02/06/2025
জামায়াতে ইসলামীর নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, সংস্কার না মানলে কোরআন অবমাননা হবে। তারমানে ড. ইউনুসের পরিষদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে উনি কোরআনের কাতারে দাঁড় করিয়েছেন; কোরআনের তুল্য মনে করছেন!
ইউনুসের সংস্কার কি আসলেই কোরআন বা কোরআনের সমতুল্য? সংস্কারের বহু প্রস্তাবের মধ্যে শুধু তিনটি প্রস্তাবনার কথা বলি।
এক. ইউনুসের পারিষদরা সংবিধানের মূলনীতি থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কেটে দিয়ে সেখানে ‘বহুত্ববাদ’ বসানোর প্রস্তাব করেছে। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রবল আপত্তি আছে। কিন্তু ইউনুস পরিষদের নতুন প্রস্তাব ‘বহুত্ববাদ’ কি কোরআনের প্রস্তাব?
দুই. সংস্কার প্রস্তাবে নারীদের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমরা এই প্রস্তাবের পক্ষে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী কি এর পক্ষে? এটা কি কোরআনের প্রস্তাব? ইউনুসের এই সংস্কারের বিরোধিতা করলে কি কোরআন অবমাননা হবে? তাহলে তো অসংখ্য আলেম ইতোমধ্যেই কোরআন অবমাননা করে বসে আছেন!
তিন. ইউনুসের সংস্কার প্রস্তাবের লাইনে লাইনে ‘গণতন্ত্র’ কথাটি আছে। সংস্কার করে গণতন্ত্র কায়েম করতে চাইলে সেটা কি কোরআনের প্রস্তাব হবে? ইসলামী রাজনীতিকরা ইসলাম কায়েম করতে চান, না-কি গণতন্ত্র কায়েম করতে চান?
তারা যখন গণতন্ত্রের কথা বলে এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে, তখন বার বার বলি, এরা আত্মপ্রতারক; নিজেদের সাথে প্রতারণা করছে এবং দেশ ও জনতার সাথেও প্রতারণা করছে। তারা গণতন্ত্র চায় না; গণতন্ত্র শেষ করার জন্য গণতন্ত্রের কথা বলছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে অগণতান্ত্রিক অভিযুক্ত করে এদের যে আন্দোলন, তা ছিল কেবল ধাপ্পাবাজী।
গণতন্ত্র নয়; তারা আসলে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়; যাকে তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা বলছে। সেই ইসলামী রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে তাদের মধ্যেই অনেক দলাদলি। কোনটা সহীহ ইসলাম, আইন ও রাষ্ট্র কাঠামো কেমন হলে তা সহীহ ইসলামী রাষ্ট্র হবে – এসব নিয়ে একমত হওয়ার সুযোগ থাকলে একটাই ইসলামী রাজনৈতিক দল হতো। তারা ইসলাম অনুসারীদের বহু দলে ভাগ করেছে।
জামায়াতের এই নেতা সংস্কারকে কোরআনের তুল্য বলার আগে ইউনুসকে নবীর সাথে তুলনা করেছেন খ্যাতিমান আলেম মুফতি কাজী ইব্রাহিম। তিনি বলেছেন, আল্লাহ নবীকে যে নিয়মে পাঠায়, সেই পন্থায় ইউনুসকেও পাঠিয়েছে। সুতরাং ইউনুসের সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করলে তা নাজায়েজ হবে।
তাঁরা মানুষকে বোঝাচ্ছে, মুহাম্মদ ইউনুস এবং তাঁর সংস্কারের বুলিও এখন ইসলাম ধর্ম।
সমস্যা হল, যদি সত্যই ইউনুস ও তার কর্মকাণ্ড ইসলাম ধর্ম হয়ে থাকে, তবে শুরুতেই আমাকে রাষ্ট্র ও এর রাজনীতি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ আমি ইসলামের অনুসারী নই; যারা এই ধর্ম মানে ইউনুসের পরিষদ শুধু তাদের জন্য!
ইউনুসের কর্মকাণ্ড এবং আলেমদের এসব কথাবার্তাকে ইসলাম অনুসারীরাও সবাই ধর্ম হিসেবে মানছে না। মানুষ একে রাজনীতি হিসেবে জানে। ইসলামপন্থী রাজনীতিকরা যখন ধর্ম ও রাজনীতি এক করে ফেলে, তখন সবার জন্যই সমস্যা প্রবল হয়ে যায়।
রাজনীতি দেশের ভাগ্য নিয়ন্তা; নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার ভাগ্য নিয়ন্তা। যে কোনো রাজনীতির পক্ষে বা বিপক্ষে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবার মতামত থাকবে; সমালোচনা থাকবে; বিরোধিতা থাকবে।
এখন ইউনুস যদি নবী হয়ে যান এবং তাঁর বিরোধিতা করা যদি নাজায়েজ হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভাগ্য ফিক্সড হয়ে গেছে –এর আর অল্টারনেট নেই; নড়চড় নেই।
ইউনুসের সংস্কারের বিরোধিতা করলে যদি কোরআন অবমাননা করা হয়, তবে বিরোধী মতের জায়গা থাকে না। ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের 'অন্তর্ভুক্তি' এর মধ্যে কিভাবে হবে তা ইউনুস ও আলী রিয়াজদের কাছে শোনা দরকার।
তারা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে? ভিন্নচিন্তার সুযোগ ও ভিন্নমতাবলম্বী মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে তারা কি ফ্যাসিবাদ কায়েম করছে না?
ভাইয়েরা, ধর্মের নামে রাজনৈতিক প্রতারণার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে; বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। জয় বাংলা, জয় মানুষ।