19/03/2026
ব্ল্যাঙ্ক চেক নিয়ে উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তঃ আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, ৫৬ ডিএলআর ৬৩৬
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
ব্ল্যাঙ্ক চেকে (ফাঁকা চেক) শুধু স্বাক্ষর দিলেই হবে, টাকার অংক, পেয়ীর নাম, তারিখ ভিন্ন হাতের লেখা হলেও এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলাটি আইনত চলবে। বছরের পর বছর ধরে চেকের মামলার এই জটিল ধাঁধার সমাধান দিয়েছে আমাদের উচ্চ আদালত। আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, ৫৬ ডিএলআর ৬৩৬, মামলার সেই ঐতিহাসিক রায়টি আজ প্রতিটি পাওনাদার এবং দেনাদারের জানা জরুরি, তা নিয়েই আজকের আজকের বিশেষ কলাম।
মামলাটিতে আসামী পক্ষ যুক্তি দিয়েছিল যে, চেকের স্বাক্ষর তার হলেও ভেতরের লেখাগুলো যেমন টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম তার হাতের লেখা নয়। আসামী পক্ষের দাবি ছিল, যেহেতু তিনি নিজে চেকটি সম্পূর্ণ পূরণ করেননি, তাই এটি একটি 'বৈধ চেক' হিসেবে গণ্য হবে না এবং এটি 'ইস্যু’ করা হয়েছে বলা যাবে না।
হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন এবং বলেন যে একটি চেকের মূল উপাদান হলো স্বাক্ষর। যদি স্বাক্ষর দাতার হয়, তবে বাকি অংশ কে পূরণ করল তা মুখ্য নয়। এন.আই অ্যাক্টের ২০ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ একটি স্ট্যাম্পড বা স্বাক্ষরিত ইনস্ট্রুমেন্ট অন্যকে দেয়, তবে তিনি প্রাপককে সেটি পূরণ করে নেওয়ার একটি 'অন্তর্নিহিত ক্ষমতা' প্রদান করেন। অবশেষে আদালত রায় দেন যে, চেকের বডি এবং স্বাক্ষর ভিন্ন হাতের লেখা হলেই সেটি অবৈধ হয়ে যায় না। যদি আসামী চেকে স্বাক্ষর করে সেটি বাদীকে হস্তান্তর করেন, তবে ধরে নেওয়া হবে তিনি চেকটি 'ইস্যু' করেছেন। স্বাক্ষর ঠিক থাকলে এবং চেকটি স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা হলে সেটি এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। স্বাক্ষর জাল হলে কেবল তখনই চেকটি অবৈধ হয়।
৫৬ ডিএলআর ৬৩৬ (আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র) মামলায় হাইকোর্ট যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত এবং আপিল বিভাগ এই বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট এবং যুগান্তকারী কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বিশেষ করে চেকের স্বাক্ষর ঠিক থাকলে বডির লেখা অন্য কারও হওয়া বা ভিন্ন কলম ব্যবহারের আইনি প্রভাব নিয়ে। এ বিষয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী রেফারেন্স হলো মাজিদ বনাম রাষ্ট্র ৬৮ ডিএলআর (এডি)। এই মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যদি চেকে আসামীর স্বাক্ষর সঠিক থাকে, তবে চেকের ভেতরের লেখা (টাকার অংক, তারিখ, পেয়ীর নাম) কার হাতের লেখা বা কোন কলমে লেখা, তা কোনোভাবেই চেকটিকে অবৈধ করবে না। এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার উদ্দেশ্য হলো চেক ডিসঅনার হওয়া এবং পাওনা টাকা পরিশোধ না করা। চেকের বডির হাতের লেখা ভিন্ন হওয়ার অজুহাত দিয়ে আসামী তার দায় এড়াতে পারবে না।
তবে আসামী যদি দাবি করেন যে চেকে তার হাতের লেখা নেই, তবে তাকে অবশ্যই আগে প্রমাণ করতে হবে যে স্বাক্ষরটিও তার নয়। যদি তিনি স্বীকার করেন স্বাক্ষর তার, তবে হাতের লেখা ভিন্ন হওয়াটা আর কোনো শক্ত ডিফেন্স হিসেবে কাজ করে না। অনেক সময় আসামীরা হাতের লেখা পরীক্ষার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু আদালত এখনকার নজির অনুযায়ী যদি স্বাক্ষর মিলে যায় তবে বডির লেখার জন্য এক্সপার্ট ডাকার প্রয়োজনীয়তা দেখেন না।
এন.আই অ্যাক্টের ১১৮ ও ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, চেকের স্বাক্ষর স্বীকার করলে ধরে নেওয়া হয় সেটি কোনো ঋণের বিপরীতেই দেওয়া হয়েছে। এখন এটি যে ঋণের জন্য দেওয়া হয়নি, তা প্রমাণ করার ভার আসামীর ওপর।
যদিও ব্ল্যাঙ্ক চেকে মামলা চলে, তবে আসামী পক্ষ যদি প্রমাণ করতে পারে যে চেকটি চুরি হয়েছে বা ভয় দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে কেবল তখনই ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু সাধারণ লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর ঠিক থাকলে ব্ল্যাঙ্ক চেকের অজুহাত আদালতে টিকবে না।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।