24/11/2024
❤️💚
আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান! ছোট বেলা থেকে তাই হয়তো আওয়ামীলীগ ই ছিলো আমার ভালোলাগার দল! আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন নির্বাচন এর সময় মিছিল হলে লুকিয়ে মিছিলে যেতাম! গলা ফাটিয়ে মিছিল করতাম "বাইয়া দে নৌকা, শেখ হাসিনার নৌকা, শেখ মুজিবের নৌকা!!" শেখ হাসিনাকে আমি ঠিক কি পরিমাণ ভালোবাসতাম আর শ্রদ্ধা করতাম তা কেবল আমি জানি আর জানেন সৃষ্টিকর্তা!
কিন্তু আমি বড় হতে শুরু করলাম আর আওয়ামীলীগ এবং শেখ হাসিনা কে নতুন করে জানতে লাগলাম! প্রথম বড় ধাক্কাটা খেলাম বি ডি আর বিদ্রোহের পর! এর পরথেকে আমি খুব মনযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলাম এদের কর্মকান্ড! আমি দিন দিন কেবল অবাক হচ্ছিলাম আর ঘৃণা বাড়ছিলো! মনে হচ্ছিলো এই দলটাকে এই মানুষ গুলোকে আর যাইহোক ভালোবাসা যায়না! এরা দেশের ভালো মোটেও চায়না! দেশের প্রতি এদের বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই! এরা অন্যায়, অবিচার, জুলুম, হয়রানি, লুট, গুম, খুন এইসব ছাড়া দেশকে আর কিছুই দিচ্ছেনা! এদের প্রতি আমার ঘৃণা কেবল বেড়েই যাচ্ছিলো! এই পৃথিবীতে সব থেকে কঠিন কাজ গুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে ভালোবাসার মানুষদের ঘৃণা করা! আর আমাকে সেই কাজটাই করতে হচ্ছিলো! আমি বিবাহিত!! দুই বাচ্চার বাপ! একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি!
জুলাই মাসে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আমি রোজ নামাজ পড়ে দোয়া করতাম আল্লাহ তুমি ছাত্রদের বিজয় নিশ্চিত কর! যখন ছাত্রদের উপর পুলিশের হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো আমি রোজ রাতে বাসায় ফিরে আমার ওয়াইফ কে বলতাম আমি এইসব আর মেনে নিতে পারছিনা! আমি ফ্রাস্টেড হয়ে যাচ্ছি! আমার কিছু করা উচিৎ! কিন্তু বউ বাচ্চা চাকরি এইসবের ঝামেলায় কিছু করতে পারছিলাম না! অনলাইনে কেবল পোস্ট করেছি আর আন্দোলন সংক্রান্ত পোস্ট শেয়ার করেছি! কতো পরিচিত আর অপরিচিত মানুষের হুমকি ধামকির সম্মুখীন হয়েছি তা কেবল আমিই জানি! রোজ এতো এতো লাশের মিছিল আমার রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো! আমি নিজেকে সংযত রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলাম!
৪ আগস্ট রাতে দেখলাম আমার টাইমলাইন ছেয়ে গেছে "জনে জনে খবর দে, এক দফার কবর দে" আমি ভয় পেলাম ভীষণ ভয় পেলাম! হাজারো নাম না জানা! পরিচয় না জানা ছাত্র ছাত্রীদের জীবন সংশয় নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় পাগল হয়ে গেলাম! মনটা কোন ভাবেই শান্ত হচ্ছিলো না তাই তাহাজ্জুদের নামাজ পড়লাম! নামাজ পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম কাল আমি আন্দোলনে যাব! যারা একদফার কবর দিতে চাইছে তাদের হাত থেকে ছাত্র জনতাকে বাচাবো নাহয় তাদের হাতে নিজের জীবন বিসর্জন দিব, তবুও রাজপথে আমার হাজারো ভাইবোনকে একাকি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিবোনা কেউ ওদের সাথে থাকুক আর না থাকুক! আমি থাকবো!
আমি পরদিন সকালে নাস্তা করে আমার ওয়াইফ কে বললাম একটা জরুরি কাজ আছে, আমি গুলশান যাবো আর ঘন্টাখানেকের মধ্যে চলে আসবো!(উল্লেখ্য : আমার বাসা উত্তর বাড্ডা) আমার ওয়াইফ বার বার নিষেধ করা সত্বেও আমি বের হয়েছি! বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি! আমি আমার কাধ ব্যাগের ভিতরে ৩টা পানির বোতল নিয়েছি আর ব্যাগটা উল্টো করে আমার বুকের এইদিকে ঝুলিয়েছি প্রোটেকশন এর জন্য! লিংক রোড এসে দেখি সব ফাঁকা! আমি লুকিয়ে এই গলি অই গলি দিয়ে এগুতে এগুতে মেরুল বাড্ডা পর্যন্ত গেলাম কিন্তু রাস্তা ক্রস করে ইস্ট ওয়েস্ট এর সামনে যাওয়ার কোন সুযোগ ই ছিলোনা!
আমি বৃষ্টিতে ভিজে দাড়িয়ে আছি! কিছু উৎসুক মানুষ একবার গলি থেকে মেইনরোডের দিকে যায় পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে আবার গলিতে এসে লুকায়! আর আমার মাথায় খালি ঘুরছে যে করেই হোক ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে যেতে হবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে মিলিত হতে হবে! আমি অনেক সাহস করে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গেলাম পুলিশেরা কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা স মিলের বেড়া ভেঙে ভেতরে চলে গেলাম! তারপর সেখান থেকে বেদে পাড়া হয়ে ইস্ট ওয়েস্ট এর পেছন দিকে গিয়ে ছাত্রদের সাথে মিলিত হলাম! আর আন্দোলন রত অবস্থায় ঘন্টাখানেক পর গুলিবিদ্ধ হলাম! আমার সামনে দুইটা ছেলে গুলি খেয়ে পড়ে গেলো সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে আমি এদের একজনকে টেনে উঠাতে গেলাম! আমার কপালে চিন করে কি যেন লাগলো আমার কপাল বেয়ে গরম কি যেন নেমে আসছিলো চোখের উপর আমার চোখের গ্লাস ঘোলা হয়ে যাচ্ছিলো! বুকের পাশে প্রচুর জ্বালা হচ্ছিলো!
একটা ছেলেকে টেনে হিচড়ে সাইডে নিয়ে আসলাম! পাশের বিল্ডিং এর দুই তলা তিন তলা থেকে মানুষ চিতকার করছিলো এরা গুলি খেয়েছে এরা গুলি খেয়েছে! হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার হাতের আঙুল গুলো রক্তে ভরে গেছে! আমার বুকের ব্যাগটাতে অনেক গুলো ফুটো! আমাকে কয়েকজন ধরা ধরি করে নিয়ে যাচ্ছে! কে যেন কোথা থেকে একটা ওড়না এনে আমার কপালটা বেধে দিয়েছে! আমি হঠাৎ ভয় পেলাম! মনে হচ্ছিলো আমি বুঝি মারা যাচ্ছি! সবাই ধরাধরি করে আমাকে একটা বিল্ডিং এর নিচতলার গ্যারেযে নিয়ে গেছে! ওইখানে একজন ডাক্তার ছিলেন তিনি আরও কয়েকজন আহত ছেলের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন! আমাকেও দেখলেন! আমি উনাকে জিগ্যেস করার সাহস পাচ্ছিনা! আমি বাঁচবো কিনা! আমার চোখের সামনে বার বার খালি আমার মেয়েটার ছবি ভেসে উঠছিলো! মনে হচ্ছিলো বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মেয়ে বলেছিলো "বাবা বাসায় ফেরার সময় চকলেট নিয়ে এসো!"
আমি পাগলের মতো পকেট হাতরাই পকেটে কিচ্ছু নেই! আমার পকেট ভর্তি শুধু রক্ত আর রক্ত! একটা পরির মতো সুন্দর মেয়ে আমাকে এক গ্লাস জুস এনে দিয়েছে! ডাক্তার বলছিলো প্যারাসিটামল টা খেয়ে নিন ব্যাথা কিছুটা কমবে! আমি ঘোরের ভেতর জুস খেলাম প্যারাসিটামল খেলাম! ডাক্তার বললেন আপনার ইমারজেন্সি হসপিটালে যাওয়া উচিৎ! আমি আমার মামাতো ভাইকে ফোন দিলাম বললাম সম্ভব হলে ইস্ট ওয়েস্ট এর সামনে থেকে আমার লাশটা নিয়ে যাস! আর যদি বেচে থাকি তাহলে স্বাধীন দেশে দেখা হবে!
দেশ এখন স্বাধীন! আমার শরীরে এখনো ৯টা স্প্লিন্টার রয়ে গেছে! ৮টা মাথায় ১টা বুকে! কতোদিন বাচবো জানিনা! কিন্তু আমার কোন আফসোস নেই! আমি আমার ভাইবোনদের একলা পথে ছেড়ে দেইনি! আমি ওদের সাথেই ছিলাম! আমি ওদের পাশেই ছিলাম! আমার মেয়ে একদিন বড় হয়ে বলবে! আমার বাবাও চব্বিশে দেশের জন্য রক্ত দিয়েছিলো!
—হিমু আহমেদ ( জুলাই বিপ্লবের একজন অকুতো ভয় বীর সৈনিক)
001
** জুলাই বিপ্লব নিয়ে আপনাদের সকলের স্মৃতি না বলা কথা আমাদের কে ইনবক্স করুন আমরা প্রতিনিয়ত তা আমাদের পেইজে পোস্ট করে যাবো। জুলাই বিপ্লব কে আমরা বিলীন হতে দিব না জুলাই হবে অমর। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক **