19/08/2026
প্রশ্ন: আমার নানার কেনা একটি জমি নিয়ে বর্তমানে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। আমার নানা বহু বছর আগে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জমিটির মূল দলিলটি হারিয়ে যায়। এছাড়া কয়েক বছর জমির খাজনা দেওয়া হয়নি এবং জমিটি অনলাইনে/বর্তমান রেকর্ডে আমাদের নানার নামে হালনাগাদ হয়নি। সম্প্রতি এলাকার একজন জমি দালাল, যার সঙ্গে আমাদের পরিবারের এই জমি নিয়ে কোনো সম্পর্ক বা পূর্ববর্তী লেনদেন নেই, হঠাৎ করে একটি দলিল দেখিয়ে দাবি করছেন যে আমাদের নানার কেনা জমির দাগের জমিটি তার সম্পত্তি। তিনি কোথা থেকে দলিলটি পেয়েছেন এবং তার দলিলের সঙ্গে আমাদের নানার ক্রয়কৃত জমির প্রকৃত সম্পর্ক কী—তা আমরা এখনো নিশ্চিত নই। অন্যদিকে, আমার নানা যাঁর কাছ থেকে জমিটি কিনেছিলেন, তাঁর ওয়ারিশরাও আমাদের দাবিকে সমর্থন করছেন এবং স্বীকার করছেন যে আমার নানা তাঁদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে জমিটি কিনেছিলেন। এখন ওই ব্যক্তি আগামীকাল একজন আমিন নিয়ে এসে জমি মাপতে চান। আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ তার দেখানো দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই না করেই জমি মাপা হলে ভবিষ্যতে সেটি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। আমাদের কাছে বর্তমানে মূল দলিল নেই, তবে জমিটির ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য, পূর্বের মালিকের ওয়ারিশদের সমর্থন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য/প্রমাণ রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের জানতে চাওয়া বিষয়গুলো হলো:
১। হারিয়ে যাওয়া মূল দলিলের পরিবর্তে কীভাবে সরকারি রেকর্ড/সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করে নানার ক্রয় প্রমাণ করা যায়?
২। অপর পক্ষের দেখানো দলিলটি আসল এবং বৈধ কি না কীভাবে যাচাই করা যাবে?
৩। অপর পক্ষের দলিলের বায়া দলিল ও পূর্ববর্তী মালিকানার ধারাবাহিকতা কীভাবে যাচাই করা উচিত?
৪ শুধু অনলাইন রেকর্ডে আমাদের নানার নাম না থাকা কি তার মালিকানার দাবিকে দুর্বল করে?
৫। আগামীকাল অপর পক্ষের আনা আমিন দিয়ে জমি মাপার ক্ষেত্রে আমাদের কী করা উচিত?
৬। একতরফা মাপজোখ বা দখল পরিবর্তন ঠেকাতে তাৎক্ষণিকভাবে কী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়?
৭।।আমাদের নানার কাছে যে লোক জমি বিক্রি করেছিল তার ওয়ারিশরা আমাদের পক্ষে থাকলে তাঁদের বক্তব্য/প্রমাণের আইনগত গুরুত্ব কতটুকু?
উত্তর :
আপনার নানার ক্রয়কৃত জমি সংক্রান্ত এই বিরোধে আইনি ও মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপগুলো নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো:
১। হারিয়ে যাওয়া মূল দলিলের পরিবর্তে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ:
ক। জিডি (GD) করা: প্রথমে নিকটস্থ থানায় মূল দলিলটি হারিয়ে গেছে জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করুন।
খ। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি: স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে দলিল হারানোর বিষয়ে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি (Proclamation) দিন।
গ। সার্টিফায়েড কপি (Certified Copy) সংগ্রহ: দলিলটি যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল, সেখানে সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করে জিডি ও পেপার কাটিং জমা দিয়ে দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপি তুলুন।
আদালতে মূল দলিলের মতোই সার্টিফায়েড কপির আইনগত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে (Specific Relief Act, 1877 অনুযায়ী প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য)।
২। অপর পক্ষের দেখানো দলিলের সত্যতা ও বৈধতা যাচাই:
ক। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ইনডেক্স সার্চ (Index Search): অপর পক্ষের দলিলের নম্বর, তারিখ ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ইনডেক্স সার্চ করে দেখুন যে এই নম্বরে সত্যিই কোনো দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না।
খ। ভুয়া বা জালিয়াতি পরীক্ষা: দলিলটিতে দেওয়া দাতার নাম, স্বাক্ষর, বায়োমেট্রিক ও সিএস/এসএ/আরএস দাগ নম্বর ভুয়া কি না তা ভলিউম বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।
৩। বায়া দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই:
ক। ধারাবাহিকতা (Chain of Title): যে ব্যক্তি জমি দাবি করছে, সে কার কাছ থেকে জমিটি কিনেছে বা পেল এবং সেই দাতা আবার কীভাবে জমির মালিক হয়েছিল—এই ধারাবাহিকতা যাচাই করতে হবে।
খ। বায়া দলিল সংগ্রহ: তার দলিলের পেছনে উল্লেখিত বায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি তুলে দেখতে হবে যে মূল মালিকের সাথে তার বায়া দলিলের কোনো মেলবন্ধন আছে নাকি কোনো ভুয়া বা জাল দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করা হচ্ছে।
৪। অনলাইন/বর্তমান রেকর্ডে নাম না থাকার প্রভাব:
ক। স্বত্ব বা মালিকানার ভিত্তি: বাংলাদেশে আইনের নীতি অনুযায়ী "দলিল যার, জমি তার" (মালিকানার মূল ভিত্তি হলো দলিল ও বায়া দলিল)। কেবল নামজারি বা অনলাইন রেকর্ডে নাম না থাকলেই মালিকানা বাতিল হয়ে যায় না।
খ। নামজারি (Mutation) ও খাজনা: রেকর্ডে নাম না থাকা দুর্বলতা নয়, তবে প্রশাসনিক একটি ঘাটতি। আপনার নানার দলিলের সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি ও খাজনা পরিশোধের (Tax Clearance) আবেদন করতে হবে।
৫। আগামীকাল অপর পক্ষের আমিন দিয়ে জমি মাপার ক্ষেত্রে করণীয়:
ক। একতরফা মাপে আপত্তি: অপর পক্ষের আনা একক আমিনের মাপে কখনই সম্মতি দেবেন না।
খ। লিখিত ও মৌখিক আপত্তি: আমিন এলে তাঁকে স্পষ্ট জানাবেন যে জমির মালিকানা ও দলিল নিয়ে আইনগত বিরোধ বা অস্পষ্টতা রয়েছে।
গ। যৌথ মাপজোখ (Joint Survey): জমি মাপতে হলে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে এবং আপনাদের নিজস্ব নিরপেক্ষ সরকারি বা রেজিস্টার্ড আমিন এনে যৌথভাবে মাপতে হবে।
৬। একতরফা মাপ বা দখল পরিবর্তন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা:
ক। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা (Section 145 CrPC): জমিতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, দখলচেষ্টা বা একতরফা কাজ বন্ধ করতে দ্রুত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৫ ধারায় পিটিশন মামলা করুন। আদালত পুলিশকে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করার এবং সরজমিনে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেবেন।
খ। দেওয়ানি আদালতে স্থায়ী বা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: সিভিল কোর্টে স্বত্ব ঘোষণা ও দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের (Order 39) অধীনে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction) মামলা করতে পারেন, যাতে অপর পক্ষ জমিতে প্রবেশ করতে না পারে।
৭। মূল বিক্রেতার ওয়ারিশদের বক্তব্য ও সমর্থনের আইনগত গুরুত্ব:
অত্যন্ত শক্তিশালী দাপ্তরিক প্রমাণ: মূল বিক্রেতার ওয়ারিশদের সমর্থন আপনাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি হাতিয়ার।
ক। হলফনামা (Affidavit): ওয়ারিশদের কাছ থেকে একটি লিখিত হলফনামা (Affidavit) নিন, যেখানে তাঁরা স্বীকার করবেন যে তাঁদের পূর্বপুরুষ এই জমি আপনার নানার কাছে বিক্রি করেছিলেন এবং এতে তাঁদের বা অন্য কারো কোনো মালিকানা অবশিষ্ট নেই।
খ। সাক্ষ্য আইনের গুরুত্ব: সাক্ষ্য আইন (Evidence Act) অনুযায়ী, মূল স্বত্বাধিকারীর ওয়ারিশদের লিখিত বা মৌখিক সাক্ষ্য আদালতে অপর পক্ষের ভুয়া দাবিকে বাতিল করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ধন্যবাদান্তে
ব্যারিস্টার ইসরাত জাহান অনি
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
01794336417