে। সরকার নির্ধারিত নুন্যতম কর হলঃ
ঢাকা(উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি কর্পোরেশনের ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য নুন্যতম কর ৫ হাজার,
অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের জন্য ৪ হাজার টাকা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকা ব্যতীত অন্যান্য এলাকার জন্য ৩ হাজার টাকা
প্রশ্নঃ ট্যাক্স অফিসে যেয়ে রিটার্ন জমা দিব সেক্ষেত্রে ট্যাক্স রিটার্নের ফর্ম কোথা থেকে সংগ্রহ করব?
উঃ এই লিঙ্কে পাবেনঃ https://nbr.gov.bd/form/income-tax/eng
প্রশ্নঃ আমি রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত হতে পারে?
জবাবঃ রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা নির্ধারণ করে সম্মানিত উপ-কর কমিশনার। এই বিষয়ে ধারনা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রশ্নঃ আমাকে একজন বলেছে আমার আয় ৩ লাখ টাকার নিচে তাই আমাকে ট্যাক্স রিটার্ন দিতে হবে না, আপনারা বলছেন করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন দিতে হবে, কোনটা বিশ্বাস করব?
জবাবঃ আমাদের কথা বা অন্য কারো কথা বিশ্বাস করার দরকার নাই। আপনি আয়কর নির্দেশিকা পড়ে দেখুন। তাহলে আপনি নিজেই বুজতে পারবেন, আপনাকে ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে কি হবে না। আয়কর নির্দেশিকা অনলাইন ভার্সনের ১থেকে ৪ নং পৃষ্টায় এক বার চোখ বুলিয়ে নিন( এই পেজে আয়কর নির্দেশিকা অনলাইন ভার্সনের লিংক দেয়া আছে, সেখানে ক্লিক করুন)।
প্রশ্নঃআমার ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিব শুধু প্রাপ্তি স্বীকার পত্র পাওয়ার জন্য, কোন সম্পত্তি দেখাব না, এতদিন কোন সম্পত্তি দেখাই নাই এমনকি ট্যাক্স রিটার্নও জমা দেই নাই আমাকে কিভাবে ধরবে?
উঃ এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই।
প্রশ্নঃট্যাক্স রিটার্ন জমা না দিলে কি হবে?
উঃ ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দিলে বিভিন্ন ধরণের সেবা যেমনঃ ক্রেডিট কার্ড সেবা কিংবা গাড়ি রেজিস্ট্রেশন সেবা ইত্যাদি সেবা থেকে বঞ্ছিত হতে পারেন। এছাড়াও ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার বিধান করা আছে।
প্রশ্নঃআবার অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, আমি ভুলে আনেক আগে ই-টিন করেছি, আমার কোন আয় নাই, আমি কেন ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিব?
উঃ দুঃখিত আপনার প্রশ্নের ১ম অংশের এই শব্দযুগল “ভুলে আনেক আগে ই-টিন করেছি” এর সাথে একমত নই। কেননা, একটা ই-টিন করতে অনেক ধরণের ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয়, এত গুলো ব্যক্তিগত তথ্য কেউ এক সাথে ভুলে দিতে পারে বলে আমার মনে হয় না।
আপনার প্রশ্নের ২য় অংশের উত্তর হচ্ছে, ই-টিন থাকলেই ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে। আপনার আয় থাকা বা না থাকা কোন মুখ্য বিষয় না।
পরিশেষে বলতে হয়, যদিও ৩০ নভেম্বর আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার শেষ সময়, অর্থাৎ এই নয় যে, নভেম্বরে রিটার্ন জমা দিতে হবে। শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে আগভাগেই রিটার্ন তৈরি করে জমা দিন।
শেষ কথা, আল-কোরানের একটি শব্দ হচ্ছে ‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়’। তাই আমিও বলবো পড়ুন। ট্যাক্স রিটার্ন আপনার নিজস্ব সম্পত্তি তাই ভুল হলে আপনাকেই ভুগতে হবে। রিটার্ন পূরণ করার আগে আয়কর নির্দেশিকা, আয়কর পরিপত্র ও আয়কর অধ্যাদেশ ভালো ভাবে বেশ কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, আর তা নাহলে, আমাদের ট্যাক্স রিটার্নের অবস্থা হবে, “সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা”। তখন যার কাছেই যান না কেন “সময় গেলে আর সাধন হবে না”। সুতরাং সময় থাকতে হও সচেতন।
প্রশ্নঃ ট্যাক্স সার্টিফিকেট নিলে কি ট্যাক্স ফাইল অডিটে পড়বে?
উঃ ট্যাক্স সার্টিফিকেটের সাথে অডিট আপত্তির কোন সম্পর্ক নাই। ট্যাক্স সার্টিফিকেট এ উল্লেখ থাকে আপনি ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এই সার্টিফিকেট কখনোই এটা ঘোষণা করে না যে আপনি অডিট আপত্তির সম্মুখীন হবে না।
The National Board of Revenue (NBR) is the apex authority for tax administration in Bangladesh. It was established by the father of the nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman under President's Order No. 76 of 1972.