23/07/2023
সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশগণের সাকসেশন সার্টিফিকেট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জ্ঞাতব্য বিষয় সমূহঃ-
================================
উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা সবাই কিছু না কিছু প্রপার্টি পেয়ে থাকি। কিন্তু, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এসব প্রপার্টির মালিকানা আইনীভাবে বুঝে পেতে, সবার আগে প্রয়োজন সাকসেশন সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকার সনদ। কেননা যে ব্যক্তি মারা গেলেন, তার বৈধ উত্তরাধিকার যে আপনি সাকসেশন সার্টিফিকেট তারই প্রমাণপত্র। শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রপার্টির আইনী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই নয়, সঠিকভাবে প্রপার্টি বণ্টনের জন্যও এই ডকুমেন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। সাকসেশন সার্টিফিকেট আসলে কী? কেন এটি জরুরি? কীভাবে এটি বুঝে পাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে পড়তে থাকুন আজকের আর্টিকেল।
✔ সাকসেশন সার্টিফিকেট কী
সাকসেশন সার্টিফিকেট হচ্ছে মৃত ব্যক্তির স্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংকে জমানো টাকা, কোম্পানীর শেয়ার, ডিবেঞ্চার, রয়্যালটি সর্বোপরি মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকার প্রমাণ করার প্রমাণপত্র। সাধারণত নিজেকে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তারাধিকার প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজন হয় এই ডকুমেন্টের। সাকসেশন অ্যাক্ট ১৯২৫ এর ধারা ৩৭০-৩৮৯ এ সাকসেশন সার্টিফিকেট এর ব্যপারে বলা আছে। ধারাঃ ৩৭২(৩) এ বলা হয়েছে “মৃত ব্যক্তির পাওনাদারের নিকট দেয় কোন দেনা বা দেনা সমূহ বিষয়ে কিংবা তার কোন অংশ বিষয়ে উক্ত সার্টিফিকেটের জন্য দরখাস্ত করা যাইবে।”
অনেক সময় দেখা যায়, কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে, তাঁর ব্যাংক একাউন্টে টাকা রেখে গিয়েছেন। কিন্তু, কোন প্রকার নমিনী করে যাননি, আবার দেখা যায় কাউকে নমিনী করা হয়ে থাকলেও অন্য ওয়ারিশদের বাধার কারণে ব্যাংক কাউকে টাকা দিচ্ছেন না। সেই কারণে ব্যাংক সাকশেসন সার্টিফিকেট চাইতে পারেন। সেক্ষেত্রে সাকশেসন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন দেখা দেয়।
আবার হয়ত এমনও হতে পারে যে, মৃত ব্যক্তি ব্যাংকের কাছে ঋণ রেখে গেছেন এই ঋণ কোন ওয়ারিশ কত শতাংশ পরিশোধ করবেন এজন্য সাকশেসন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
আবার হয়ত দেখা যায়, কোন কোম্পানীতে মৃত ব্যক্তির নামে শেয়ার আছে, সেক্ষেত্রে কোন ওয়ারিশ কতটুকু শেয়ারের মালিক হবেন সে মর্মে সাকশেসন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
➤১৯২৫ সালের এই আইনে সাকসেশন সার্টিফিকেট গ্রহনের করার জন্য আবেদনের কোন সময়সীমা নির্দিষ্ট করা নেই। অর্থাৎ সাকসেশান সার্টিফিকেট মোকদ্দমা দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির কোন বিষয় নেই।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমা দায়ের করতে হয় কোন আইনের কোন ধারা অনুযায়ী ?
সাকসেশন সার্টিফিকেট মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে সাকশেসন অ্যাক্ট, ১৯২৫ এর ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী এবং এই আইনের ৩৭২ ধারা অনুযায়ী দি কোড অব সিভিল প্রসিডিওর, ১৯০৮ এর বিধান অনুযায়ী আরজি আকারে দাখিল করতে হবে।
✔যিনি আবেদন করতে পারবেন
মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীরা প্রত্যেকে কিংবা তাদের পক্ষে যিনি প্রপার্টি বুঝে নেবেন, তিনি আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমা কোন আদালতে দায়ের করতে হয়?
এই আইনে জেলা জজকে এখতিয়ার দেওয়া হয়ে থাকলেও জেলা জজ সাধারণত এ ক্ষমতা অন্য কোন আদালতকে প্রদান করে থাকেন। যেমন জেলা জজ অতিরিক্ত জেলা জজ বা যুগ্ম জেলা জজ (ডেলিগেটেড জজ) এর আদালতে বদলী করতে পারেন।
✔এখন আসি সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমায় পক্ষ (প্রার্থীক/প্রতিপক্ষ) কে হবেন?
এই মোকদ্দমার সকল ওয়ারিশ মিলে একত্রে করতে পারেন আবার কোন ওয়ারিশ যদি একত্রে দরখাস্ত না করেন তাহলে যারা একত্রে দরখাস্ত করতে ইচ্ছুক নন তাদের প্রতিপক্ষ করতে হয়।
✪✪সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমার আরজিতে কি কি বিষয় উল্লেখ করতে হয়?
সাকশেসন অ্যাক্ট, ১৯২৫ এর ৩৭২(১) ধারার বিধান অনুযায়ী, দি কোড অব সিভিল প্রসিডিওর, ১৯০৮ এ বর্ণিত পদ্ধতিতে দরখাস্তকারীর দ্বারা বা পক্ষে স্বাক্ষরিত এবং প্রত্যায়িত আরজির মাধ্যমে উক্ত সার্টিফিকেটের দরখাস্ত দাখিল করতে হবে। দরখাস্তের জন্য বাদীর দ্বারা বা পক্ষে আরজি স্বাক্ষরিত এবং প্রত্যায়িত হবে এবং নিম্ন লিখিত বিবরণ অবশ্যই উল্লেখ থাকবে, যথা:
(ক) মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়,
(খ) মৃত্যুর সময়ে মৃত ব্যক্তির সাধারণ বাসস্থান এবং উক্ত বাসস্থান যে, আদালতের নিকট দরখাস্ত করা হয় ঐ আদালতে স্থানীয় এখতিয়ারে(লোকাল জুরিসডিকশান) না থাকলে উক্ত সীমার মধ্যে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি,
(গ) মৃত ব্যক্তির পরিবার বা অন্যান্য নিকট আত্মীয় এবং তাদের নিজ নিজ বাসস্থান সমূহ,
(ঘ) আরজি দাখিলকারী যে অধিকার দাবী করেন,
(ঙ) সার্টিফিকেট মঞ্জুর করা হলে, বৈধতার ক্ষেত্রে ৩৭০ ধারা বা এই আইনের কোন বিধানাবলী বা অন্য কোন আইনে কোন প্রতিবন্ধকতার অনুপস্থিতি, এবং
(চ) দরখাস্তকৃত সার্টিফিকেট বিষয়ে দেনা এবং সিকিউরিটিজ।
আবেদনের সঙ্গে একটি হলফনামা দিতে হবে, যাতে উল্লেখ থাকবে—
১। তিনি মৃত ব্যক্তির সম্পর্কে কী হন
২। মৃত ব্যক্তির এ টাকা কাউকে দান বা উইল করে যাননি
৩। উইলের জন্য কোনো প্রবেট বা লেটার অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দরখাস্ত দাখিল করে যাননি
৪। তাঁকে অন্য উত্তরাধিকারীরা টাকা তোলার ক্ষমতা দান করেছেন।
৫। মৃত ব্যক্তির টাকার হিসাবের বিবরণও তফসিল আকারে দিতে হবে।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমা দায়েরের সময় নিম্নোক্ত প্রয়োজনীয় দলিল সমূহ ফিরিস্তি আকারে দাখিল করতে হবে।
১। মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদপত্র (Death Certificate)।
২। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কমিশনার প্রদত্ত পরিচয়পত্র/নাগরিকত্বের সনদ।
৩। শেয়ার সার্টিফিকেট/ রয়্যালিটি প্রমাণপত্র/ ব্যাংক ব্যালেন্স বা জমার স্লিপ ইত্যাদি।
✔আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ সমূহঃ-
আদালতে আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ে আদালত আবেদনকারীর জবানবন্দি নেবেন এবং সকল তথ্যের সত্যতা যাচাই করবেন। এসময়, আদালত মৃত ব্যক্তির নিকট আত্বীয়দের নোটিশ প্রদান করে কারো কোন দাবি/আপত্তি আছে কিনা তা জেনে নিয়ে থাকেন।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমায় বিবাদী কর্তৃক আপত্তি দাখিলের সময়সীমাঃ-
আদালত মৃত ব্যক্তির নিকট আত্মীয়দের নোটিশ প্রদান করে কারো কোন দাবি/আপত্তি আছে কিনা তা জেনে নিয়ে থাকেন। কারো কোন আপত্তি থাকলে এই সময় আপত্তি দাখিল করা যায়। কারো কোন আপত্তি থাকলে দেড় মাস সময়ের মধ্যে আপত্তি দাখিল করা যায়।
কারো কোন আপত্তি না থাকলে অথবা আপত্তি থাকলে তা শুনানির পর আদলত আবেদনকারীর অনকুলে সাকসেশন সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকে। সাধারণত সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে তিন-চার মাস সময় লাগে।
✔সার্টিফিকেট প্রাপ্তির সময় সীমাঃ-
সাধারণত সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে তিন-চার মাস সময় লাগে।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমার কোর্ট ফি কোন আইনের বিধান মোতাবেক নির্ধারিত হয় এবং কত টাকার কোর্ট ফি দিতে হয়?
আদালতে সাকসেশন মামলা দায়ের করার পর আদালত উত্তারাধিকার সনদের আবেদন মঞ্জুর করলে কোর্ট ফি দাখিল করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আবেদনকারী ব্যাংক থেকে কত টাকা ওঠানোর জন্য আবেদন করছেন, তার ভিত্তিতে কোর্ট ফি নির্ধারিত হয়। দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে কোনো কোর্ট ফি দিতে হয় না। কিন্তু ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত এক শতাংশ কোর্ট ফি দিতে হয়। আবার এক লাখ এক টাকা থেকে যে কোনো পরিমাণ অর্থের ওপর দুই শতাংশ কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। কোর্ট ফি জমা দেওয়া হলে নির্ধারিত সময়ে আদালত থেকে সনদ ইস্যু করা হয়।
✔কোর্ট ফি প্রদানের ক্ষেত্রে কোর্ট ফিস অ্যাক্ট, ১৮৭০ এর জ্ঞাতব্য বিষয় সমূহঃ-
কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে কোর্ট ফিস আইন, ১৮৭০ এর ১ম তফসিলের ১১ দফা মোতাবেক নিম্নলিখিত হারে -
১) মোকদ্দমার মূল্য মান ২০ হাজার টাকার অধিক হয় কিন্তু এক লক্ষ টাকার অধিক নয় সেক্ষেত্রে ১% হারে কোর্ট ফি দিতে হবে। তবে ১-২০,০০০ টাকার মধ্যে কোন কোর্ট ফিস দিতে হবে না।
২) মোকদ্দমার মূল্যমান ১ লক্ষ টাকার অধিক হয় সেক্ষেত্রে হতে ২% হারে কোর্ট ফি দিতে হয়।
৩) +১৫% ভ্যাট।
সাকসেশন অ্যাক্ট, ১৯২৫ এর ৩৭২ ধারা এবং কোর্ট ফিস অ্যাক্ট, ১৮৭০ এর ১ম তফসিলের টেবল এ এর ১১ দফা একত্রে করলে বুঝা যায় ১% অথবা ২% কোর্ট ফিস+এর উপর ১৫% ভ্যাট যা সর্বোচ্চ ৪৬,০০০টাকা।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমার রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের বিধানঃ-
সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দামার রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ কর্তৃক সাকসেশন অ্যাক্ট , ১৯২৫ এর ৩৮৪ ধারা মোতাবেক শুধুমাত্র হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করা যায়।
✔সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমা প্রত্যাহারের বিধানঃ-
সাকসেশন সার্টিফিকেট এর মোকদ্দমার আর্জি সাকশেসন অ্যাক্ট, ১৯২৫ এর ৩৮৩ ধারা অনুযায়ী প্রত্যাহার করা যায়।
Jamal Naser Mustakim
LL.B( Hon's), LLM (JnU)
Apprentice Lawyer &
Research Associate
Adv Seraj & Associates
District & Sessions Judge Court, Chattogram
Cell: 01835047808 (WhatsApp)