08/06/2026
e-GP সিস্টেমের বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং একজন ব্যবহারকারীর তিক্ত অভিজ্ঞতা: একটি মাঠপর্যায়ের পর্যালোচনা
বাংলাদেশে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে Electronic Government Procurement (e-GP) সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, যা সময় ও ব্যয় হ্রাস করবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এই সিস্টেমটি এখনো সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় এবং ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর হতে পারেনি। এর ব্যাক-এন্ড প্রযুক্তি এবং ব্যাংকিং গেটওয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রতিনিয়ত ব্যবহারকারীদের চরম ভোগান্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
সম্প্রতি একজন ব্যবহারকারী হিসেবে আমার নিজের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা এই ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। পর পর দুই রাতে দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে e-GP-র ফি জমা দেওয়ার চেষ্টা করি। প্রথম রাতে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে পেমেন্ট করার পর সিস্টেমের ত্রুটির কারণে টাকা কেটে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিফান্ড (ফেরত) চলে আসে। অর্থাৎ, টাকা ফেরত আসলেও পেমেন্টটি সফল হয়নি, যা প্রক্রিয়াটিকে বিলম্বিত করে। এর পরদিন রাতে ব্র্যাক ব্যাংকের গেটওয়ে ব্যবহার করে পুনরায় চেষ্টা করা হলে, এবার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও e-GP সিস্টেমে তা আপডেট হয়নি এবং টাকাটিও মাঝপথে আটকে থাকে।
একটি তথাকথিত সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমে একই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করতে গিয়ে এই ধরনের অসঙ্গতি ও অনিশ্চয়তা সত্যিই অনভিপ্রেত। এই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে e-GP সিস্টেমের মূল চ্যালেঞ্জ এবং উন্নয়ন প্রয়োজনীয়তাগুলো নিচে বিশদভাবে বর্ণনা করা হলো:
১. পেমেন্ট গেটওয়ের অকার্যকর সমন্বয় ও রিয়েল-টাইম আপডেটের অভাব
ই-জিপি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত দুর্বলতা হলো ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের (Core Banking System) সাথে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (CPTU)-এর সার্ভারের রিয়েল-টাইম ডেটা সিঙ্ক্রোনাইজেশনের অভাব। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়ার পরও e-GP সার্ভার তাৎক্ষণিকভাবে সেই পেমেন্ট নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে কখনো টাকা রিফান্ড হয়ে যায়, আবার কখনো মাঝপথে আটকে থাকে। ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন না তার দরপত্রটি আদৌ জমা হলো কি না, যা সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিভ্রান্তি ও বিলম্ব সৃষ্টি করে।
২. রেজিস্ট্রেশন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা
একটি e-GP রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্যাংক ভেরিফিকেশন, ডকুমেন্ট যাচাই এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের একাধিক ধীরগতিসম্পন্ন ও জটিল ধাপ পার হতে হয়। একটি আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় যেখানে অ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভেশন সর্বোচ্চ ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হওয়া উচিত, সেখানে এই ধরণের আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি নতুন উদ্যোক্তাদের শুরুতেই নিরুৎসাহিত করে।
৩. আংশিক ডিজিটালাইজেশন বা দ্বৈত কাগজের বাধ্যবাধকতা
অনলাইন মাধ্যমে আবেদন এবং সাবমিশন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের হার্ড কপি বা কাগজের নথি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সশরীরে গিয়ে জমা দিতে হয়। অনলাইন পেমেন্ট করার পরও ব্যাংক রসিদ বা চালানের কপির জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এই ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এটি ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তির কারণ।
৪. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ সংকোচন ও বিদেশী বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব
এই ধরণের জটিল, অনিশ্চিত এবং আংশিক ডিজিটাল প্রক্রিয়ার কারণে নতুন ঠিকাদার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SMEs) দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে এবং বাজারে একচেটিয়া পরিবেশ তৈরি হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সবসময় একটি দ্রুত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেম প্রত্যাশা করেন। কিন্তু এখানে বিদ্যমান প্রশাসনিক ধীরগতি এবং ব্যাংকিং ট্রানজেকশনের অনিশ্চয়তা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা ও সুপারিশমালা
e-GP সিস্টেমকে যদি সত্যিই একটি বিশ্বমানের, নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হয়, তবে দ্রুত নিচের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি:
সার্বক্ষণিক এপিআই (API) ইন্টিগ্রেশন: প্রতিটি অনুমোদিত ব্যাংকের পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে e-GP সার্ভারের সরাসরি সংযোগ থাকতে হবে, যাতে টাকা কাটার সাথে সাথে এক সেকেন্ডের মধ্যে সিস্টেমে পেমেন্ট স্ট্যাটাস আপডেট হয়।
তাৎক্ষণিক রিফান্ড ও ট্র্যাঙ্কিং পলিসি: কারিগরি ত্রুটির কারণে কোনো লেনদেন ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টার মধ্যে টাকা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত আসার প্রযুক্তিগত সমাধান থাকতে হবে। পাশাপাশি আটকে যাওয়া টাকা ট্র্যাক করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় হেল্পডেস্ক থাকা আবশ্যক।
শতভাগ পেপারলেস ও স্বয়ংক্রিয় ভেরিফিকেশন: অনলাইনে আবেদনের পর হার্ড কপি জমার নিয়ম সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও ট্রেড লাইসেন্সের সরকারি ডেটাবেজের সাথে e-GP-কে যুক্ত করে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া ১ দিনে নামিয়ে আনতে হবে।
উপসংহার:
e-GP নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। তবে এর বর্তমান বাস্তব প্রয়োগে যে প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। একটি সম্পূর্ণ অনলাইন, দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় এবং ব্যবহারবান্ধব সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে এটি দেশীয় ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাবে এবং একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সবার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
Send a message to learn more