05/02/2026
প্রেম করে বিয়ের অপরাধে অপহরণের মামলা ও তার আইনী ফলাফল
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
আপনি ভালবেসে বিয়ে করেছেন। কিন্তু আপনার শশুড় শাশুড়ী ও তাদের আত্মীয় স্বজন এ বিয়েতে রাজী নন। তারা আপনার বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেছেন। আপনি নাকি ফুসলিয়ে মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে গেছেন। কন্যার পরিবারের পিতা, মাতা বা আত্মীয় স্বজন যে কেউ বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৩০ ধারায় মামলা করেছেন। কন্যার ভালবাসাকে তারা মূল্যায়ন করছেন না। এ জাতীয় মামলার শিকার হলে আপনার চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। এ মামলায় আপনি লড়ে গেলে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
একটি কেস স্টাডি দিয়েই লেখাটি শুরু করতে চাই। গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের পরিপাটি চেহারার ভদ্রলোক মামলা করেছেন থানায়। আসামী একজন তরুণ স্কুল শিক্ষক। ভদ্রলোকের অভিযোগ, শিক্ষক বেচারা ভদ্রলোকের স্কুল পড়ুয়া নাবালিকা মেয়েকে ফুসলিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। অপরাধ খুবই গুরুতর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় যুবক শিক্ষক অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সহসা জামিনের আশা নেই। কারণ, প্রথমত জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধ, দ্বিতীয়ত এ মামলায় জামিন দেয়ার এখতিয়ার সাধারণত নিম্ন আদালতের নেই। সে কারণে অভিযোগকারী ভদ্রলোক মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন আসামীকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে শিক্ষক বেচারা গা-ঢাকা দিয়েছে। বাড়িতে আছেন কেবল যুবক স্কুল শিক্ষকের মা-বাবা এবং কথিত অপহরণ করা কিশোরী মেয়েটি। পুলিশ আসামীর বাড়ি থেকে মেয়েটি অর্থাৎ ভিকটিমকে উদ্ধার করে আদালতে সোপর্দ করে। ভিকটিম মেয়েটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দিতে স্বীকার করে যে, সে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে, অন্যের বিনা প্ররোচনায়, সুস্থ মস্তিষ্কে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে বিয়ে করে সংসার করছেন। অন্যদিকে পুলিশ এ মামলায় চার্জশিট দাখিল করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় নারী ও শিশু অপহরণের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো নারী বা শিশুকে অপহরণ করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অন্যূন ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হবে।
বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি আইনের ৩৬১ ধারায় পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি পুরুষের ক্ষেত্রে ১৪ বছরের কম বয়স্ক অথবা নারীর ক্ষেত্রে ১৬ বছরের কম বয়স্ক কোনো নাবালিকাকে আইনানুগ অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া নিয়ে যায়, সেই ব্যক্তি অনুরূপ নাবালক বা নাবালিকাকে অপহরণ করেছে বলে গণ্য হবে।' এখানে উল্লেখ্য, দন্ডবিধির এ ধারায়' স্বেচ্ছায়', 'স্বজ্ঞান', 'অসাধুভাবে', 'অন্যের বিনা প্ররোচনায়', 'সুস্থ মস্তিষ্ক' ইত্যাদি শব্দের কোনো রকম ব্যবহার করা হয়নি। তবে বয়সের সীমারেখা বেঁধে দেয়া রয়েছে। যেমন মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৬ বছর। তাহলে ১৬ বছর বয়সের নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যৌন মিলনকে এ আইন স্বীকৃতি প্রদান করেছে। আমাদের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট হানিফ সেখ বনাম আছিয়া বেগম মামলা, যা ৫১ ডিএলআরের ১২৯ পৃষ্ঠায় এবং অন্য একটি মামলায়, যা ১৭ বিএলটিএর ২৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, ১৬ বছরের অধিক কোনো মেয়েকে যদি কোনো পুরুষ বিয়ের প্রলোভন দিয়ে যৌনকর্ম করে তা হলে তা ধর্ষণের নামান্তর হবে না।
কোনও পুরুষ যদি ১৪ বছর কিংবা ১৪’র অধিক বয়সের কোনও নারীর সাথে (পারস্পরিক সম্মতিতে) যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তবে তাকে দ-বিধি অনুযায়ী ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে না। তবে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তাকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। কারণ ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি দিতে পারে না। দ-বিধির ধারা ৩৭৫ অনুযায়ী স্ত্রী ব্যতিত ১৪ বৎসরের কম বয়স্ক কোনও নারীর সাথে তার সন্মতিক্রমেও যৌনকর্ম করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হয়।
উপরের দুটি আইন বিশ্লেষণে আমরা যা পাই তাহলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি দেবার বয়স ১৬ বছর। আর দ-বিধি অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হলে একটি মেয়ে কোনও পুরুষকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য সম্মতি দিতে পারে। অথচ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী নারীর ১৮ বছরের আগে বিয়ে করার অধিকার নেই।
যেহেতু এজাহারটি হয়েছে অপহরণের এবং পুলিশ চার্জশিট দাখিল করেছে, অন্যদিকে মেয়েটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারার বিধান মতে, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে যে, সে স্বেচ্ছায়, সুস্থ মস্তিষ্কে এবং অন্যের বিনা প্ররোচনায় স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে চলে গিয়ে বিয়ে করেছে। তাই আইনের বিধান অনুযায়ী এ মামলায় চার্জ শুনানির মাধ্যমে মামলা থেকে ছেলেটির অব্যাহতি লাভের সুযোগ রয়েছে এটা পরিষ্কার।
কেননা ভিকটিম মেয়েটির বয়স ১৯ বছর, আইন মতে সে সাবালিকা। আইনের বিধান মতে, ১৮ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত কোনো মেয়ে তার নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। পাশাপাশি পুলিশ যেসব সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে চার্জশিট দিয়েছে তা আদালতে আসামীর বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যাবে না। কারণ এখানে মূল সাক্ষী ভিকটিম মেয়েটি নিজে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে সেটিই প্রাধান্য পাবে এ মামলায় এবং সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আর মেয়েটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকার করেছে যে, সে স্বেচ্ছায় স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে চলে গেছে। মামলাটির চার্জ শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য হলো। আসামীর আইনজীবী ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ (গ) ধারার বিধান মতে এ মামলা থেকে আসামীকে অব্যাহতি লাভের আবেদন জানালেন এবং আদালতে যে যুক্তি উপস্থাপন করলেন, সেটা এরকম যেঃ
১. ভিকটিম স্বেচ্ছায় আসামীর সঙ্গে গেছে। সে মতে এটা কখনোই অপহরণ হতে পারে না।
২. ভিকটিমের বয়স ১৯ বছর, সে নিজেই নিজের ভালো-মন্দ বুঝে ও জানে। সুতরাং তাকে ভুল বুঝিয়ে নেয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অবান্তর।
৩. ভিকটিম নিজে ২২ ধারার জবানবন্দিতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বেচ্ছায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। সে কারণে পুলিশের মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক চার্জশিট ভিত্তিহীন এবং অকার্যকর।
ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ (গ) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘মোকদ্দমার নথি ও তৎসহ দাখিলি দলিলাদি বিবেচনা এবং তৎসম্পর্কে আসামি ও অভিযোগকারীর পক্ষের বক্তব্য শ্রবণের পর আদালত যদি মনে করেন যে, আসামির বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালাইবার কোনো পর্যাপ্ত হেতু নাই, তাহলে আদালত আসামিকে অব্যাহতি দেবেন ও তদ্রুপ করিবার কারণ লিপিবদ্ধ করিবেন।’
অবশেষে বিচারক মহোদয় এই মর্মে আদেশ দেন যে, আসামি উল্লেখিত ধারায় কোনো প্রকার অপরাধ সংঘটন করেনি। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের বিধান মতে, অপহরণ মামলার কোনো উপাদান এখানে বিদ্যমান নেই। তাই আসামির বিরুদ্ধে ওই মামলা চলতে পারে না এবং সে মতে আসামীকে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ (গ) ধারা মতে অত্র মামলা দায় হতে অব্যহতি প্রদান করা হলো।
কাজেই কোন প্রেমিক পুরুষ যদি এ ধরণের মামলার শিকার হন, ভয় না পেয়ে মামলায় লড়ে যান, জয় আপনার অবশ্যম্ভাবী।
প্রাসঙ্গিক আইন ও বিশ্লেষণঃ
একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থ সে দেশের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন। আবার ২৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে। এদিকে ১৮ বছর বয়সী যে কোন নারী পুরুষ সাবালক-সাবলিকা হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম উঠছে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন, নিজের মতামত প্রকাশ করছেন। অথচ জীবন সঙ্গী নির্বাচনে পুরুষের বয়স হতে হচ্ছে ২১ বৎসর।
দ-বিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মধ্যে বিয়ের বয়স নিয়ে বিরোধ আছে। এ বিরোধের ফলে একটি মেয়েকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। যেমন, প্রেমঘটিত কারণে কোনও কিশোরী যদি অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া তার প্রেমিককে বিয়ে করে তবে মেয়ের অভিভাবক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উক্ত প্রেমিক এবং তার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে অপহরণ বা ধর্ষণ অথবা উভয় ধরণের মামলা করে এ অজুহাতে যে, তাদের মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক। মামলা হবার পর মেয়েটিকে নিয়ে তার অভিভাবক, পুলিশ এবং তার প্রেমিক পক্ষের লোকজনদের মধ্যে টানাহেঁচড়া শুরু হয়। এর পরিণতিতে মেয়েটিকে প্রায়শঃ নিরাপদ হেফাজতের নামে জেলখানায় যেতে হয়।
স্বেচ্ছায় বাল্যবিবাহকারী কিংবা বাল্যবিবাহের শিকার একটি মেয়ে যতকাল প্রাপ্তবয়স্কা না হবে তত কাল তাকে নিরাপত্তা হেফাজতের জন্য জেলে রাখার আদেশ দিতে পারে আদালত। এর ফলে হাজার হাজার মেয়ে দিনের পর দিন জেল খাটছে। আবার পুরুষের বিয়ে করার অধিকার তৈরি হয় ২১ বছরে। তবে কম বয়সে বিয়ে করলেও ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরুষকে জেলে থাকতে হয় না। অথচ অল্প বয়সে কোনও মেয়ের বিয়ে হলে যতদিন না তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয় ততদিন সেই মেয়েটিকে জেলে থাকতে হয়। অথচ ধর্মীয় বিশ্বাস বলছে, তুমি যদি যৌনতা চাও তবে বিয়ে কর। বয়স কোনও বিষয় নয়। সুরা নিসা বলছে ‘শিশুরা যখন স্বপ্নে বীর্যপাত করে তখন তাদের শৈশব অতিক্রম করে সাবালকের সীমায় পৌছে যায়।’
আমাদের আইন, রাষ্ট্র, সংবিধান ও সামাজিক আচরণে আজব সব বৈপরীত্য! পৃথিবীর তাবৎ সহানুভূতি ঢেলে দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতি; সাহিত্যে, কলায়, রসবোধে, জীবনের সর্বত্র কিশোর প্রেমকে উপজীব্য করা হচ্ছে; তরুণ মনস্তত্ব ও মূল্যবোধকে প্রেমের প্রতি সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ নরনারীর প্রেমবোধের বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আইনে মানুষকে বেধে ফেলার উপকার ও অপকারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার জন্য আইনজ্ঞ, বিজ্ঞজনদের প্রতি অনুরোধ রইল।
একুশ শতকের দোরগোড়ায় যেখানে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে মহাকাশেও পা বাড়িয়েছি, সেখানে আজও নারী-পুরুষের অধিকার, তাদের ইচ্ছাকে বেধে রেখে দিয়েছি। যৌনতাকে এখনও আমরা মানবিকতার চোখে দেখি না, এটা খুবই কঠোর বাস্তব।
লেখকঃ সিরাজ প্রামাণিক ,
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইনগবেষক।