23/08/2025
ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে না জেনে অনেকেই বিভ্রান্তকর তথ্য ছড়াচ্ছে। সেই বিভ্রান্ত দূর করার নিমিত্তে আমার এই ছোট্ট প্রয়াস। বিজ্ঞ সিনিয়রদের আইনগত সমালোচনা পজিটিভলি গ্রহনযোগ্য। কারণ আমারও জানার মধ্যে ভুল থাকতে পারে।
#১।ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল বা ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল কি:-
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৪ ধারার অধীন প্রণীত সর্বশেষ রিভিশনকৃত খতিয়ান সমূহের চূড়ান্ত প্রকাশনার বিরুদ্ধে আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সরকার যে ট্রাইবুনাল গঠন করে তাকে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল বা ভূমি জরিপ ট্রাইবুনাল বলে। এই ট্রাইব্যুনাল সরকার SAT Act এর ১৪৫ ক(১) ধারা অনুযায়ী এক বা একাধিক গঠন করে থাকে।
#২।ল্যান্ড সার্ভার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কে হবেন:-
সরকার SAT Amendment Act,2004 অনুযায়ী যুগ্ন জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারককে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিবেন এবং SAT (Amendment) Act 2023 অনুযায়ী ট্রাইবুনাল কর্তৃক বদলিকৃত মামলা নিষ্পত্তির জন্য এক বা একাধিক সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজকেও ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন।
#৩।ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে কি ধরনের মামলা দায়ের করা যাবে:- ল্যান্ড সার্ভিস ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র SAT Act ১৪৪ ধারার অধীন জরিপকৃত সর্বশেষ খতিয়ানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যাবে। এই ট্রাইব্যুনালে সিএস,আরএস ও SA জরিপের খতিয়ানের শুদ্ধতা চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
#৪।কত দিনের মধ্যে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করতে হবে:- SAT Act ১৪৫ ধারার উপধারা (৬) অনুযায়ী ধারা ১৪৪ এর অধীন প্রকাশিত চূড়ান্ত খতিয়ানের তারিখ অথবা ভূমি জরিপ ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠার তারিখ যাহা পরে ঘটে,হইতে এক বছরের মধ্যে এবং উক্ত মেয়াদের পরবর্তী এক বছরের মধ্যেও উপবিধি(৭) অনুযায়ী করা যাবে যদি ট্রাইবুনাল বাদী কর্তৃক প্রদর্শিত বিলম্বের কারণ বিষয়ে সন্তুষ্ট হন।অর্থাৎ সর্বমোট দুই বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। উক্ত মেয়াদের পর ট্রাইবুনালে কোন মামলা দায়ের করা যাবে না। এখানে উল্লেখ্য যে SAT Act এর ১৪৫চ ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের মামলা দায়েরের উক্ত ২ বছর মেয়াদের মধ্যে রেকর্ড সংশোধনের জন্য দেওয়ানী আদালতে কোন মামলা দায়ের করা যাবে না। তবে উক্ত ২ বছর সময়ের পর কোন পক্ষ চাইলে SR Act এর ৪২ ধারা অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণার দাবিতে দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
#৫।মোকাদ্দামা নিষ্পত্তির সময়সীমা :- SAT Act ১৪৫ক ধারার উপধারা (৭ক) অনুযায়ী মোকাদ্দমা চূড়ান্ত শুনানির জন্য নির্ধারিত দিন হইতে 180 দিনের মধ্যে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মোকাদ্দমাটি নিষ্পত্তি করবেন।তবে এই উপধারাটি নির্দেশনামূলক,বাধ্যতামূলক নয়। কেননা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মোকাদ্দামাটি নিষ্পত্তি না করতে পারলে ফলাফল কি হবে তা উল্লেখ নেই।
#৬।ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা ও পদ্ধতি :-বিচার চলমান অবস্থায় ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল বা ক্ষেত্রমত ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ এর অধীন নিম্ন বর্ণিত ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবেন যথা:-
ক) কোন ব্যক্তির উপস্থিতি তলব ও কার্যকর করা এবং তাহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা ;[ সিপিসির ধারা-৩০,৩১,৩২; আদেশ -৫,১০,১১,১৬]
খ)কোন দলিল অনুসন্ধান ও উপস্থাপনের আদেশ প্রদান [ সিপিসির আদেশ ১১ এর বিধি ১২থেকে ২১]
গ)হলফনামার মাধ্যমে সাক্ষ্যের তলব করা [সিপিসির আদেশ ১৯ ]
ঘ)কোন দপ্তর হইতে কোন সরকারী দলিলপত্র বা তাহার অনুলিপি সংগ্রহ করা [সিপিসির আদেশ ১৬]
ঙ) সাক্ষী বা দলিলাদি পরীক্ষার জন্য কমিশন প্রস্তুত করা [সিপিসির আদেশ ২৬ এর বিধি ১থেকে ৮]
এছাড়াও দেওয়ানী কার্যবিধির অন্যান্য বিধানগুলো প্রয়োগে বাধা নিষেধ থাকলেও নিম্ন বর্ণিত কিছু কিছু বিধান পরিপূরক হওয়ায় প্রয়োগ করা যাবে :-
১)মোকাদ্দামায় পক্ষভূক্ত হওয়ার আদেশ (আদেশ ১)
২)প্রতিনিধি বা উকিল নিয়োগ, পরিবর্তন বা সংযোজন(আদেশ -৩)
৩) প্লিডিংস সংশোধন বা কর্তন (আদেশ ৬ বিধি ১৬-১৭)
৪)মোকাদ্দামা প্রত্যাহার (আদেশ ২৩ বিধি ১)
৫) বাদীর অনুপস্থিতির ধরুন মোকাদ্দমা খারিজ।(আদেশ ৯ বিধি ৮)
৬)ছানি মোকদ্দমা (আদেশ ৯ বিধি ৪,৯)
#এছাড়াও বিচার শেষে ট্রাইব্যুনাল ১৪৫ ক ধারার উপধারা (৮) অনুযায়ী নিম্নে বর্ণিত আদেশ প্রদান করিবেন :-
ক)বিতর্কিত খতিয়ান কে অশুদ্ধ ঘোষণা করিতে পারিবে এবং
খ)ইহার সিদ্ধান্ত মোতাবেক খতিয়ান সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয়কে নির্দেশনা প্রদান করিতে পারিবে এবং
গ)প্রয়োজনীয় অন্যান্য আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।
#৭।যে সকল ক্ষমতা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে নেই :-
১) SR Act ৪২ ধারার অধীন সম্পত্তিতে কারো স্বত্ব ঘোষণা করতে পারবেনা (৫৫ ডিএলআর (এডি) পৃষ্ঠা নম্বর ১২৫)
২)সরজমিনে তদন্তের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই (২১ বিএলসি (২০১৬) পৃষ্ঠা নম্বর ১৫৮)
৩)আরজি প্রত্যাখ্যানের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই (৭৪ ডিএলআর (২০২২) পৃষ্ঠা নম্বর ৩২)
৪)অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই (৪১ ডিএলআর পৃষ্ঠা নম্বর ৪৪,৭ এমএলআর পৃষ্ঠা নম্বর ১৯৭)
৫) নিজের আদেশ রিভিউ করার ক্ষমতা নেই। (১৫ বিএলডি পৃষ্ঠা নম্বর ৩২৯)
#৮। ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রায়,ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির প্রতিকার কি:- SAT Act এর ১৪৫খ ধারার উপধারা (৫) অনুযায়ী ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের কোন রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তিন মাসের মধ্যে ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করিতে পারিবেন।
তবে উপধারা (৬) অনুযায়ী উপরে উল্লেখিত তিন মাস উত্তীর্ণ হইবার পরেও পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আপিল গৃহীত হইতে পারে যদি ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনাল আপিল কারী কর্তৃক প্রদর্শিত বিলম্বের কারণ বিষয়ে সন্তুষ্ট হন।
#৯। ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনাল :- সরকার SAT Act এর ১৪৫ খ ধারা ২০২৩ সালে সংশোধন করে জেলা জজের মধ্যে হইতে ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ করবেন এবং ১৪৫(৩গ) অনুযায়ী সরকার ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের বিচারক কর্তৃক বদলিকৃত আপিল শুনানির জন্য এক বা একাধিক অতিরিক্ত জেলা জজকে ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ করতে পারবেন। উল্লেখ যে ২০২৩ সালের আগে ল্যান্ডে সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি।
#১০:- ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা :- ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রায়, ডিক্রি বা আদেশ হইতে উদ্ভূত আপিল ব্যতীত, অন্য কোন আপিল ভূমি জরিপ আপিল ট্রাইব্যুনালে চলিবে না।
#১১।ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত এবং আদেশের চূড়ান্ততা :- SAT Act এর ১৪৫ঙ ধারা অনুযায়ী ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে সিদ্ধান্ত ও আদেশ সাপেক্ষে, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত ও আদেশ চূড়ান্ত হইবে।
যেহেতু ল্যান্ড সার্ভে আপীল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত এবং আর কোন ফোরাম নেই সেহেতু এরপরও কেউ যদি সংক্ষুব্ধ হয় তাহলে উক্ত ব্যক্তি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট দায়ের করতে পারবেন।
#বিশেষ নোট :- যদি ট্রাইবুনাল দ্বারা একটি মোকাদ্দমা খারিজ করা হয় তবে বাদী উপাধি বা সত্ব ঘোষণা এবং বিতর্কিত সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধারের জন্য উপযুক্ত দেওয়ানী মামলা সহ উপযুক্ত দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে। (৭৪ ডিএলআর (২০২২) পৃষ্ঠা নম্বর ৩২)
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাসুদ চৌধুরী