03/06/2026
বাংলাদেশে পিতা-মাতার অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩ সালে "পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩" পাস করা হয়। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সামাজিক আইন। নিচে এই আইনের মূল বিষয়গুলোর একটি সহজ সামারি দেওয়া হলো:
১. ভরণ-পোষণের সংজ্ঞা
আইন অনুযায়ী, "ভরণ-পোষণ" বলতে কেবল খাওয়া-পরা বোঝায় না, বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে:
পর্যাপ্ত অন্ন ও বস্ত্র।
নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা।
বার্ধক্যে সঙ্গ দেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা।
২. সন্তানের মূল দায়িত্বসমূহ
আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে (ছেলে ও মেয়ে উভয়ই) পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে।
একত্রে বসবাস: পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও আলাদা রাখা যাবে না। সন্তানকে তার নিজের ঘরে বা পিতা-মাতার পছন্দ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে বসবাস করতে হবে।
নিয়মিত যোগাযোগ: সন্তান যদি কাজের সূত্রে বা অন্য কোনো কারণে আলাদা থাকেন, তবে নিয়মিত পিতা-মাতার খোঁজখবর নিতে হবে এবং আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
মাতার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার: পিতা জীবিত বা মৃত—যাই হোক না কেন, সন্তানকে মায়ের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে এবং তার ভরণ-পোষণ আলাদাভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
৩. যৌথ বা একাধিক সন্তানের ক্ষেত্রে নিয়ম
যদি কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকে, তবে তারা নিজেরা আলোচনা করে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বণ্টন করে নেবেন। যদি তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারেন, তবে আদালত নির্ধারণ করে দেবে কোন সন্তান কতটুকু দায়িত্ব বা আর্থিক অবদান রাখবে।
৪. দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণ-পোষণ
পিতা-মাতা যদি জীবিত না থাকেন, কিন্তু দাদা-দাদী বা নানা-নানী জীবিত থাকেন, তবে পিতার স্থলে দাদা-দাদী এবং মাতার স্থলে নানা-নানীর ভরণ-পোষণ করা সন্তানের (নাতি-নাতনিদের) জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য হবে।
৫. অপরাধ এবং শাস্তি (ধারা ৫)
এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে তা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রধান শাস্তি: কোনো সন্তান যদি পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করে বা অবহেলা করে, তবে তার সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
স্ত্রী বা স্বামীর প্ররোচনা: যদি সন্তানের স্ত্রী বা স্বামী কিংবা অন্য কোনো আত্মীয় পিতা-মাতাকে ভরণ-পোষণ দিতে বাধা দেয় বা সন্তানকে প্ররোচিত করে, তবে তিনিও একই অপরাধে অপরাধী হবেন এবং সমপরিমাণ শাস্তির মুখোমুখি হবেন।
৬. মামলা প্রক্রিয়া ও আপোষ-মীমাংসা
আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য: এই আইনের অধীন অপরাধসমূহ আমলযোগ্য (Cognizable), জামিনযোগ্য (Bailable) এবং আপোষযোগ্য (Compoundable)।
আদালত: এই সংক্রান্ত মামলা প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হবে।
লিখিত অভিযোগ: পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই অপরাধ আমলে নেবে না।
আপোষের সুযোগ (ধারা ৮): মামলা আদালতে যাওয়ার পরও আদালত চাইলে বিষয়টি প্রথমে স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, পৌর মেয়র বা কোনো গণ্যমান্য ব্যক্তির মাধ্যমে আপোষ-মীমাংসার জন্য পাঠাতে পারেন। উভয় পক্ষ সম্মত হলে সেখানেই বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট:
এই আইনটি করার মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং পারিবারিক মূল্যবোধ ধরে রাখা এবং প্রবীণ বয়সে পিতা-মাতার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুরক্ষার আইনি ভিত্তি তৈরি করা।