19/09/2026
"মাই লর্ড, আমিই সেই দলিল" — জিন্নাহ যেদিন এক শুনানিতেই জিতেছিলেন এক "আশাহীন" মামলা
১৯৩৬ সালের সেই গ্রীষ্মে কাশ্মিরের ডাল হ্রদের জলে ভাসমান এক হাউসবোটে বসে ছিলেন এক ক্লান্ত, ছুটিযাপনরত মানুষ। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ — বোম্বাই বারের সবচেয়ে দাপুটে ব্যারিস্টার, যাঁর যুক্তি শুনতে কাঁপত এজলাস — সেদিন শুধুই এক পর্যটক ছিলেন।
বোন ফাতিমা জিন্নাহকে সঙ্গে নিয়ে শিবপোরায় তিনি এসেছিলেন কাশ্মীরের দ্বিতীয়বার — নিছক প্রকৃতির টানে, কোনো মামলা লড়ার পরিকল্পনা নিয়ে নয়।
কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। সেই হাউসবোটের দরজায় একদিন কড়া নাড়লেন দুজন মানুষ — তরুণ কাশ্মীরি রাজনীতিক শেখ আবদুল্লাহ, আর আইনজীবী আফজাল বেগ। তাঁদের হাতে ছিল একটি ফাইল — এমন এক মামলা, যা ইতিমধ্যে একবার আদালতে হেরে বসে আছে, আর যাকে গোটা শ্রীনগর ধরেই নিয়েছে অজেয়, আশাহীন।
গল্পটার শুরু আরও পাঁচ বছর আগে। ১৯৩১ সালের এক সেপ্টেম্বরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান হানিফা বেগমের প্রথম স্বামী। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই সময়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হানিফা বিয়ে করেন আবদুল কবিরকে, আর কিছুকাল পরই তাঁকে ছেড়ে বিয়ে করেন মির্জা মেহের আলীকে। এই দ্বিতীয় বিয়েটিই হয়ে ওঠে ঝড়ের কেন্দ্র — ক্ষুব্ধ আবদুল কবির আদালতে ছুটে যান, হানিফা ও মেহের আলী দুজনের বিরুদ্ধেই দায়ের করেন ফৌজদারি অভিযোগ, রণবীর পেনাল কোডের ৪৯৪ ধারায় — জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকা অবস্থায় পুনর্বিবাহের অপরাধ।
নিম্ন আদালত দুই আসামির ভাগ্য লিখল দুই রকমভাবে। হানিফা দোষী সাব্যস্ত হলেন, কারণ তিনি নিজের পূর্ববর্তী বিবাহের অবস্থা সম্পর্কে জানতেন বলে ধরে নেওয়া হলো। মেহের আলী পেলেন খালাস — যুক্তি ছিল, হানিফার প্রথম বিয়ে আদৌ ইদ্দতের মধ্যে হয়েছিল কিনা তা তিনি জানতেন না, তাই তাঁর কোনো অপরাধমূলক অভিপ্রায় ছিল না।
কিন্তু গল্প সেখানেই থামল না। অসন্তুষ্ট আবদুল কবির শ্রীনগর হাইকোর্টে আপিল করলেন, যেখানে এজলাসে বসতেন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি শ্রী বিরজু দলাল। আর এখানেই বিপত্তি — নিম্ন আদালতে ইতিমধ্যে একবার হেরে যাওয়া আফজাল বেগের একার পক্ষে এই জটিল আপিল সামলানো প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। মামলাটি হয়ে উঠল কাশ্মীরের আইনজীবী মহলে এক প্রবাদপ্রতিম "আশাহীন" মামলা।
এমন এক সংকটে দাঁড়িয়ে শেখ আবদুল্লাহর মাথায় একটি নামই ঘুরপাক খেয়েছিল — জিন্নাহ।
মেহের আলী নিজে ছিলেন মুসলিম কনফারেন্স আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী, যে আন্দোলনের নেতা ছিলেন স্বয়ং শেখ আবদুল্লাহ। হয়তো এই রাজনৈতিক সংহতির টানেই শেখ আবদুল্লাহ ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে এসেছিলেন
আপিল আদালতে জিন্নাহ আপিল টা পরিচালনা করেন।
মামলাটির গভীরে ঢুকতে হলে বুঝতে হবে ৪৯৪ ধারার কাঠামো। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণ করতে দুটি জিনিস প্রয়োজন। প্রথমত, কার্যিক উপাদান বা actus reus — স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় পুনর্বিবাহ সংঘটিত হওয়া। দ্বিতীয়ত, মানসিক উপাদান বা mens rea — পূর্ববর্তী বিবাহ বৈধভাবে বলবৎ আছে, এই সম্পর্কে জ্ঞান বা সচেতনতা। শুধু কাজটি ঘটলেই চলে না, অভিযুক্তের সেই জ্ঞানও প্রমাণ করতে হয়।
নিম্ন আদালতে মেহের আলীর খালাসের ভিত্তি ছিল ignorantia facti excusat — তথ্যগত অজ্ঞতা অব্যাহতি দেয়, এই নীতি। কিন্তু এই প্রতিরক্ষা ছিল ভঙ্গুর কাচের মতো — বিচারকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে, তাই আপিলে এক ধাক্কাতেই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল।
জিন্নাহ যখন শেষমেশ ব্রিফ হাতে নিলেন, তখন এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হলো আদালতকক্ষে — তাঁর হাতে কোনো আইনগ্রন্থ নেই, কোনো রেফারেন্স নেই। শুধু তীক্ষ্ণ যুক্তি আর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি নিয়ে তিনি দাঁড়ালেন বিচারপতি বিরজু দলালের সামনে। আর সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ — মেহের আলীর "অজ্ঞতা" নিয়ে তর্ক না করে, তিনি সরাসরি আঘাত হানলেন মূল বিবাহের বৈধতায়, যাতে গোড়া থেকেই অপরাধের ভিত্তিটা ধসে পড়ে।
এক লাইনের প্রশ্ন, যার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল সবকিছু
হানিফা কি ইদ্দত পালন শেষ হওয়ার আগেই আবদুল কবিরকে বিয়ে করে ফেলেছিলেন?
এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে ছিল মামলার সম্পূর্ণ ভাগ্য:
উত্তর "হ্যাঁ" হলে → হানিফা-কবিরের বিয়ে অবৈধ → তাহলে হানিফা-মেহের আলীর বিয়েই বৈধ → মেহের আলী নির্দোষ।
উত্তর "না" হলে → হানিফা-কবিরের বিয়েই বৈধ → তাহলে হানিফা-মেহের আলীর বিয়ে অবৈধ → মেহের আলী দোষী।
ইদ্দত গণনার দ্বৈত নিয়ম — জিন্নাহর অস্ত্র
শরিয়া আইনে ইদ্দতের মেয়াদ গোনার দুটি ভিন্ন পথ আছে, আর কোন পথ প্রযোজ্য হবে তা নির্ভর করে একটিমাত্র শর্তের ওপর — স্বামীর মৃত্যু ঠিক কোন দিনে হয়েছিল। যদি মৃত্যু হয় চান্দ্র মাসের প্রথম দিনে, তাহলে ইদ্দত গণনা হবে চার চান্দ্র মাস দশ দিন হিসেবে। কিন্তু মৃত্যু যদি মাসের অন্য যেকোনো দিনে হয়, তাহলে ইদ্দত গণনা করতে হবে সরল ১৩০ দিন হিসেবে, সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী।
জিন্নাহ শান্তভাবে দেখিয়ে দিলেন — হানিফার প্রথম স্বামীর মৃত্যু চান্দ্র মাসের প্রথম দিনে ঘটেনি, তাই প্রথম নিয়ম এখানে খাটে না, খাটে দ্বিতীয় নিয়ম, অর্থাৎ ১৩০ দিনের সরল হিসাব। এই হিসাব মৃত্যুর তারিখ থেকে গুনে যেদিন ইদ্দত শেষ হওয়ার কথা, সেই তারিখ আর হানিফা-কবিরের বিয়ের তারিখ পাশাপাশি রাখলেই ধরা পড়ে সত্য — বিয়েটা হয়েছিল ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই।
তিনটি ধাপে ধসে পড়ল অভিযোগ
এই একটিমাত্র গাণিতিক-শরিয়া যুক্তি থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে এলো তিনটি অনিবার্য সিদ্ধান্ত — একধরনের ধারাবাহিক আইনি যুক্তিশৃঙ্খল:
হানিফা-কবিরের বিয়ে ইদ্দতকালীন → শরিয়া মতে void ab initio (গোড়া থেকেই বাতিল)
যেহেতু কবিরের সাথে বিয়েই অবৈধ, হানিফা তখনো আইনত অবিবাহিতা ছিলেন যখন মেহের আলীকে বিয়ে করেন → হানিফা-মেহের আলীর বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ
বৈধ বিয়ে থাকায় ধারা ৪৯৪-এর actus reus-ই অনুপস্থিত → কোনো অপরাধ সংঘটিতই হয়নি
এই কৌশলের আসল শক্তি ছিল এখানেই — এটি বিচারকের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের (subjective belief) ওপর নির্ভর করে না, দাঁড়িয়ে থাকে বস্তুনিষ্ঠ তারিখ-গণনার (objective fact) কঠিন মাটিতে। ফলে প্রতিপক্ষের পক্ষে একে খণ্ডন করা হয়ে দাঁড়াল প্রায় অসম্ভব।
একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
সেদিন আদালতকক্ষ যেন উপচে পড়েছিল কৌতূহলী মানুষের ঢেউয়ে। ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইউসুফ সরফের বর্ণনায়, আইনজীবী, ছুটিতে থাকা সরকারি কর্মচারী, দোকান বন্ধ রেখে আসা ব্যবসায়ী, উৎসুক ছাত্র — সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সেদিন ভিড় করেছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত চোখে দেখতে। স্বয়ং শেখ আবদুল্লাহও ছিলেন সেই ভিড়ের মধ্যে।
জিন্নাহর যুক্তি শুনে গোটা এজলাস নিস্তব্ধ, বিস্মিত। বিচারপতি নিজেই না থেকে পারলেন না — জিজ্ঞেস করলেন, "মি. জিন্নাহ, এই যুক্তির পেছনে কোনো দলিল (authority) আছে কি?"
আর জিন্নাহর জবাব, যা আজও ইতিহাসের পাতায় কিংবদন্তির মতো বেঁচে আছে —
"মাই লর্ড, আমিই সেই দলিল।"
জিন্নাহর সরল যুক্তি ছিল কোন বিতর্ক নিয়ে যদি আইন থাকে তখন আইন মানতে হবে। আইন না থেকে যদি কেস ল থাকে তাহলে সেই কেস ল মানতে হবে। কিন্তু যদি কিছু না থাকে তাহলে ঘটনা থেকে পরিষ্কার হওয়া গেলে সেই বির্তক কে precedence তৈরীর সুযোগ ধরতে হবে। ইদ্দত গননার জন্য আগে কোন জাজমেন্ট নেই। সুতরাং এই জাজমেন্ট হউক নজীর তৈরীর আরেক নজীর।
এই একটি বাক্য নিছক নাটকীয়তা ছিল না। এটি বলে দেয় — তাঁর যুক্তি কোনো লিখিত ফিকহ গ্রন্থ বা পূর্বনজির থেকে ধার করা নয়, বরং ইসলামি ক্যালেন্ডার-গণনার এক স্বতঃসিদ্ধ, স্বতঃপ্রমাণিত গাণিতিক প্রয়োগ — যার জন্য বাড়তি কোনো দলিলের দরকারই পড়ে না। আর সেদিনই, প্রথম ও একমাত্র শুনানিতেই, মামলাটি চলে গেল মেহের আলীর পক্ষে।
শেখ আবদুল্লাহর আত্মজীবনী আতিশ-ই-চিনার-এ লেখা আছে, জিন্নাহ প্রতি হাজিরায় ১০০০ রুপি ফি দাবি করেছিলেন — সে যুগে যা এক বিশাল অঙ্ক, মেহের আলীর সাধ্যের বহু বাইরে। অনেক দর কষাকষির পরও নাকি জিন্নাহ নিজের শর্তে অনড় ছিলেন।
কিন্তু ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইউসুফ সরফ শোনান একেবারে ভিন্ন এক গল্প — তাঁর মতে, মেহের আলী নিজেই জিন্নাহকে জানিয়েছিলেন যে তিনি মুসলিম কনফারেন্স আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী, কাশ্মীর আন্দোলনে যাঁর অবদানও ছিল। এই কথা শুনেই জিন্নাহ বিনা ফি-তেই মামলাটি গ্রহণ করেন।
এই দুই বিবরণের সাংঘর্ষিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গবেষক এম জে আসলাম — একদিকে বলা হচ্ছে জিন্নাহ এক শুনানিতেই মামলা জিতে নিয়েছিলেন, অন্যদিকে বলা হচ্ছে তিনি প্রতি হাজিরার জন্য চড়া ফি দাবি করেছিলেন — এই দুই বিবরণ একসাথে খাপ খায় না। জিন্নাহর পেশাগত সততা নিয়ে ইতিহাসে আরও যেসব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় — যেমন হেক্টর বলিথোর জীবনীতে বর্ণিত ঘটনাগুলো, যেখানে জিন্নাহ দরিদ্র মক্কেলের কাছ থেকে ফি ফেরত দিয়েছিলেন — সেসবও এই বিতর্কে সরফের বিবরণের দিকেই কিছুটা ঝুঁকে থাকার ইঙ্গিত দেয়।
তবে যাই হোক না কেন, একটি বিষয়ে দুই বিবরণই একমত — সেদিন শ্রীনগরের আদালতকক্ষে যা ঘটেছিল, তা ছিল আইনি ইতিহাসের এক স্মরণীয় মুহূর্ত। এক ছুটিযাপনরত ব্যারিস্টারের ধারালো যুক্তিবুদ্ধি, কোনো বই ছাড়া, কোনো পূর্বনজির ছাড়া — শুধু স্মৃতি আর যুক্তির জোরে, মুহূর্তেই একটি "আশাহীন" মামলাকে বদলে দিয়েছিল জয়ে।
সূত্র: শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ, আতিশ-ই-চিনার (Blazing Chinar, Gulshan Books, ২০১৬), অধ্যায় ৩০;
মুহাম্মদ ইউসুফ সরফ, Kashmiris Fight for Freedom (২০০৯), খণ্ড ১; M J Aslam, Countercurrents, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯
কলমেঃ
মহি উদ্দিন মাহমুদ ( Mohi Uddin Mahmud)
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইতিহাসের নানা জানা-অজানা তথ্যাদি জানতে ও জানাতে যুক্ত হোন আমাদের পেজ Universal Legal Solution এ