26/06/2026
নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ ও রিট এখতিয়ার
ভুমিকা-
বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ আইনগত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ মতে আইন অনুযায়ী গঠিত নির্বাচন ট্রাইব্যুনাল ব্যতীত অন্য কোনো আদালত সাধারণত নির্বাচন সম্পর্কিত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ফলে নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার অত্যন্ত সীমিত।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত ধারাবাহিকভাবে অভিমত দিয়েছেন যে, নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর অথবা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর উদ্ভূত বিরোধসমূহ নির্বাচন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য। তবে এই সাধারণ নীতির দুটি ব্যতিক্রম রয়েছে (১) Coram Non Judice এবং (২) Malice in Law। কো্নো মামলায় Coram Non Judice অথবা Malice in Law হয়ে থাকলে, রিট দায়ের করা যেতে পারে।
>Coram Non Judice কী?
“Coram non Judice” একটি ল্যাটিন শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ “বিচারকের উপস্থিতিতে নয়”। এটি একটি আইনি পরিভাষা, যা সাধারণত এমন কোনো বিচারিক কার্যধারাকে নির্দেশ করে যা বিচারকের অনুপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে, অথবা কার্যধারাটি এমন কোনো আদালতে অনুষ্ঠিত হয়েছে যার সংশ্লিষ্ট মামলাটি শুনানি ও নিষ্পত্তি করার এখতিয়ার নেই (২৪ বিএলটি (এডি) ২১)। যখন কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা বিচারিক কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গঠন করা প্রয়োজন, কিন্তু তা আইনসম্মতভাবে গঠিত না হয়েও কোনো বিচার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন সেটা “Coram non judice” হয় (LEX/BDHC/0295/ 2015)। সহজ কথায়, যথাযথ বিচারিক ক্ষমতা বা এখতিয়ার ছাড়া পরিচালিত কোনো কার্যধারাকে Coram non Judice বলা হয়। (৪ বিএলটি (এডি) ১৮৪), (৬৬ ডিএলআর ১৪)
>Malice in Law কী?
Malice in law হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ জেনে-শুনে এবং কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই এমন কাজ করে যা আইনবিরোধী বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিদ্বেষ প্রমাণ করা জরুরি নয়। কাজটি আইনগতভাবে অন্যায় ও অযৌক্তিক হলেই তা malice in law হিসেবে গণ্য হতে পারে। “Malice in law” বলতে কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ বা বৈধ অজুহাত ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বেআইনি বা অন্যায় কাজ করাকে বোঝায় (৩৩ ডিএলআর (এডি) ২০১)। এটি এমন একটি কাজ যা কোনো যুক্তিসঙ্গত বা সম্ভাব্য কারণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় এবং এটি বিদ্বেষ, শত্রুতা বা প্রতিহিংসা থেকে করা কাজ হতে হবে এমন নয়। বরং এটি এমন একটা কাজ হবে যা অন্যের অধিকারকে উপেক্ষা করে সচেতনভাবে করা হয়। ((২০০৩) ৪ এসসিসি ৭৩৯)
জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধে রিট: আদালতের সিদ্ধান্তসমূহ
১. ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীর বনাম বাংলাদেশ- ৬২ ডিএলআর (এডি) ৪২৫-
মহিউদ্দীন খান আলমগীর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধীনে একটি মামলায় বিশেষ জজ আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হন এবং সেই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করেন। আপিল বিচারাধীন অবস্থায় তিনি জামিন লাভ করেন এবং তাঁর দণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত থাকে। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার তাঁকে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাখ্যান করেন। নির্বাচন কমিশনে করা আপিলও খারিজ হয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি রিট আবেদন দায়ের করলে হাইকোর্ট বিভাগ তা অগ্রহণযোগ্য বলে summarily reject করে দেন। পরে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন। ফলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগ তাঁর দণ্ডাদেশ ও সাজা স্থগিত করেন, যা আপিল বিভাগ বহাল রাখে। এদিকে, মনোনয়নপত্র-সংক্রান্ত রিট খারিজের বিরুদ্ধে তিনি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায়ে বলেন যে, এ ধরনের রিট আবেদন সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না সিদ্ধান্ত coram non judice হয় অথবা malice in law দ্বারা প্রভাবিত হয়। উপর্যুক্ত বিবেচনায় সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপীল খারিজ করা হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত রায় ও আদেশ বহাল রাখা হয়।
২. জাতীয় পার্টি বনাম মোতাসিম বিল্লাহ- ২০ বিএলডি (এডি) ৬৯-
মামলার পক্ষগণ ছিলেন জাতীয় পার্টি, যার প্রতিনিধিত্ব করেন মো. মঈদুল ইসলাম, এবং মোতাসসিম বিল্লাহ। মামলার বিষয়বস্তু ছিল যে, যদি একজন প্রার্থী নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন তাহলে অপর প্রার্থীকে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক বরাদ্দ করা যায় কিনা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ লক্ষ্য করেন যে, হাইকোর্ট বিভাগ তাদের সিদ্ধান্ত প্রদানের সময় নির্বাচন কমিশনের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। উক্ত নির্দেশনায় বলা ছিল যে, কোনো প্রার্থী সংরক্ষিত নির্বাচনী প্রতীকের দাবি করলে রিটার্নিং অফিসারকে তার রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় মনোনয়নের বৈধতা যাচাই করতে হবে।
আপিল বিভাগ মত দেন যে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিচারিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে coram non judice অথবা malice in law থাকতে হবে। বর্তমান মামলায় সেগুলোর কোনোটিই বিদ্যমান ছিল না। ফলে রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য নয়।
৩. মাহমুদুল হক বনাম মোঃ হেদায়েতুল্লাহ- ৪৮ ডিএলআর (এডি) ১২৮-
এখানে প্রার্থীর বয়স-সংক্রান্ত যোগ্যতা নিয়ে বিরোধ ছিল। আপিল বিভাগ বলেন, এ ধরনের প্রশ্নে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ এবং প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের প্রয়োজন হয়, যা নির্বাচন ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের বিষয়। ফলে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার প্রযোজ্য নয়। নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার অত্যন্ত সীমিত। নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে হস্তক্ষেপ কেবল তখনই করা যেতে পারে, যখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণরূপে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে (coram non judice) কাজ করেছে অথবা malice in law প্রমাণিত হয়েছে। এই মামলায় রিটার্নিং অফিসার তাঁর বৈধ এখতিয়ারের মধ্যেই কাজ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো malice in law যথাযথভাবে উত্থাপিত বা প্রমাণিত হয়নি। ফলে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না। অতএব, হাইকোর্ট বিভাগ সংসদীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে কাজ করেছেন।
৪. বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার -৬৯ ডিএলআর এডি ৪১১-
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপনির্বাচনে কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বাতিলের বৈধতা নিয়ে বিচার করেন। আদালতের সামনে প্রশ্ন ছিল, তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাখ্যান করা আইনসম্মত হয়েছে কি না।
মনোনয়নপত্রটি বাতিল করা হয়েছিল এই মর্মে যে কাদের সিদ্দিকী একজন ঋণখেলাপি ছিলেন। তবে তিনি দাবি করেন যে সংশ্লিষ্ট ঋণ পুনঃতফসিল (rescheduled) করা হয়েছিল, ফলে তাঁকে ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ, বিশেষত মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণের প্রশ্ন, সাধারণত রিট আবেদনের মাধ্যমে নয়; বরং নির্বাচন পিটিশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। তবে যদি কোনো সিদ্ধান্ত coram non judice হয় অথবা malice in law দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে রিট গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেহেতু বর্তমান মামলায় এ ধরনের কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি প্রমাণিত হয়নি, তাই আদালত রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন এবং নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
৫. জি এম শফিউল লালিন বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন- (১ সিএলআর ৪৯৩)-
এই মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, জি. এম. শফিউল লালিন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন, এই অভিযোগের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য হিসেবে তার নির্বাচন বাতিল করা উচিত কি না।
আদালত বলেন যে, আবেদনকারীর উত্থাপিত অভিযোগসমূহ মূলত অনুমাননির্ভর এবং সেগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও মূল্যায়নের প্রয়োজন। এ ধরনের বিতর্কিত ঘটনা (disputed questions of fact) রিটের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। এছাড়াও আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে coram non judice অথবা malice in law না থাকলে বিচারিক পুনর্বিবেচনা গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত রুল ডিসচার্জ করে দেন।
৬. মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ বনাম কাজিম উদ্দিন আহমেদ ও অন্যান্য- ১৬ এলএম (এডি) ৬৬৩-
এই মামলায় আপিল বিভাগের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, ময়মনসিংহ-১১ (নির্বাচনী এলাকা নং ১৫৬)-সংক্রান্ত নির্বাচন বিরোধে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি এবং অন্তর্বর্তীকালীন (ad-interim) আদেশ প্রদান করে যথাযথভাবে এখতিয়ার প্রয়োগ করেছিলেন কি না। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ নির্বাচনপূর্ব হোক বা নির্বাচন-পরবর্তী হোক, সেগুলোর নিষ্পত্তির হবে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে। এ ধরনের বিরোধ সাধারণত হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়। আপিল বিভাগ এ বিষয়ে Bangabir Kader Siddiqui v. Chief Election Commissioner মামলাসহ পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তসমূহের ওপর নির্ভর করে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো ধাপে আদালতের হস্তক্ষেপ কেবলমাত্র ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে; যেমন coram non judice অথবা malice in law প্রমাণিত হলে সম্ভব।
যেহেতু বর্তমান মামলায় এ ধরনের কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল না, তাই আপিল বিভাগ মত দেন যে হাইকোর্ট বিভাগ নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধে রুল জারি ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করে যথাযথ এখতিয়ার প্রয়োগ করেননি। ফলস্বরূপ, আপিল বিভাগ সিভিল পিটিশনসমূহ নিষ্পত্তি করেন এবং হাইকোর্ট বিভাগের জারিকৃত রুলসমূহ খারিজ করে দেন।
উপসংহার-
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও বিচারিক অবস্থান সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন ট্রাইব্যুনালই প্রধান ও বিশেষায়িত ফোরাম। এজন্যে এসকলের বিরোধের ক্ষেত্রে সাধারণত রিটের মাধ্যমে প্রতিকার দেয়া যায় না। শুধুমাত্র যখন প্রমাণিত হয় যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ এখতিয়ারবিহীনভাবে কাজ করেছে (Coram Non Judice) অথবা আইনের অপব্যবহার বা অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে (Malice in Law), তখনই রিট আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে।