18/11/2025
#কে_সিনিয়র, #কে_জুনিয়র? (একটি কাল্পনিক উপন্যাস)
#অধ্যায় ১: সৈয়দ সাহেবের সিনিয়র সুলতানি
সৈয়দ আবুল মাওলা সাহেব। নাম বললেই হাইকোর্ট পাড়ার ধুলোবালি থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত-সকলেই তটস্থ। তিনি শুধু একজন আইনজীবী নন, তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং এই "সিনিয়র" তকমাটি তিনি তার নামের আগে এমনভাবে ব্যবহার করতেন, যেন এটি কোনো বংশগত পদবি, যা কেবল রক্তের উত্তরাধিকারেই পাওয়া যায়।
তার চেম্বার ছিলো এক এলাহি কাণ্ড। বিশাল সেগুন কাঠের টেবিল, চামড়ায় মোড়া চেয়ার আর আইনের এমন সব ভারি ভারি বই, যা দেখে মনে হতো তিনি বুঝি গোটা সংবিধান মুখস্থ করে বসে আছেন।
সৈয়দ সাহেবের জীবনে গর্ব করার মতো
অনেক কিছুই ছিলো। কিন্তু তার একমাত্র দুঃখ ছিলো তার ছেলে, #আদনান। আদনানকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছিলেন আইন পড়তে। ছেলে , ঘুরে আইনের এমন সব ডিগ্রি নিয়ে এলো, যার নামগুলো উচ্চারণ করতেই সৈয়দ সাহেবের দাঁত ভেঙে যাওয়ার জোগাড়।
কিন্তু সৈয়দ সাহেবের চোখে আদনান ছিলো একটি আস্ত "অপদার্থ"। প্রতিদিন ডিনার টেবিলে এই দৃশ্যের অবতারণা হতো। আদনান হয়তো কথা প্রসঙ্গে বলছিলো, "বাবা, আমি ডেরকের 'পোস্ট-মডার্ন জুরিসপ্রুডেন্স' নিয়ে একটা থিসিস লিখছি..."
সৈয়দ সাহেব খাসির রেজালায় কামড় বসাতে বসাতে ধমকে উঠতেন, "থামা তোর জুরিস... কী বললি? আরে ব্যাটা, তুই তো বাজারে গিয়ে ধনেপাতা আর পুদিনাপাতার তফাৎ বুঝিস না! তুই করবি আইন? প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান লাগে, বুঝলি? ...! আমার মতো। দেখছিস না, এই 'সিনিয়র' গাউনটা গায়ে চাপাতে আমার চুল পেকে গেলো! তোর ওইসব থিসিস দিয়ে বড়জোর টয়লেট পেপারের কাজ চলতে পারে।"
আদনান চুপ করে থাকতো। তার এই শান্ত, চুপচাপ থাকাটা সৈয়দ সাহেবকে আরও বেশি খেপিয়ে তুলতো। "অপদার্থ! একটা কথাও বলতে পারে না!"
#অধ্যায় ২: অপদার্থের উত্থান ও মহাপ্রয়াণ:
সৈয়দ সাহেব তার "সিনিয়র" জীবনের আস্ফালন নিয়েই একদিন চোখ বুঝলেন। আইন পাড়ায় শোকের ছায়া নামলো। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, "আহা, কী সিংহপুরুষ ছিলেন! এখন এই জুনিয়রদের কে দেখবে?"
সবার কৌতূহল ছিলো আদনানকে নিয়ে। বাপের জানাজায় সে দাঁড়িয়েছিলো নির্লিপ্ত মুখে। সবাই ধরে নিয়েছিলো, এই "অপদার্থ" ছেলে বাপের চেম্বার খুব সম্ভবত কোনো কফি শপ বা আর্ট গ্যালারিতে রূপান্তর করবে।
কিন্তু সময় কারো জন্য বসে থাকে না। সেই "অপদার্থ" আদনান, যে ধনেপাতা চিনতো না, সে আশ্চর্যজনকভাবে প্রথমে হাইকোর্টের বেঞ্চে, এবং তার কয়েক বছরের মাথায়, এক অভূতপূর্ব জটলায়, দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলো।
আইন পাড়ায় গুঞ্জন শুরু হলো। "আরে, ওই আদনান না? সৈয়দ সাহেবের অপদার্থ ছেলেটা? ও কীভাবে কী হলো?"
যারা বলতো আদনানের "বাস্তব জ্ঞান" নেই, তারা দেখলো আদনান বেঞ্চে বসে এতোটাই কম কথা বলে যে, মামলার শুনানি শেষ হয়ে গেলেও আইনজীবীরা বুঝতে পারতেন না যে জাস্টিস সাহেব জেগে আছেন, নাকি আইনের কোনো গভীর তত্ত্বে ডুবে গেছেন।
#অধ্যায় ৩: সিনিয়রের প্রতিশোধ:
প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর জাস্টিস আদনান সৈয়দ তার চেম্বারে প্রথম যে জিনিসটি টাঙালেন, তা হলো তার বাবার একটি বিশাল পোট্রেট। তবে পোট্রেটের নিচে কোনো শোকগাথা ছিলো না, শুধু একটা ছোট পিতলের প্লেটে লেখা ছিলো- "সৈয়দ আবুল মাওলা, সিনিয়র আইনজীবী।"
কিছুদিন পর বার কাউন্সিলের এক মিটিংয়ে প্রধান বিচারপতি আদনান সৈয়দ এক যুগান্তকারী প্রস্তাব আনলেন।
"আমাদের প্রবীণ আইনজীবীদের সম্মান জানাতে হবে," তিনি তার সেই ধীর, শান্ত গলায় বললেন। "কিন্তু আমি দেখছি, 'সিনিয়র' আইনজীবীর সংখ্যা বড্ড কম। এই মহান সম্মানটি শুধু গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটা ছড়িয়ে দিতে হবে।"
সবাই ভাবলো, কী মহানুভব প্রধান বিচারপতি!
এরপর যা শুরু হলো, তা ইতিহাস।
প্রথম গেজেটেই এমন ৫০ জন "সিনিয়র" আইনজীবী হলেন, যাদের অর্ধেককে খোদ বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টও চিনতে পারলেন না।
দ্বিতীয় গেজেট এলো মাস তিনেক পর। এবার লিস্টে এমন সব নাম, যারা কদাচিৎ কোর্টে আসেন, এবং এলেও মূলত ক্যান্টিনে সিঙ্গাড়া খেতেই ব্যস্ত থাকেন। দেখা গেলো, এমন একজনও "সিনিয়র" হয়েছেন, যিনি গত সপ্তাহেও জুনিয়র হিসেবে বারের নির্বাচনে চাঁদা দিয়েছেন।
আইন পাড়ায় ফিসফিস শুরু হলো। সৈয়দ সাহেবের পুরনো বন্ধুরা, যারা নিজেদের "সিনিয়র" হওয়া নিয়ে সৈয়দ সাহেবের মতোই গর্বিত ছিলেন, তারা গেলেন জাস্টিস আদনানের সাথে দেখা করতে।
"হিজ লর্ডশিপ," প্রবীণতম আইনজীবী কালাম সাহেব বললেন, "সিনিয়র আইনজীবীর এই যে তালিকা... মানে... এর কোনো মা-বাপ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। ইমতিয়াজ! যে ছেলেটা আমার ফাইল বয়ে বেড়াতো, সেও নাকি সিনিয়র হয়ে গেছে!"
প্রধান বিচারপতি আদনান তার চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন। শান্ত গলায় বললেন, "কালাম সাহেব, আমার বাবা বলতেন, প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞানের খুব অভাব। আমি সেই অভাবই পূরণ করছি। সমাজে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। সবাই যখন 'সিনিয়র' হবে, তখন আর জুনিয়রদের বকাঝকা করার কেউ থাকবে না। একটা সাম্যবাদী আইন ব্যবস্থা তৈরি হবে।"
#অধ্যায় ৪: যখন সবাই সিনিয়র:
ছয় মাসের মধ্যে দেশের আইন ব্যবস্থা এক নতুন রূপ নিলো।
কোর্টে গেলেই দেখা যেতো, বিচারকের সামনে দাঁড়ানো দশজন আইনজীবীর মধ্যে নয়জনই "সিনিয়র"। একই মামলায় বাদীপক্ষের "সিনিয়র" আইনজীবী এবং বিবাদীপক্ষের "সিনিয়র" আইনজীবী কোর্ট রুমের বাইরে বেঞ্চ দখল করা নিয়ে হাতাহাতি করছেন।
ক্যান্টিনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই "সিনিয়র"। রিকশাচালকরাও ভাড়া চাইতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে যেতো।
পুরনো "সিনিয়র" আইনজীবীরা পড়লেন মহা বিপদে। তারা যখন নিজেদের "সিনিয়র" হিসেবে পরিচয় দিতেন, তখন মানুষ এমনভাবে তাকাতো, যেন এটা কোনো গালি। "আরে ধুর! সিনিয়র তো আজকাল সবাই।"
সৈয়দ আবুল মাওলা সাহেবের যে বন্ধুরা তার ছেলের কাছে নালিশ করতে গিয়েছিলেন, তারা নিজেদের নামের পাশ থেকে "সিনিয়র" শব্দটি ব্যবহার করাই বন্ধ করে দিলেন। কারণ, ইদানিং কোনো জুনিয়রকে ধমক দিলে সেও পাল্টা উত্তর দেয়, "আরে রাখেন মিয়া! আমিও আগামী মাসের লিস্টে সিনিয়র হচ্ছি!"
সৈয়দ সাহেবের সেই গর্বের "সিনিয়র" তকমাটি জাস্টিস আদনান সৈয়দ সফলভাবে একটি সস্তা এবং সহজলভ্য পণ্যে রূপান্তরিত করলেন।
গভীর রাতে, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে, জাস্টিস আদনান সৈয়দ তার বাবার পোট্রেটের সামনে দাঁড়ালেন। হাতে এক কাপ ব্ল্যাক কফি।
তিনি ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, "বাবা, তুমি সবসময় বলতে আমার বাস্তব জ্ঞান নেই। দেখো, আমি অর্থনীতির সবচেয়ে বাস্তব সূত্রটাই প্রয়োগ করেছি। যখন কোনো কিছুর সাপ্লাই (Supply) ডিমান্ডের (Demand) চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন তার দাম শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।"
সৈয়দ সাহেবের ছবির চোখ দুটিও যেন ছেলের এই "বাস্তব জ্ঞানে" বিস্মিত হয়ে জ্বলজ্বল করছিলো। "অপদার্থ" ছেলেটি অবশেষে তার বাবার গর্বের একমাত্র বস্তুটির সফল প্রতিশোধ নিয়েছিলো-তাকে সম্পূর্ণ মূল্যহীন করে দিয়ে।
কে লিখেছে জানি না।একটু পরিমার্জিত করে শেয়ার করলাম।