14/12/2025
হলি আর্টিজান হামলার পর এক সময় শোনা গিয়েছিল, ড. জাকির নায়েক নাকি দোষী, কারণ হামলাকারীদের একজন তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়াতে “ফলো” করত। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, এই যুক্তি কতটা ভয়ংকর। আজ কেউ আপনাকে ফলো করল, কাল সে অপরাধ করল, তাই বলে আপনিও অপরাধী? এই লজিক মেনে নিলে আমরা সবাই ঝুঁকির মধ্যেই আছি।
একই ধরনের যুক্তি এখন আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও তোলা হচ্ছে। কোনো আইনজীবী যদি একজন আসামির জামিন করান, আর সেই আসামি পরবর্তীতে আবার কোনো অপরাধ করে, তাহলে কি তার দায় আইনজীবীর ওপর বর্তায়? একজন আইনজীবীর কাজ হলো আইনের ভেতরে থেকে মক্কেলের অধিকার রক্ষা করা, ভবিষ্যতে সে কী করবে, তা অনুমান করা নয়।
আইনজীবীর moral obligation এবং professional obligation, এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, যা আইনপেশার বাইরে থাকা মানুষের পক্ষে অনেক সময় বোঝা কঠিন। তাই সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন আসে, একজন আইনজীবী কেন একজন ধর্ষক বা খুনির পক্ষে দাঁড়াবেন? কিন্তু আইন নিজেই বলে দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি প্রপার ট্রায়ালের মাধ্যমে সাক্ষ্য, প্রমানের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আইনত নির্দোষ। এমনকি এক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হলেও, অন্য একটি নতুন মামলায় তাকে দোষী বলা যাবে না যতক্ষণ না সেই অপরাধও প্রমানিত হয়। আমি বা আপনি পছন্দ করি বা না করি, তাতে আইনের অবস্থান বদলে যায় না।
অবশ্যই আইনজীবীরা এটি কোনো চ্যারিটি বা সমাজসেবার অংশ হিসেবে করেন না। এটি তাদের পেশা এবং পেশাগত স্বার্থের সঙ্গেই যুক্ত। আবার বাংলাদেশে আইনজীবীদের ফি নির্ধারণে কার্যকর কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামো না থাকায়, আইনজীবী ভেদে প্রফেশনাল ফিস এর তারতম্য থাকাটাও বাস্তবতা।
জামিন কোনো পুরস্কার নয়, আবার নির্দোষ ঘোষণাও নয়। এটি একটি সাময়িক আইনি সুরক্ষা, যা মামলার ধরন, অভিযোগ, প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে আদালত প্রদান করেন। আমাদের পরিচিত নীতি হলো: bail is the rule and jail is the exception. যেহেতু আমাদের দেশে মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে, তাই আদালত প্রায়ই মামলার মেরিট ও কারাবাসের সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেন।
এটি যেহেতু আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার বিষয়, তাই অনেক সময় দেখা যায়, একই ধরনের মামলায় কেউ জামিন পান, কেউ পান না। কখনো কম পরিচিত আইনজীবী জামিন করাতে ব্যর্থ হন, আবার প্রভাবশালী আইনজীবী জামিন করিয়ে ফেলেন। অনেকাংশে প্রভাব খাটানোর চেষ্টাও হয়। যেকারণেই জুনিয়র আইনজীবীরা সিনিয়র আইনজীবীদের পেছনে ছুটে, আর এ কারণেই অনেক সময় আদালতের ভারসাম্যেএ কিছুটা ব্যাত্যয়ও ঘটে। এতে জুনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। সিস্টেমটি চেঞ্জ হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু তা হয়তো অনেক কিছুর ওপরে নির্ভর করে। তবে নির্দিষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ ছাড়া এটাকে অনিয়ম বা অসাদাচরন বলে প্রচার করা সমীচীন নয়।
বর্তমানে একটি অসুস্থ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেকোনো ঘটনায় আদালতের সিদ্ধান্তকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রতিযোগিতা। এতে আদালতের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়, যার ভুক্তভোগী শুধু আইনজীবীরাই নন, সাধারণ মানুষও। আজ যদি একটি রিজিড পরিস্থিতি তৈরি হয়, কাল যদি আমার বা আপনার বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা মামলা হয় এবং আদালতের সহায়তা দরকার পড়ে, তখনই আমরা এর ভয়াবহতা বুঝতে পারব। আর বাংলাদেশের বাস্তবতায় মিথ্যা মামলা হয় না, এ কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবেন কি?
এখানে Marvel Cinematic Universe এর জনপ্রিয় ভিলেন থ্যানোসের উদাহরণটি প্রাসঙ্গিক। ভবিষ্যতে থ্যানোস এক আঙুলের স্ন্যাপে ইউনিভার্সের অর্ধেক জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন করবে, এই আশঙ্কায় এভেঞ্জার রোডি প্রস্তাব দেয়, টাইম ট্রাভেল করে শিশুকালেই থ্যানোস কে হত্যা করা যায় কি না। কিন্তু অন্য এভেঞ্জাররা এতে রাজি হয়নি। কারণ সিস্টেম এমন না। অপরাধের আগে শাস্তি নয়, অপরাধ হলে তারপর শাস্তি। এই নীতির কারণেই preventive detention কে অনেকেই সমর্থন করেন না।
কিন্তু যদি এখন সোশ্যাল মিডিয়ার আবেগ ও ট্রেন্ড দেখে বিচার শুরু হয়, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। আমরা সাধারণ মানুষ আবেগে চলি, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিচারকরা আবেগে নয়, সিদ্ধান্ত নেন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। আমরা দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় “ড্রাগ অ্যাডিক্ট ছেলে মাকে হত্যা করেছে” বলে কাউকে ফাঁসির দাবিতে ঝাঁপিয়ে পড়া হয়েছে, পরে প্রমাণ হয়েছে ছেলেটাই ভিকটিম, খুন করেছে ডাকাত। মিন্নি’র ঘটনায়ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।
৫ই আগস্টের আগেও আমরা অনেক ঘটনা একভাবে দেখেছি, এখন সেগুলো ভিন্নভাবে দেখছি। অর্থাৎ পাবলিক ওপিনিয়ন স্থির নয়, পরিস্থিতি ও তথ্যের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু প্রাথমিক অপিনিয়নের ওপরে ফাসি দিয়ে দিলে, পরেতো অপিনিয়ন চেঞ্জ হলে আর জীবন ফেরত দেওয়া যায়না। বাংলাদেশের পার্স্পেক্টিভ এ কেউ যদি কোন মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে জেলে যায়, তাহলে তার একদফা শাস্তি হয়ে যায় সমাজে, আরেক দফা হয় সোস্যাল মিডিয়াতে এবং এই দুই দফা সম্পন্ন হয় ইমিডিয়েটলি। তৃতীয় দফা হয় আদালতে, যেইটা আবার অনেক লেন্দি প্রসেস। প্রথম দুই দফার শাস্তি প্রথমেই হয়ে যায় বলে, তৃতীয় দফায় মুক্তি পেলেও প্রথম দুই দফার শাস্তির ইম্প্যাক্ট থেকে বেরিয়ে আসা ডিফিকাল্ট হয়ে যায়। তৃতীয় দফায় মুক্তি পেলেও সে তখন আর ট্রেন্ডিং টপিক থাকেনা, তায় যেই ক্ষতি হয়ার তা আগেই হয়ে যায়। তাই আমাদের মতামত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতামত মাননীয় বিচারকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াটা বিপজ্জনক। আদালতকে আদালতের মত চলতে দিন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এই আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে যে অনেক নির্দোষ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, সেই বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। তাই আবেগ নয়, বিবেক, যুক্তি ও আইনের প্রতি আস্থাই হওয়া উচিত আমাদের পথনির্দেশক।
আমরা মতামত দেব, কথা বলব, এটাই আমাদের অধিকার। কিন্তু বিচারক, আইনজীবী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাদের কাজটা স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে। তবেই প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে, আর নির্দোষ কেউ জনরোষের বলি হবে না।
~ Abdullah Al Hady