19/07/2026
⚖️ নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে ‘নারী ডোম’ নিয়োগের দাবিতে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রুল ✅✅
নারী মরদেহের ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) সময় গোপনীয়তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখতে প্রতিটি মর্গে নারী ডোম নিয়োগের দাবিতে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রুল জারি করেছে।
───────────────────────────────
১️➡️ আজকের রুল জারি ও মূল প্রেক্ষাপট‼️
🔹 রুল জারি করেছেন
বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসান-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই রুল জারি করেন।
🔹 আদালতের নির্দেশনা
দেশের ময়নাতদন্ত সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল বা মর্গগুলোতে নারী মরদেহের সুরক্ষায় কেন "নারী ডোম" নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হবে না - তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (DGHS)-সহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী ২–৪ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
🔹 রিট আবেদনকারী
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন জনস্বার্থে এই রিটটি দায়ের করেন।
🔹 উদ্বেগের কারণ
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সময়ে মর্গে পুরুষ ডোম বা কর্মীদের দ্বারা নারী মরদেহের গোপনীয়তা নষ্ট এবং বিকৃত লালসার শিকার হওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে।
মৃত্যুর পরও একজন মানুষের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা মানবাধিকারের অংশ। তাই প্রতিটি মর্গে অন্তত একজন নারী ডোম থাকলে নারী মরদেহের সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত হবে।
২️ ➡️ ফৌজদারি কার্যবিধিতে ময়নাতদন্তের বিধান (আইনি ভিত্তি)📍
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (Code of Criminal Procedure, 1898)-এ অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত ও ময়নাতদন্তের সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
🔹 সংশ্লিষ্ট আইন
ধারা ১৭৪ : পুলিশ কর্তৃক অনুসন্ধান ও সুরতহাল প্রতিবেদন
ধারা ১৭৬ : ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অনুসন্ধান
পিআরবি (PRB) ধারা ২৯৯ : তদন্ত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
📌 ধারা ১৭৪ (সুরতহাল প্রতিবেদন)
কোনো ব্যক্তি-
আত্মহত্যা করলে,
দুর্ঘটনায় মারা গেলে,
অপরাধমূলক কারণে মারা গেলে,
অথবা সন্দেহজনকভাবে মৃত্যুবরণ করলে,
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বা দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
তিনি আঘাতের চিহ্ন ও মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করে একটি সুরতহাল প্রতিবেদন (Inquest Report) প্রস্তুত করেন।
📌 ধারা ১৭৬ (ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অনুসন্ধান)
যদি--
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ঘটে,
অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে তদন্ত প্রয়োজন হয়,
তাহলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজে তদন্ত পরিচালনা করতে পারেন।
প্রয়োজনে কবর থেকে মৃতদেহ উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও এই ধারায় রয়েছে।
৩️ ➡ ময়নাতদন্ত কীভাবে সম্পন্ন হয়?📍
আইন ও ফরেনসিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ময়নাতদন্ত নির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়।
🔹 (১) মেডিকেল অফিসারের কাছে প্রেরণ
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের পর মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে পুলিশ লাশটি সরকারি হাসপাতালের ফরেনসিক চিকিৎসকের কাছে পাঠায়।
🔹 (২) ডোম ও ফরেনসিক চিকিৎসকের ভূমিকা
মর্গে একজন বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ডোম বা মর্গ সহকারীরা কাজ করেন।
চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ডোম লাশ কাটা-ছেঁড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবচ্ছেদে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেন।
🔹 (৩) পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ
চিকিৎসক—
বাহ্যিক আঘাত পরীক্ষা করেন,
অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করেন,
প্রয়োজনে ভিসেরা (Viscera) সংগ্রহ করে রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠান।
🔹 (৪) চূড়ান্ত প্রতিবেদন
সব পরীক্ষা শেষে ফরেনসিক চিকিৎসক মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে Autopsy Report প্রস্তুত করেন।
এই প্রতিবেদন আদালতে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৪️ ➡️ বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কে কার ময়নাতদন্ত করবে?📍
🔹 চিকিৎসকের ক্ষেত্রে
আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত সরকারি ফরেনসিক চিকিৎসক নারী বা পুরুষ—উভয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে পারেন।
তবে নারী মরদেহের ক্ষেত্রে নারী চিকিৎসকের উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
🔹 ডোম বা মর্গ সহকারীদের ক্ষেত্রে
বর্তমানে বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ মরদেহের জন্য আলাদা ডোম নেই।
পুরুষ ডোমরাই দীর্ঘদিন ধরে নারী ও পুরুষ—উভয় মরদেহের ব্যবচ্ছেদে সহায়তা করে আসছেন।
🔹 হাইকোর্টের নতুন রুলের প্রভাব
রুল কার্যকর হলে—
✔ নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগের ব্যবস্থা হবে।
✔ মৃত নারীর ধর্মীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত মর্যাদা অধিকতর সুরক্ষিত হবে।
৫ ➡️ জাতীয় সংসদে আলোচনা ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য 📍
মর্গে মৃত নারীদের সম্ভ্রমহানি এবং বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
তিনি জানান—
১. প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে CCTV স্থাপন ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।
২. অপরাধে জড়িত ডোম বা কর্মচারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
৩. সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নারী ডোম নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে কাজ করছে।
📌 ৬️ ⛔ কেন এই পরিবর্তন জরুরি?
✅ ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ
বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অনুযায়ী মৃত্যুর পরও নারীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
✅ পরিবারের মানসিক সান্ত্বনা
পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন যে নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী কর্মী রয়েছেন, এটি তাদের মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।
✅ মানবাধিকার রক্ষা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
✅✅ ময়নাতদন্ত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া। হাইকোর্টের এই রুল বাস্তবায়িত হলে দেশের হাসপাতাল ও মর্গগুলোতে নারী মরদেহের ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক সংকট দূর হবে বলে আশা করা যায়।
একই সঙ্গে সংসদে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান এবং উচ্চ আদালতের এই রুল দেশের মর্গ ব্যবস্থাপনায় আরও নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
────────────
~ এডমিন।
Juris Echo-Law & Justice