03/04/2026
সাবধান! চেকে হাতের লেখার অসংগতি থাকলে মামলা টিকবে না! হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
আপনি কি কখনো চেক দিয়েছেন আর পরে শুনেছেন যে অংক বদলে গেছে? বা কেউ আপনার স্বাক্ষরযুক্ত চেক নিয়ে নিজের মতো করে পূরণ করে মামলা করে বসেছে? বা চেকের টাকার অংকে ঘষামাজা বা কাটাকাটি করে পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়েছে? নো টেনশন। মহামান্য হাইকোর্টের এবার যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট বলে দিয়েছে এমন চেক আদালতের চোখে বৈধ চেক নয়!
এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য, ৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭ এ হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি ড্রয়ার (যিনি চেক লিখেছেন) নিজে সম্পূর্ণভাবে পূরণ না করে, অন্য কেউ পরে অংক, তারিখ, প্রাপকের নাম ইত্যাদি লিখে দেয় আর হ্যান্ডরাইটিং-এ অসঙ্গতি থাকে আর যদি ফরেনসিক রিপোর্টে স্বাক্ষরে অমিল, ঘষামাজা, কাটাকাটি, টাকা অংকে পরিবর্তন হয়, তবে মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যাবে।
এন.আই এ্যাক্টের ৮৭ ধারার বিধান অনুযায়ী, যদি কোনো চেকের লেখায় বা অংকে এমন কোনো পরিবর্তন করা হয় যা চেকের মূল চরিত্র বা বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন করে দেয় (যেমন: টাকার পরিমাণ বাড়ানো), তবে সেই চেকটি বাতিল বলে গণ্য হবে।
তবে বাদীকে (যিনি মামলা করেছেন) অবশ্যই এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা দিতে হবে। ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে মামলা টিকবে না! আসামী খালাস পাবেন। আদালত বলেছে, বাদীকে (পাওনাদার) আদালতে আসতে হবে এবং জবাব দিতে হবে যে. কেন চেকটি ড্রয়ার নিজে পূরণ করেননি? অন্য কে পূরণ করেছেন? অন্যের পূরণের ক্ষেত্রে ড্রয়ারের অনুমতি ছিল কি-না? হস্তাক্ষরের এই ভিন্নতা কীভাবে যৌক্তিক? যদি বাদী এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব না দিতে পারেন, তাহলে মামলার ভিত্তিই অদৃশ্য হয়ে যায়।
অনেক সময় পাওনাদার বা অন্য পক্ষ ব্ল্যাঙ্ক চেকে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় এবং পরে নিজের ইচ্ছামতো বড় অংক বসিয়ে মামলা দেয়। এই রায় এমন হয়রানি বন্ধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
যদি প্রাপক (যিনি টাকা পাবেন) চেক দাতার অনুমতি ছাড়া নিজের সুবিধার্থে চেকে কাটাকাটি করেন, তবে সেই চেকে মামলা করার আইনগত ভিত্তি থাকে না। ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত ধরে নেন যে চেকটি দায় পরিশোধের জন্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফরেনসিক রিপোর্টে জালিয়াতি ধরা পড়লে সেই ধারণাটি খন্ডিত হয়। বিবাদী পক্ষ চাইলে বাদীর বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় (জালিয়াতি ও জাল দলিল ব্যবহার) পাল্টা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। এ ধরণের ঘটনায় উচ্চ আদালত বলেছেন, যদি কোনো চেকের গায়ে কোনো ‘‘বস্তুগত পরিবর্তন" করা হয় এবং তা যদি চেক দাতার স্বাক্ষর বা সম্মতি ছাড়া হয়, তবে সেই চেকটি অকার্যকর হয়ে যায়। এ ধরনের চেক ব্যবহার করে এন.আই অ্যাক্টের অধীনে মামলা পরিচালনা করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। ৮৭ ধারার বিধান অনুযায়ী এটি একটি অযোগ্য দলিল।
সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দালিলিক প্রমাণ। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট শুধু একটি প্রমাণ। আদালত সামগ্রিক প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ফ্যাক্টস দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। যেমন পরিবর্তন কে করেছে, কখন করেছে, চেক দাতার সম্মতি ছিল কি না এগুলো ট্রায়ালে প্রমাণিত হতে হয়।
সংগৃহীত