08/11/2023
"' রীট-Writ ""
উৎপত্তির ইতিহাস:
রীট (Writ) শব্দের অর্থ হল আদালত বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ঘোষিত বিধান বা আদেশ। রীটের উৎপত্তি ও বিকাশ ইংল্যান্ডে। প্রথমে রীট ছিল রাজকীয় বিশেষাধিকার(royal prerogative)। রাজা বা রানী বিচারের নির্ধারক হিসাবে(fountain of justice) রীট জারী করতে পারত। একমাত্র রাজা বা রানীর রীট জারী করার অধিকার ছিল বলে একে প্রথমে বিশেষাধিকার রীট বলা হত।
রাজা বা রানী তাদের কর্মচারী বা অফিসারদের কার্যবালি পালনে বাধ্য করার জন্য বা কোনো অবৈধ কাজ হতে বিরত রাখার জন্য রীট জারী করতেন। পরবর্তীকালে রাজা বা রানীর এই বিশেষাধিকার নাগরিকদের অধিকারে চলে আসে। নাগরিকগণ সরকারী কর্মকর্তাদের আচরণ ও কাজে ক্ষুদ্ধ হয়ে রাজার কাছে আসত এবং রাজা বা রানী তাদের বিশেষ অধিকার বলে রীট জারী করত। পরবর্তীকালে রাজা বা রানীর প্রতিনিধি হিসাবে ইংল্যান্ডে দুধরনের আদলত গটিত হয় যেমন, চ্যান্সারী আদালত এবং কিংস বেঞ্চ (kings bench) এসব আদালত নাগরিকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রীট জারী করত।
বাংলাদেশের সংবিধান হাইকোর্ট বিভাগকে শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রে আদি এখতিয়ার দিয়েছে। সেটি হল রীট জারীর এখতিয়ার। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ কারো মৌলিক অধিকার লংঘিত হলে তা বলবৎ করতে পারে এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনাকে কার্যকর করতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগের এই এখতিয়ার কে রীট জারীর এখতিয়ার বলে। অর্থাৎ রীট শুধু মাত্র হাইকোর্ট বিভাগ জারী করতে পারে। কারো মৌলিক অধিকার লংঘিত হলে সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত অধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মৌলিক অধিকার বলবত করার জন্য রীট পিটিশন দায়ের করতে পারে এবং হাইকোর্ট বিভাগ ১০২ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মৌলিক অধিকার বলবত করার জন্য কতিপয় আদেশ নির্দেশ জারী করতে পারে।
"রীটের প্রকারভেদ"
সংবিধানের ১০২ নং অনুচ্ছেদে রিট সম্পর্কে আলোচনা থাকলেও রিট যে পাঁচ প্রকার তা উল্লেখ নেই ।তবে উক্ত অনুচ্ছেদে প্রতিটি রিটের যে উপাদান বর্ণীত হয়েছে তার বিশ্লেষণ থেকে পাঁচ প্রকার রিটের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ,যার বিবরণ নিচে তুলে ধরা হল পাঁচ প্রকার রীট (Writ)
১/ বন্দী প্রদর্শন (Writ Of Habeas Corpus)
Habeas কথাটির শাব্দিক অর্থ হলো"Have his body" অর্থ্যাৎ"To have the body before the court "অর্থ্যাৎ বন্দী ব্যক্তিকে স্বশরীরে হাজির করা ।
কোন ব্যক্তিকে সরকার বা অন্য কেউ আটক করলে কি কারণে তাকে আটক করা হয়েছে তা জানার জন্য বন্দীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে উচ্চতর আদালত আটককারীকে যে আদেশ দিয়ে থাকেন তাকে বন্দী প্রদর্শন রিট বলে।
২/পরমাদেশ বা হুকুমজারি রীট (Writ Of Mandamus) Mandamus একটি ল্যাটিন শব্দ। এর অর্থ হলো "We command" অর্থ্যাৎ আমরা আদেশ বা হুকুম করছি।
কোন অধঃস্তন আদালত, ট্রাইবুনাল, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি তার আইনগত দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করে কিংবা ব্যর্থ হয় তাহলে উচ্চতর আদালত যে আদেশের মাধ্যমে উক্ত আইনগত দায়িত্ব পালন করতে উক্ত আদালত বা ট্রাইব্যুনালকে বাধ্য করে তাকে হুকুমজারি রীট বা পরমাদেশ বলে।
৩/উৎপ্রেষণ রীট (Writ Of certiorari): সুপ্রিম কোর্টের নিম্ন আদালত থেকে আসা আপীল শুনানী করার সিদ্ধান্ত। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা কত্রিপক্ষ বা কোন অধস্তন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল এর আদেশ বা কার্য ধারা আইনানুগ না হয়ে থাকলে সেই আদেশকে অকার্যকর ঘোষণা করে যে আদেশ দিতে পারেন তাই হল উতপ্রেষণ রিট বা Writ of certiorari ।
৪/কারণ দর্শাও রীট (Writ of Quo Warranto):
কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোন সরকারি পদ দাবী করে যে পদের যোগ্যতা তার নেই অথবা অবৈধভাবে যদি কোনো সরকারি পদ দখল করে বসে থাকে, তাহলে উচ্চতর আদালত যে আদেশের মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তিকে তার পদ দখলের বা দাবীর কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়ে থাকে তাকে কারণ দর্শাও রীট বলে। এই রীটের মাধ্যমে উচ্চতর আদালত উক্তরূপ দাবীর বৈধতা অনুসন্ধান করে এবং দাবী বা দখল যদি অবৈধ প্রমাণিত হয় তাহলে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদচ্যুত করার নির্দেশ দিতে পারে।
৫/ প্রতিষেধক বা নিষেধাজ্ঞামূলক রীট (Writ of Prohibition): উচ্চ আদালত (সাধারণতঃ সুপ্রিম কোর্ট) থেকে নিম্ন আদালতের উপর হুকুম যে, মামলার ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়া - কারণ সেই মামলা নিম্ন আদালতের এক্তিয়ার বহির্ভূত।
*রীট মামলা সংক্রান্ত আলোচনা।
সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদঅনুযায়ী কারো মৌলিক লঙ্গিত হলে হাইকোর্ট তা বলবত করতে পারে এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনাকে কার্যকর করতে পারে যা হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার নামে পরিচিত ।
বাংলাদেশের সংবিধান হাইকোর্ট বিভাগকে শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রে আদি এখতিয়ার দিয়েছে। সেটি হল রীট জারীর এখতিয়ার। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ কারো মৌলিক অধিকার লংঘিত হলে তা বলবৎ করতে পারে এবং বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনাকে কার্যকর করতে পারে।
হাইকোর্ট বিভাগের এই এখতিয়ারকে রীট জারীর এখতিয়ার বলে।
অর্থাৎ রীট শুধু মাত্র হাইকোর্ট বিভাগ জারী করতে পারে। কারো মৌলিক অধিকার লংঘিত হলে সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত অধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মৌলিক অধিকার বলবত করার জন্য রীট পিটিশন দায়ের করতে পারে এবং হাইকোর্ট বিভাগ ১০২ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মৌলিক অধিকার বলবত করার জন্য কতিপয় আদেশ নির্দেশ জারী করতে পারে।
আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার সমুহ বলবৎ করার জন্যে ৪৪ নং অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ১০২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পাঁচটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। তারমানে, সংবিধানের তৃতীয় ভাগে কতিপয় মৌলিক অধিকারের সংরক্ষণ বা স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, যা নাগরিক হিসেবে আমি আপনি সবাই সমানভাবে ভোগ করার অধিকার রাখি।
"কি আছে সেসব মৌলিক অধিকারের তালিকায়? মৌলিক অধিকারগুলো জেনে নেয়া যাক।
অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং সবাই সমান আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সকল নাগরিকের মধ্যে আইনের সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যখনই কেউ আইনের সাম্য নষ্ট করেন তার বিরুদ্ধে এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।,
অনুচ্ছেদ ২৮, সকল ধর্ম, বর্ণ, নারী পুরুষ ও জন্মস্থান ভেদে রাষ্ট্র যেন বৈষম্য না করতে পারে তার বিধান দেয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ২৯, সরকারী পদে নিয়োগ লাভে সকল নাগরিকের সাম্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩১, সকল নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনী প্রক্রিয়া ব্যতীত কোন নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটানো যাবে না। অর্থাৎ পুলিশ চাইলেই যে কাউকে তুলে নিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনী প্রক্রিয়া শুরু না করে কাউকে গ্রেপ্তারও করতে পারবে না।
অনুচ্ছেদ ৩২, যথাযথ আইনই প্রক্রিয়া ছাড়া কোন নাগরিকের ব্যক্তি ও জীবনের স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না।
অনুচ্ছেদ ৩৩, এখানে ব্যক্তির গ্রেপ্তার ও আটক বিষয়ে রক্ষাকবচ দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তিকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের কারণ যথাশীঘ্র উল্লেখ না করে আটক রাখতে পারবে না এবং তাকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার সুযোগ দিতে হবে। তাছাড়া, আটকের পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আটককৃত ব্যক্তিকে আদালতে উপস্থাপন করবে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য। তবে যদি তাকে কোন নিবর্তন মূলক আইনে আটক করা হয় বা সেই ব্যক্তি বর্তমানে দেশের শত্রু হয় তবে তার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না। এটি সংবিধানের মূল ধারার সাথে সাংঘর্ষিক হলেও নিবর্তন মূলক আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
কেনইবা এই স্ববিরোধীতা?
অনুচ্ছেদ ৩৪, এর মাধ্যমে বাধ্যতামুলক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ জোর করে কাউকে দিয়ে শ্রম আদায় করতে পারবে না। এই অনুচ্ছেদে দুটি ব্যতিক্রম আছে- যেমন শ্রম যদি কারাভোগের অংশ হয় তাহলে বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করা যাবে আর দ্বিতীয়টি হল যদি জনগণের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তা আবশ্যক মনে হয়। যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্র মনে করবে বাধ্যতামুলক শ্রম জনগণের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে প্রয়োজন তা কোথাও উল্লেখ নেই। এখানে আইনের অস্পষ্টতা রয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৫, এর মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধের বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে যদি কোন কাজ অপরাধের পর্যায়ে না পড়ে তাহলে পরবর্তীতে নতুন আইন করে সেই কাজকে অপরাধ হিসেবে সজ্ঞায়িত করে তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। একে আমরা ইংরেজিতে বলি “রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট”, এই নিয়ম পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আছে। একই অনুচ্ছেদের ২ নং উপ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য একাধিকবার অভিযোগের মাধ্যমে বিচার ও দণ্ড দেয়া যাবে না। অর্থাৎ কোন অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির একবারই বিচার হবে। এই অনুচ্ছেদের ৪ নং উপ-অনুচ্ছেদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ- এতে বলা হয়েছে, কোন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী পুলিশ “রিমান্ড” নামক ভয়ানক পদ্ধতির মাধ্যমে যেসব স্বীকারোক্তি আদায় করেন এবং সেসব স্বীকারোক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?
আইনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থান বজায় রেখেই চলছে আমাদের ফৌজদারি শাসন ব্যবস্থা।
অনুচ্ছেদ ৩৬, এতে নাগরিকের আইনসংগত ভাবে বসবাস ও চলাফেরার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭, এতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৮, এর মাধ্যমে আইনসঙ্গত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে সংগঠন করার অধিকার দেয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৯, এর মাধ্যমে বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৪০, এর মাধ্যমে পেশা বা বৃত্তি নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৪১, এর মাধ্যমে সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিধান করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৪২, এর মাধ্যমে সম্পত্তির উপর নাগরিকের অধিকার এবং সেই সম্পত্তি রাষ্ট্র যেন বাধ্যতামূলক অধিগ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ও দখল করতে না পারে তার বিধান দেয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৪৩, এর মাধ্যমে আইনগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকের গৃহে প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক থেকে নিরাপত্তাসহ চিঠিপত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার দেয়া হয়েছে।
চলমান....
"তথ্যসূত্র"
*বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থা।
*সংবিধান,সাংবিধানিক আইন ও রাজনীতি, বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।
*গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।
*ক্লাসের শ্রুতি লিখন।
ও বিভিন্ন ব্লগ।
ইমরান হোসেন
আইন বিভাগ
(আইআইইউবি)