11/07/2026
📌 অগ্রক্রয় (Pre-emption) আইন সম্পর্কে আপনার ধারণা আরও স্পষ্ট করতে এর গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী, সংশোধনীর প্রভাব, আদালতের খরচ এবং কোন কোন পরিস্থিতিতে মামলা করা যায় না তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ২০০৬ সালের সংশোধনীর বড় পরিবর্তন (কৃষি জমি) রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬ ধারায় ২০০৬ সালে একটি বড় সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর পর অগ্রক্রয়ের নিয়ম অনেক কঠোর করা হয়েছে:
শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে শরিকরা পাবেন: বর্তমানে কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে সহ-শরিকরা (Co-sharer by inheritance) অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারবেন।
❌ ক্রয়সূত্রে শরিকদের অধিকার নেই: আপনি যদি উত্তরাধিকারী না হয়ে আগে কোনো এক সময় ঐ জমির কিছু অংশ কিনে শরিক হয়ে থাকেন (ক্রয়সূত্রে শরিক), তবে অন্য অংশ হস্তান্তরের বিপরীতে আপনি এই আইনে অগ্রক্রয় দাবি করতে পারবেন না।
❌ সংলগ্ন প্রতিবেশী: আগে সংলগ্ন জমির মালিক বা প্রতিবেশীরাও কৃষি জমির অগ্রক্রয় মামলা করতে পারতেন, যা ২০০৬ সালের সংশোধনীর পর পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।
২. অকৃষি জমির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও নিয়ম
অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী শহর এলাকার বা বাণিজ্যিক জমির ক্ষেত্রে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন।
📛 ক্ষতিপূরণের হার: অকৃষি জমির অগ্রক্রয় মামলায় দলিলের মূল্যের সাথে ৫% ক্ষতিপূরণ এবং ক্রেতা জমির কোনো উন্নয়ন করে থাকলে তার ওপর বার্ষিক ৬.২৫% সুদ বা লাভ আদালতে জমা দিতে হয়।
🕰️ সময়সীমা: জমি হস্তান্তরের নোটিশ পাওয়ার ৪ মাসের মধ্যে মামলা করতে হয়।
‼️৩. যে পরিস্থিতিগুলোতে অগ্রক্রয় মামলা চলে না (ব্যতিক্রমসমূহ):
আইন অনুযায়ী সব ধরনের জমি হস্তান্তরের ওপর অগ্রক্রয় দাবি করা যায় না। নিচের ক্ষেত্রগুলোতে মামলা করলে তা আদালত সরাসরি খারিজ করে দেবে:
🛑 রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছে বিক্রি: স্বামী বা স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান, নাতি-নাতনি, আপন ভাই-বোন, এবং ভাই-বোনের সন্তানদের কাছে জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করলে।
🛑 হেবা বা দান: জমিটি যদি কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ওয়াকফ করা হয়, দেবোত্তর সম্পত্তি করা হয়, কিংবা মুসলিম আইনে বৈধভাবে 'হেবা' (দান) করা হয়।
সরকারি অধিগ্রহণ: সরকার যদি জনস্বার্থে বা কোনো প্রকল্পের জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করে।
🛑 খাই-খালাসি বন্ধক: জমি যদি কোনো ঋণ বা খালাসি বন্ধকের (Mortgage) আওতায় হস্তান্তর করা হয়।
🛑 ৬০ বিঘার বেশি জমি: আবেদনকারীর নিজের যদি অলরেডি ৬০ বিঘা বা তার বেশি জমি থাকে, তবে তিনি আর অগ্রক্রয় করতে পারবেন না।
৪. মুসলিম আইনের 'শুফা' (Shufa) এর বিশেষ সুবিধা
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অগ্রক্রয় সাধারণ দেওয়ানি আইনের চেয়ে আলাদা।
🏛️ টাকা জমা না দিয়ে মামলা: সাধারণ আইনে মামলা করার দিনই ২৫% ক্ষতিপূরণসহ পুরো টাকা চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। কিন্তু মুসলিম আইনের ক্ষেত্রে বিক্রির খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক দাবি (Talab-i-Mowasibat) এবং সাক্ষীর সামনে দাবি (Talab-i-Ishad) প্রমাণ করে আগে কোনো টাকা জমা না দিয়েই মামলা দায়ের করা যায়। পরবর্তীতে আদালত নির্দেশ দিলে টাকা জমা দিতে হয়।
প্রতিবেশীর অধিকার: রাষ্ট্রীয় আইনে প্রতিবেশীর অধিকার বাতিল হলেও, মুসলিম আইনে এখনো সংলগ্ন প্রতিবেশী (Shafi-i-jar) অগ্রক্রয়ের দাবি জানাতে পারেন।
৫. মামলা ডিক্রি (জয়) হওয়ার পর করণীয়
আদালত যদি আপনার পক্ষে অগ্রক্রয়ের রায় (Decree) দেন, তবে আদালত ক্রেতাকে তার পাওনা টাকা (আদালতে জমা থাকা তহবিল থেকে) বুঝিয়ে দেবেন।
🟣 আদালত ক্রেতাকে বা মূল মালিককে আদেশ দেবেন যেন ৬০ দিনের মধ্যে আপনার নামে নতুন সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়।
যদি তারা ৬০ দিনের মধ্যে দলিল না করে দেয়, তবে আদালত নিজ দায়িত্বে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে সেই দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দেবেন। এই রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদনকারীকে কোনো অতিরিক্ত ট্যাক্স বা সরকারি ফি দিতে হয় না।
সাবিহা আলী
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট