01/06/2026
🏛️ দেওয়ানি আদালতে বেআইনি দখল উচ্ছেদ মামলা: আইনি ধারা ও সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া(বিস্তারিত)
বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন ও দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে তার সম্পত্তি থেকে বেআইনিভাবে বেদখল করা হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করতে পারেন। নিচে সুনির্দিষ্ট আইনি ধারা ও ধাপসহ মামলা করার সম্পূর্ণ গাইডলাইন দেওয়া হলো:
⚖️ প্রধান দুটি আইনি প্রতিকার (আইনের ধারা)
জমির মালিকানা এবং বেদখল হওয়ার সময়ের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন (The Specific Relief Act, 1877) এর দুটি প্রধান ধারায় মামলা করা হয়:
১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারা (শুধু দখল পুনরুদ্ধার):
কখন করবেন: যদি আপনি জমি বা স্থাবর সম্পত্তি থেকে বেআইনিভাবে বেদখল হন এবং বেদখল হওয়ার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আদালতে আসেন।
সুবিধা: এই ধারায় মামলার ক্ষেত্রে আপনার জমির চূড়ান্ত মালিকানা বা স্বত্ব (Title) প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় না; কেবল আপনি পূর্বে দখলে ছিলেন এবং আপনাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে—এটি প্রমাণ করলেই আদালত দখল ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
সীমাবদ্ধতা: সরকারের বিরুদ্ধে এই ধারায় মামলা করা যায় না এবং এই ধারার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বা রিভিউ করা যায় না (তবে মহামান্য হাইকোর্টে রিভিশন করা যায়)।
২. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারা (স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক দখল পুনরুদ্ধার):
কখন করবেন: যদি বেদখল হওয়ার পর ৬ মাসের বেশি সময় পার হয়ে যায়। এই ধারায় মামলা করার তামাদি মেয়াদ বা সময়সীমা হচ্ছে বেদখল হওয়ার পর থেকে ১২ বছর (তামাদি আইন, ১৯০৮ এর ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী)।
সুবিধা: এই ধারায় জমি থেকে উচ্ছেদের পাশাপাশি জমির ওপর আপনার যে আইনি মালিকানা বা স্বত্ব (Title) আছে, আদালত তা ঘোষণা করেন। সাধারণত এই ধারার সাথে আরজির ভেতরে ৪২ ধারার (ঘোষণামূলক মামলা) প্রতিকারও চাওয়া হয়।
🧾 ধাপ ১: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আরজি (Plaint) প্রস্তুতি
মামলা দায়েরের জন্য দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (CPC) এর আদেশ ৭, বিধি ১ অনুযায়ী একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে একটি 'আরজি' বা আরজি-পত্র প্রস্তুত করতে হবে। আরজির সাথে নিচের প্রমাণগুলো দাখিল করতে হবে:
মালিকানার প্রমাণ: মূল দলিল (Sub-kabala), হেবা বা বন্টননামা দলিল অথবা ওয়ারিশন সনদ।
রেকর্ড বা খতিয়ান: সিএস, এসএ, আরএস এবং হালনাগাদ বিএস/বিআরএস খতিয়ান।
ভূমি উন্নয়ন কর: নামজারি খতিয়ান (Mutation), ডিসিআর (DCR) এবং হালনাগাদ খাজনার রশিদ।
বেদখলের বিবরণ: বিবাদী ঠিক কত তারিখে, কোন দাগের, কতটুকু জমি অবৈধভাবে দখল করেছে তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও চৌহদ্দি (সীমানা)।
💸 ধাপ ২: কোর্ট ফি (Court Fee) নির্ধারণ ও মামলা দাখিল
৯ ধারার অধীনে মামলা হলে: সম্পত্তির মূল্যের (Valuation) ওপর যে অ্যাড-ভ্যালোরেম (আনুপাতিক) কোর্ট ফি আসে, তার অর্ধেক (Half) কোর্ট ফি দিতে হয়।
৮ ধারার অধীনে মামলা হলে: সম্পত্তির বর্তমান বাজার মূল্যের ওপর সম্পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালোরেম (Ad-valorem) বা আনুপাতিক কোর্ট ফি জমা দিতে হয় (কোর্ট ফি আইন, ১৮৭০ অনুযায়ী)।
ফি জমাদানের পর দেওয়ানি কার্যবিধির ২৬ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালতে (সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালত) মামলাটি ডকেটভুক্ত বা ফাইলিং করা হয় এবং আদালত একটি 'দেওয়ানি মামলা নম্বর' (Other Class/Title Suit No.) প্রদান করেন।
📩 ধাপ ৩: সমন জারি (Summon Issuance)
মামলাটি আদালত আমলে নেওয়ার পর দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৫, বিধি ১ অনুযায়ী বিবাদীকে (দখলদারকে) আদালতে হাজির হয়ে লিখিত জবাব (Written Statement) দেওয়ার জন্য সমন বা নোটিশ জারি করা হয়।
⚖️ ধাপ ৪: বিচার ও সাক্ষ্যগ্রহণ (Trial & Evidence)
উভয় পক্ষের জবাব দাখিলের পর মামলার ইস্যু গঠন (Issue Frame) হয়। এরপর সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (The Evidence Act) অনুযায়ী:
বাদীকে ডকে দাঁড়িয়ে নিজের আরজির পক্ষে জবানবন্দি ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয় এবং বিবাদী পক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা (Cross-examination) করেন।
একইভাবে বিবাদী পক্ষ তাদের সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে।
প্রয়োজনবোধে আদালত আদেশ ২৬, বিধি ৯ অনুযায়ী সরজমিনে তদন্তের জন্য 'স্থানীয় তদন্তকারী কমিশনার' (Local Investigation Commissioner) নিয়োগ করতে পারেন।
🏆 ধাপ ৫: রায় ও ডিক্রি (Judgment & Decree)
শুনানি ও সওয়াল-জবাব শেষে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২০, বিধি ১ থেকে ৫ অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত মামলার রায় (Judgment) এবং রায়ের আলোকে ডিক্রি (Decree) প্রচার করবেন। ডিক্রিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে বিবাদী অবৈধ দখলদার এবং বাদী সম্পত্তিটি ফেরত পাওয়ার আইনগত অধিকারী।
👮♂️ ধাপ ৬: ডিক্রি জারি ও চূড়ান্ত উচ্ছেদ (Ex*****on of Decree)
রায় বা ডিক্রি পাওয়ার সাথে সাথেই জমিতে গিয়ে দখল নেওয়া যায় না। দখল বুঝে পাওয়ার জন্য বাদীকে দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের অধীনে একই আদালতে একটি 'ডিক্রি জারি মামলা' (Ex*****on Case) দায়ের করতে হবে।
এই ডিক্রি জারি মামলার প্রেক্ষিতে আদালত থেকে একজন 'নাজির' বা 'পারোয়ানা জারিকারক' নিয়োগ করা হয়।
আদালতের নির্দেশে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ঢোল পিটিয়ে, বেআইনি স্থাপনা ভেঙে বা উচ্ছেদ করে, জমিতে লাল পতাকা ও বাঁশ পুঁতে বাদীকে শান্তিপূর্ণ ও আইনগত দখল (Khas Possession) বুঝিয়ে দেওয়া হয়।