17/02/2026
সাংবিধানিক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো আজ। এই ধারণাগুলো মূলত জনগণের সার্বভৌমত্ব (Popular Sovereignty) এবং আইনি বৈধতা (Legal Validity)—এই দুইয়ের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
নিচে সহজভাবে এই তিনটি ক্ষমতার পার্থক্য এবং এর মূল ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হলো:
১. মূল ক্ষমতা বা আদি শক্তি (Original Constituent Power)
এটি হলো কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এবং আদি ক্ষমতা। যখন একটি জাতি প্রথমবারের মতো কোনো বিপ্লব বা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের জন্য একটি সংবিধান তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেই ক্ষমতাকে Constituent Power বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য: এটি কোনো পূর্ববর্তী আইনের অধীন নয়; বরং এটিই সব আইনের জন্ম দেয়।
উদাহরণ: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গণপরিষদ যে সংবিধান তৈরি করেছিল, তা এই আদি শক্তির বহিঃপ্রকাশ।
২. সংশোধনকারী ক্ষমতা (Amending Power)
সংবিধান তৈরির পর তাতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করার যে ক্ষমতা সংবিধানেই লিখে দেওয়া হয়, তাকে Amending Power বলে।
বৈশিষ্ট্য: এটি সংবিধানের ভেতরে থেকে কাজ করে। এটি অসীম নয়; বরং সংবিধানের নির্দিষ্ট নিয়ম (যেমন: দুই-তৃতীয়াংশ ভোট) মেনে চলতে হয়।
উদ্দেশ্য: সময়ের প্রয়োজনে সংবিধানকে আধুনিক রাখা।
৩. উদ্ভূত বা অনুজাত ক্ষমতা (Derivative/Constituted Power)
সংবিধানের মাধ্যমে যেসব রাষ্ট্রীয় অঙ্গ তৈরি হয় (যেমন: সংসদ, বিচার বিভাগ, এবং শাসন বিভাগ), তাদের ক্ষমতাকে বলা হয় Derivative Power।
বৈশিষ্ট্য: এদের নিজস্ব কোনো অসীম ক্ষমতা নেই। সংবিধান এদের যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছে, এরা ঠিক ততটুকুই চর্চা করতে পারে। এরা সংবিধানের উর্ধ্বে নয়, বরং সংবিধানের অনুগত।
এই ধারণাগুলোর বিকাশে প্রধানত দুটি তত্ত্ব বা ধারা কাজ করে:
অ্যাব সিয়ের (Abbé Sieyès) এর তত্ত্ব: ফরাসি বিপ্লবের সময় তিনি প্রথম এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, "জনগণের ইচ্ছা" (Constituent Power) এবং "সরকারের কাজ" (Constituted Power) এক নয়। সরকার কেবল জনগণের দেওয়া আমানত রক্ষা করে মাত্র।
আইনি ইতিবাদ (Legal Positivism): এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সর্বোচ্চ নিয়ম (Grundnorm) থাকা প্রয়োজন। এই আদি নিয়ম বা 'গ্রুন্ডনর্ম' থেকেই পরবর্তী সকল ক্ষমতার (Derivative Power) বৈধতা আসে।
সীমিত সরকার বা সাংবিধানিকতাবাদ (Constitutionalism): এই তত্ত্বের মূল কথা হলো সরকারের ক্ষমতা অসীম হতে পারে না। ক্ষমতাকে 'আদি' এবং 'উদ্ভূত'—এই দুই ভাগে ভাগ করার মূল লক্ষ্যই হলো সরকারকে সংবিধানের শিকলে বেঁধে রাখা।
সহজভাবে মনে রাখার উপায়:
Constituent Power হলো সেই ব্যক্তি যে ঘরটি বানিয়েছে।
Amending Power হলো সেই নিয়ম যার মাধ্যমে ঘরে দেয়াল বাড়ানো বা কমানো যায়।
Derivative Power হলো ঘরের ভেতরে থাকা আসবাবপত্র বা মানুষজন, যারা ঘরের কাঠামোর বাইরে যেতে পারে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রেক্ষাপটে Constituent Power এবং Amending Power-এর বিতর্কটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ৭খ অনুচ্ছেদ (Article 7B) এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ (Article 142) এর মধ্যকার সম্পর্ক বুঝতে হলে আমাদের ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত 'Basic Structure Doctrine' বা 'সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নীতি' বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে এর প্রয়োগ ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ১৪২ অনুচ্ছেদ: সংশোধনকারী ক্ষমতা (Amending Power)
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা দেয়। এটি একটি Constituted বা Derivative Power। সংসদ চাইলেই যা খুশি পরিবর্তন করতে পারে না; তাকে নির্দিষ্ট পদ্ধতি (যেমন: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা) মেনে চলতে হয়।
২. ৭খ অনুচ্ছেদ: আদি শক্তির সীমাবদ্ধতা (Limits on Amending Power)
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭খ অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। এটি সংশোধনকারী ক্ষমতার ওপর একটি বিশাল 'ব্রেক' বা সীমাবদ্ধতা।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের একটি বড় অংশ (যেমন: প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র) 'অসংশোধনযোগ্য' (Unamendable)।
তাৎপর্য: সংসদ (Amending Power) এখন আর সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলো পরিবর্তন করতে পারবে না Basic structure theory এর কারনে। যদি করতে হয়, তবে তা সাধারণ সংসদের ক্ষমতার বাইরে—সেটি করার জন্য আবার জনগণের Original Constituent Power বা নতুন কোনো গণপরিষদের প্রয়োজন হবে।
৩. বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা ও প্রাসঙ্গিক মামলা
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এই ক্ষমতাগুলোর সীমানা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ (৮ম সংশোধনী মামলা, ১৯৮৯): এটি বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, সংসদ (Amending Power) সংবিধানের 'মৌলিক কাঠামো' (Basic Structure) পরিবর্তন করতে পারে না।
১৬শ সংশোধনী মামলা: এই মামলায় আদালত পুনরায় নিশ্চিত করে যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সংসদ চাইলেই খর্ব করতে পারে না।
৪. তাত্ত্বিক সংঘাত: সার্বভৌমত্ব বনাম আইনি সীমাবদ্ধতা
এখানে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দেয়—যদি সংবিধানের একটি অংশ 'অসংশোধনযোগ্য' হয়, তবে কি বর্তমান সংসদ তার সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে?
আইনবিদদের মতে, সংসদ যেহেতু একটি Derivative Power, তাই সে সৃষ্টিকর্তার (Constituent Power/জনগণ) দেওয়া সীমানা অতিক্রম করতে পারে না।
৭খ অনুচ্ছেদ মূলত 'জনগণের সার্বভৌমত্ব'কে রক্ষা করার একটি ঢাল, যাতে সাময়িক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে কোনো দল সংবিধানের মূল চরিত্র বদলে দিতে না পারে।
সংক্ষেপে:
বাংলাদেশে Original Constituent Power-এর মালিক জনগণ (অনুচ্ছেদ ৭), কিন্তু সংসদ কেবল Limited Amending Power চর্চা করে। ৭খ অনুচ্ছেদ প্রবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সংসদ এখন আর 'সার্বভৌম সংশোধনকারী' নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
নিচে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure) তত্ত্ব।
১. বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (Basic Structure)
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন মামলার রায়ে (বিশেষ করে ৮ম ও ১৬শ সংশোধনী মামলা) এবং সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদে কিছু বিষয়কে 'মৌলিক কাঠামো' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যা কোনোভাবেই সংশোধন করা সম্ভব নয়:
জনগণের সার্বভৌমত্ব: রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ (অনুচ্ছেদ ৭)।
প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক স্বরূপ: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র এবং এখানে গণতন্ত্র নিশ্চিত থাকবে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র।
এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র: বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র (Unitary State), এটি কোনো ফেডারেশন নয়।
মৌলিক অধিকার: সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: আইনের শাসন রক্ষা এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।
সংসদীয় গণতন্ত্র: সরকার ব্যবস্থা হবে সংসদীয় পদ্ধতির।
সংবিধানের প্রাধান্য: সংবিধানই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন।
২. তাত্ত্বিক সমন্বয় (Integration of Theories)
আমরা যে তিনটি ক্ষমতার কথা বলেছি, মৌলিক কাঠামোর ধারণাটি তাদের সাথে নিচের চিত্র অনুযায়ী সম্পর্কিত:
ক্ষমতা (Power) তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theory) মৌলিক কাঠামোর সাথে সম্পর্ক
Constituent Power (আদি শক্তি) Abbé Sieyès-এর জনগণের সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব। এটিই 'মৌলিক কাঠামো'র জন্মদাতা। ১৯৭২ সালে এই শক্তির মাধ্যমেই সংবিধানের মূল ভিত্তিগুলো নির্ধারিত হয়েছিল।
Amending Power (সংশোধনকারী ক্ষমতা) Constitutionalism (সাংবিধানিকতাবাদ) বা সীমিত সরকার তত্ত্ব। এটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে চলে। কিন্তু 'মৌলিক কাঠামো' তত্ত্বের কারণে এই ক্ষমতা এখন সীমিত। এটি ঘর মেরামত করতে পারে, কিন্তু ভিত্তি (Foundation) ভাঙতে পারে না।
Derivative Power (উদ্ভূত ক্ষমতা) Legal Positivism ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি। সংসদ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ এই কাঠামোর ভেতর থেকেই তাদের বৈধতা পায়। মৌলিক কাঠামো এদের কর্মপরিধি নির্দিষ্ট করে দেয়।
৩. কেন এই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ?
১. বৈধতার সংকট রোধ: যদি সংসদ (Amending Power) সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (যেমন গণতন্ত্র) পরিবর্তন করে ফেলে, তবে সেটি আর 'সংশোধন' থাকে না, বরং সেটি একটি 'সাংবিধানিক বিপ্লব' হয়ে যায়। এই বিচ্যুতি রোধ করতেই তাত্ত্বিকভাবে মৌলিক কাঠামোকে আদি শক্তির (Constituent Power) অংশ হিসেবে ধরা হয়।
২. সংসদ বনাম সংবিধান: সিয়ের (Sieyès) এর তত্ত্ব অনুযায়ী, সংসদ কখনো সংবিধানের চেয়ে বড় হতে পারে না। কারণ সংসদ হলো 'Constituted Power' (সৃষ্ট/ ), আর সংবিধান হলো 'Constituent Power' (সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা/ will of framers) এর বহিঃপ্রকাশ।
৩. ৭খ অনুচ্ছেদের ভূমিকা: বাংলাদেশের সংবিধানে ৭খ অনুচ্ছেদ যুক্ত করার মাধ্যমে তাত্ত্বিক 'Basic Structure' ধারণাটিকে একটি লিখিত আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আদালত এখন সরাসরি বলতে পারে যে, কোনো সংশোধন মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হলে তা বাতিল।
সহজ কথায়:
জনগণ তাদের Constituent Power দিয়ে একটি ঘর (সংবিধান) বানিয়েছে যার কিছু পিলার (Basic Structure) আছে। সংসদ সেই ঘরের মেঝের টাইলস পরিবর্তন বা রং করার Amending Power রাখে, কিন্তু পিলার ভাঙার ক্ষমতা তার নেই। কারণ সংসদ নিজেই সেই ঘরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি আসবাব বা Derivative Power মাত্র।Derivative power exercise করতে হবে সংবিধানে বর্ণিত পন্থা অনুযায়ী। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ও ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পন্থার বাইরে সংবিধান সংশোধন করা যায়না। রুশোর Social contract theory, ডাইসির Rule of law, মন্টেস্কু এর seperation of power, কেলসেন এর legal postivism মতবাদ অর্থাৎ বৈধতার মূল উৎস Grundnorm বা মূল নিয়ম মতবাদ সমূহ Constituent power ব্যাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফেলেছে।আমাদের আলোচনা গুলো তার ই বহি: প্রকাশ।
Written, composed and edited by
Anichur Rahman
Concept is being edited. It can not be used for academic or any other purpose.