20/12/2023
"বার কাউন্সিল প্রিলি ফেল করা কঠিন নাকি পাশ করা ?"
এমন একটি প্রশ্ন কিছু দিন আগে আমি আমাদের ফেইসবুক পেইজ ‘সাকসেস ল একাডেমী’ থেকে সবার উদ্দেশ্য করেছিলাম। উত্তর দেখে অনেকটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম- বেশির ভাগ উত্তর এসেছে "পরীক্ষা পাওয়াই সব থেকে কঠিন। বিষয় মোটেও অবাস্তব নয়।
বর্তমান সময়ে ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’ আইনজীবী তালিকাভুক্তি পরীক্ষা প্রতি বছর নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলে শিক্ষানবিশ আইনজীবি সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সাথে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের হতাশা। এর জন্য অবশ্যই শিক্ষানবিশ আইনজীবীরাই দায়ী? কেন তারা আইন নিয়ে পড়েছে? যদি আইন নিয়ে না পড়তো তাহলে তো কোন সমস্যাই থাকতো না।
যাই হোক এবার মুল বিষয়ে আসি। বার কাউন্সিল পরীক্ষা ভাগ্য করে পেলেও “তা পাশ করা কঠিন নাকি ফেল করা” সেই বিষয়ে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু যুক্তি তুলে ধরছি ।
বার কাউন্সিল প্রিলি পরীক্ষা হয় ১০০ নাম্বারে, এর মধ্যে ৫০ নাম্বার পেলেই পাশ হিসেবে ধরা হয়। মোট -০৭ টি আইন থেকে ১০০ নাম্বারে প্রশ্ন করা হয়। এর মধ্যে;
১। দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ থেকে ২০ নাম্বার।
২। ফৌজদারী কার্যবিধি,১৮৯৮ থেকে ২০ নাম্বার।
৩। দন্ডবিধি, ১৮৬০ থেকে ২০ নাম্বার।
৪। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ থেকে ১৫ নাম্বার।
৫। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ থেকে ১০ নাম্বার।
৬। তামাদি আইন, ১৯০৮ থেকে ১০ নাম্বর এবং
৭। বার কাউন্সিল আদেশ,১৯৭২ থেকে ০৫ নাম্বার।
এই মোট ১০০ নাম্বারের মধ্যে থেকে ৫০ নাম্বার পেলেই প্রিলিতে পাশ করেছে বলে বিবেচিত হবে।
২০১৭ সালের প্রিলি পরীক্ষায় ৩৪ হাজার এর বেশি পরীক্ষা দিলেও পাশ করেছে মাত্র ১১ হাজার এর একটু বেশী। অপর দিকে ২০২০ সালের প্রিলি পরীক্ষায় ৫০ হাজার এর বেশী পরীক্ষা দিলে পাশ করেছে মাত্র ৮ হাজার এর একটু বেশি। এবার প্রশ্ন হল কেন এতো শিক্ষানবিশ আইনজীবী প্রিলিতে ফেল করছে?
ফেল করার মূল কারণ সমূহঃ
১। পরীক্ষা নিয়ে পুর্ন প্রস্তুতি না থাকা।
২। পরীক্ষার নিয়ে সঠিক দিক নির্দেশনার অভাব।
৩। মুল আইন না পড়ে শুধু গাইড বই এর প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়া।
৪। আইনের মুল বিষয় গুলো বুঝে না পড়া ।
৫। কোচিং সেন্টার গুলোর অতি উৎসাহী বিজ্ঞাপন। (৩০ দিন বা ১৫ দিনে প্রিলি প্রস্তুতি নিন ইত্যাদি)
৬। শুরু কোচিং সেন্টারে শীটের উপর নির্ভরশীলতা।
৭। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন সঠিক ভাবে না পড়ে উত্তর দেয়া।
৮। নেগেটিভ নাম্বার থাকার পরও আন্তাজে উত্তর দেয়া।
৯। পরীক্ষার হলে অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করা।
১০। বার কাউন্সিল প্রিলি পরীক্ষার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে কোর্ট প্র্যাকটিসের উপর বেশী গুরুত্ব দেয়া।
১১। পরীক্ষা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা অসুস্থ হওয়া।
১২। ওএমআর শীটে রোল নাম্বার ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ভুল লেখা।
১৩। জেলা শহর গুলোতে ভাল গাইড লাইন দেয়া Mentor এর অভার।
১৪। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়া শুনা করে তাদের শুরু পাশ করার জন্য পড়া।
১৫। ঘুষ দিয়ে পাশ করা যার এমন ধারনা থেকে না পড়ে লিংক এর খুজে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি ।
“পাশ করা নয় বরং ফেল করাই কঠিন” এই বক্তব্যের পেছনের নিজের যুক্তি তলে ধরার চেষ্টা করছি।
বার কাউন্সিল প্রিলি পরীক্ষায় রেজাল্ট পাস এবং ফেল-এর মধ্যে অন্য কোন মার্জিন নেই। তাই পাশ মার্ক পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করলেই চলে। যেহেতু ৫০ নাম্বার পেলেই পাশ তাই শুধু কঠিন পরিশ্রম না করে একটু স্মার্ট ভাবে পড়াশুনা করতে হবে।
মোট ৭ টি আইনের মধ্যে প্রতিটি আইনে আলাদা আলাদা পাশ করতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তাই সকল আইনের উপর অধিক গুরুত্ব না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু আইনের উপর গুরুত্ব দিলে তা বেশী ফলপ্রসূ হবে বলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি।
আমরা ৭টা আইনকে ২ টা গ্রুপে ভাগ করব। একটি-গ্রুপ-০১ অন্যটি গ্রুপ-০২;
গ্রুপ-০১ তে আমরা ছোট চারটি আইন কে রাখব-
১। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ থেকে ১০ নাম্বার।
২। তামাদি আইন ১৯০৮ থেকে ১০ নাম্বার।
৩। সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ থেকে ১৫ নাম্বার। ও
৪। বার কাউন্সিল আদেশ ১৯৭২ থেকে ০৫ নাম্বার
মোট-৪০ নাম্বার
অপর দিকে গ্রুপ-০২ তে রাখব বাকী তিনটি আইন কে রাখব-
১। দন্ড বিধি ১৮৬০ থেকে ২০ নাম্বার।
২। দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ থেকে ২০ নাম্বার। এবং
৩। ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ থেকে ২০ নাম্বার ।
মোট- ৬০ নাম্বার
ক্রিকেট খেলার যেমন পাওয়ার প্লে থাকে, বার কাউন্সিলের পাওয়ার প্লে হচ্ছে এই গ্রুপ ০১। পাওয়ার প্লে তে যেমন ক্রিকেটাররা সহজেই রান তুলতে পারে ঠিক এই গ্রুপ-০১ থেকে সহজে নাম্বার তুলা সম্ভব।
যেহেতু গ্রুপ-০১ এর আইন গুলো ছোট তাই এই আইন গুলো দিয়ে শুরু করা যাতে পারে।
প্রথমে, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭- আমরা জানি এই আইনের মোট ধারা ৫৭ টি। এই আইন এর ৫৭ ধারা পড়তে ৩/৪ দিন দিলেই পর্যাপ্ত বলে মনে করি। এখান থেকে ১০ নাম্বারের মধ্যে ০৮ পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে শুধু মুখস্থ নয় অবশ্যই বুঝে পড়তে হবে।
দ্বিতীয়ত, তামাদি আইন ১৯০৮- এই আইনের মোট ধারা ৩২ টি এবং সাথে ১৮৩ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মধ্যে বার কাউন্সিল প্রিলিতে ৭-৮ টা প্রশ্ন আসে ধারা থেকে আর ২-৩ টা প্রশ্ন আসে অনুচ্ছেদ গুলো থেকে। এই আইন ৩/৪ দিন ভাল ভাবে পড়লে ১০ নাম্বার এর মধ্যে ০৭-০৮ নাম্বার পাওয়া সম্ভব। যদিও অনুচ্ছেদ গুলো মনে রাখতে প্রতিনিয়ন পড়ার প্রয়োজন হয়।
তৃতীয়ত, বার কাউন্সিল আদেশ ১৯৭২- এই আইনের মোট ৪৬ টি অনুচ্ছেদের সাথে ১০১ টি বিধি রয়েছে। এই আইন থেকে ০৫ নাম্বারে প্রশ্ন আসে। এই আইনে বিধান গুলো সর্ম্পুন শেষ করতে ২-৩ দিন হলে যথেষ্ট। এখান থেকেও ০৪ নাম্বার পাওয়া যায় সহজেই।
চতুর্থত, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২- এই আইনের মোট ধারা -১৬৭ টা সাথে কোন বিধি বা অনুচ্ছেদ নেই। এই আইন থেকে ১৫ নাম্বারে প্রশ্ন হয়। এই আইনটা ভাল ভাবে পড়ে শেষ করতে চাইলে ৭-১০ দিন পর্যাপ্ত বলে মনে করি। এবং এখান থেকে ১২-১৩ নাম্বার পাওয়া যায় সহজেই।
তাহলে গ্রুপ-০১ এর আইন গুলো যদি ভাল করে পড়া যায়, তাহলে ৩৪-৩৫ নাম্বার পাওয়া যাবে সহজে। আর যদি আরও একটু সময় দেয়া হয় তাহলে ৪০ নাম্বারের মধ্যে ৩৭-৩৮ পাওয়া সম্ভব।
আমরা জানি যে বার কাউন্সিল প্রিলি পাশ করার জন্য মার্জিন লাইন হল- ৫০ নাম্বার। যদি আমরা গ্রুপ-০১ থেকে ৩৫ নাম্বারও পাই তাহলে আমাদের পাশ মার্কের মার্জিন যেতে প্রয়োজন মাত্র ১৫ নাম্বার। এক দেওয়ানী কার্যবিধি বা ফৌজদারি কার্যবিধি পড়তে যে সময় লাগবে সেই সময় দিয়ে আমরা মোটামুটি ৩৫ মার্ক কনফার্ম করতে পারবো।
এবার আসি গ্রুপ-০২ তে, এই গ্রুপে আইন গুলো তুলনামূলক একটু বড়। তবে এখানে প্রতিটা আইন থেকে ২০ মার্কের প্রশ্ন আসে তাই এগুলোকে কম গুরুত্ব দিলে চলবে না।
গ্রুপ-০২ এর আইন গুলোর মধ্যে ‘দন্ড বিধি-১৮৬০’ সব থেকে সহজ বলে আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়। যদি পরীক্ষায় এই আইন সব থেকে বেশি বেইমানী করে বলে আমার মনে হয়েছে। তা যাই হোক, দন্ডবিধি-১৮৬০ এর মোট ধারা ৫১১ টা । তবে এর মধ্যে থেকে অনেক গুলো ধারা আছে যেগুলো ইতোমধ্যে বাতিল হয়েছে। এই আইন টা ভাল ভাবে পড়ে শেষ করতে চাইলে ১ মাস যথেষ্ট বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। যদি ১ মাস দৈনিক ০২ ঘণ্টা সময় দেয়া যায় তাহলে এই আইন খুবই ভাল ভাবে শেষ করা সম্ভব। যদি পেনাল কোড থেকে ২০ এর মধ্যে ১২-১৩ নাম্বারও পান তাহলে পাশ করা জন্য কিন্ত খুব একটা বেশী নাম্বার বাকি থাকে না।
অন্য দিকে দেওয়ানী কার্যবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি এই দুটি আইন থেকে মোটামুটি পড়া শুনা করলেও ৮-১০ নাম্বার করে পাওয়া যায়। তাহলে ফেল করা প্রায় অসম্ভব আমার আছে মনে হয়।
যদিও আমি দেওয়ানী কার্যবিধি ১৯০৮ বা ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ আপনি কম পড়েন সেটা বলছি না। পাশ করার জন্য সবগুলো আইন-ই ভাল ভাবে পড়ার কোন বিকল্প নেই। তবে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে পড়লে আমার কাছে পাশ করা নয় বরং ফেল করাই বেশি কঠিন বলে মনে হয়েছে।
এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামত, এর সাথে অনেকে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। আমি আপনাদের মতামত কে সম্মান জানাই।
ভাল লাগলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন এবং আপনার পরিচিত বন্ধুবান্ধবের সাথে শেয়ার করে পারেন। আর আপনার কোন মতামত থাকে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ।
এনামুল হক রনিজ
পরিচালক
Success Law Academy