25/04/2026
স্ট্যাম্পে লেনদেন ও ৪০৬/৪২০ ধারার মামলাঃ কেন অধিকাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যান?
রহিম তার বন্ধু করিমকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ৩ লক্ষ টাকা দেন এবং ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে একটি চুক্তিপত্র করেন। সেখানে লেখা ছিল, ৬ মাসের মধ্যে বিদেশ পাঠাতে না পারলে রহিম টাকা ফেরত দেবেন। রহিম বিদেশ পাঠাতেও পারলেন না, টাকাও ফেরত দিলেন না। করিম আদালতে দন্ডবিধি’র ৪০৬/৪২০ ধারায় মামলা করলেন।
বিচারিক পর্যায়ে আদালত দেখলেন যে, রহিমের কাছে স্ট্যাম্পটি একটি 'চুক্তিপত্র'। যেহেতু করিম স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে চুক্তিতে সই করেছেন, তাই এটি একটি দেওয়ানি দায়। রহিম যে শুরু থেকেই প্রতারক ছিলেন, তার কোনো অকাট্য প্রমাণ করিম দিতে পারেননি। ফলে রহিমকে খালাস প্রদান করা হয় এবং করিমকে পরামর্শ দেওয়া হয় দেওয়ানী আদালতে 'মানি স্যুট' মোকদ্দমা করে টাকা আদায়ের জন্য।
জালাল মিয়া জমি বিক্রির জন্য কাদের বিশ্বাস এর কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা বায়না গ্রহণ করেন। পরে জালাল মিয়া জমিটি রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে অন্য একজনের কাছে বিক্রি করে দেন। 'কাদের বিশ্বাস এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দ-বিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় মামলা করেন।
আদালতে যখন বিচার শুরু হয়, তখন দেখা যায় জালাল মিয়া এবং কাদের বিশ্বাস এর মধ্যে একটি বৈধ লিখিত চুক্তি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিকার পাওয়ার কথা ছিল সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের অধীনে চুক্তি প্রবলের মোকদ্দমা বা মানি স্যুট করে টাকা ফেরত এর মোকদ্দমা। যেহেতু এটি একটি দেওয়ানি চুক্তি ছিল, তাই আদালত ধরে নেন যে এখানে জালাল মিয়ার শুরুতে প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং তিনি পরবর্তীতে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। ফলে ফৌজদারি মামলায় জালাল মিয়া খালাস পেয়ে যান।
তিনশত টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে টাকা লেনদেন বা চুক্তি করার পর যখন কোনো বিরোধ তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষ সরাসরি দন্ডবিধি’র ৪০৬/৪২০ ধারায় ফৌজদারি মামলা করেন। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যান।
৪২০ ধারার ক্ষেত্রে মামলার শুরুতেই প্রমাণ করতে হয় যে, আসামির শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল। যদি লেনদেনের সময় কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে, কিন্তু পরবর্তীতে কোনো কারণে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি প্রতারণা নয়, বরং চুক্তি ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৪০৬ ধারা ক্ষেত্রে সম্পদ গচ্ছিত রাখার বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়।
উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো যেখানে একটি লিখিত চুক্তি (যেমন ৩শ টাকার স্ট্যাম্প) বিদ্যমান, সেখানে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে একটি দেওয়ানি সম্পর্ক তৈরি হয়। স্ট্যাম্পে লেখা থাকে যে "টাকা না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে"। এটি মূলত একটি চুক্তিবদ্ধ দায়। ফৌজদারি আদালত মনে করেন, এটি টাকা আদায়ের মোকদ্দমা কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয়।
কারণ ৪২০ ধারায় সাজা দিতে হলে বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে, আসামি যখন স্ট্যাম্পে সই করেছিলেন বা টাকা নিয়েছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মনে প্রতারণার উদ্দেশ্য ছিল। যদি আসামি শুরুতে কাজ করার চেষ্টা করেন কিন্তু পরে ব্যর্থ হন, তবে আইনানুযায়ী সেটি হবে চুক্তি ভঙ্গ, কিন্তু প্রতারণা নয়।
আবার স্ট্যাম্পে সাধারণত টাকা লেনদেনের স্বীকারোক্তি থাকে। কিন্তু দ-বিধির ৪০৬ ধারার জন্য বিশ্বাসভঙ্গ প্রমাণ করতে হয়। যদি স্ট্যাম্পে লেখা থাকে যে এটি একটি 'ঋণ' বা 'ধার', তবে সেটি বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে গণ্য হয় না, কারণ ঋণ দেওয়া মানে মালিকানা হস্তান্তর করা, আমানত রাখা নয়।
বিভিন্ন মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, নিছক চুক্তি ভঙ্গ মানেই প্রতারণা নয়। যদি কোনো লেনদেনের শুরুতেই অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে, তবে তা ৪২০ ধারার আওতায় আসবে না। ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে করা চুক্তির ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য।
উচ্চ আদালত আরেকটি সিদ্ধান্তে জানিয়েছেন, যদি কোনো বিরোধের সমাধান দেওয়ানি আদালতে সম্ভব হয় (যেমন স্ট্যাম্পের চুক্তি অনুযায়ী টাকা আদায়ের মামলা), তবে ফৌজদারি আদালত সেই মামলা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করেন। একে আদালতের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য করা হয়।
উচ্চ আদালত আরও বলছেন, পাওনা টাকা আদায়ের সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে ফৌজদারি মামলাকে ব্যবহার করা যাবে না। দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি রঙ দেওয়া আইনত দ-নীয়।
তবে ৩শ টাকার স্ট্যাম্পের বিরোধে ফৌজদারি মামলার সাফল্যের জন্য কিছু বিষয়ে মনোযোগি হলে সাফল্য আসতে পারে। যেমন-
১। আসামি শুরুতেই মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাদীকে প্রলুব্ধ করেছিলেন। যেমন ভুয়া ভিসা দেখানো ইত্যাদি
২। টাকাটি ধার হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য 'আমানত' হিসেবে রাখা হয়েছিল।
৩। স্ট্যাম্পের সাক্ষীদের মাধ্যমে প্রমাণ করা যে, লেনদেনের সময়ই আসামির আচরণ সন্দেহজনক ছিল।