26/09/2026
মামলা ছাড়াই জমির রেকর্ড সংশোধন করবেন কীভাবে?
করণিক ভুলের সহজ উদাহরণসহ বিস্তারিত
জমির খতিয়ানে ভুল দেখলেই অনেকে ভয় পেয়ে যান—
“এটা ঠিক করতে হলে কি আদালতে মামলা করতে হবে?”
সবসময় নয়।
যদি ভুলটি করণিক বা লেখার/হিসাবের ভুল হয় এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে কোনো বিরোধ না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে।
চলুন কয়েকটি সহজ উদাহরণ দেখি।
উদাহরণ–১: নামের বানান ভুল
ধরুন, আপনার নাম “মোঃ আব্দুল করিম”।
আপনার দলিল, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজে নাম সঠিকভাবে আছে। কিন্তু খতিয়ানে ভুল করে লেখা হয়েছে “মোঃ আব্দুল কোরিম”।
এখানে মালিক কে—এ নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। শুধু নামের বানানে ভুল।
এ ধরনের বিষয় করণিক ভুল হিসেবে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
উদাহরণ–২: দাগ নম্বর লেখায় ভুল
ধরুন, আপনার বৈধ কাগজপত্রে জমির দাগ নম্বর ১২৫।
কিন্তু খতিয়ান প্রস্তুতের সময় ভুল করে ১২৬ লেখা হয়েছে।
পূর্বের রেকর্ড, দলিল, নকশা ও অন্যান্য প্রমাণে যদি স্পষ্ট হয় যে প্রকৃত দাগ ১২৫, তাহলে বিষয়টি যাচাই করে করণিক ভুল সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
উদাহরণ–৩: জমির পরিমাণে হিসাবের ভুল
ধরুন, আপনার জমির প্রকৃত পরিমাণ ৫০ শতক।
কিন্তু হিসাবের ভুলে খতিয়ানে ৫.০ শতক লেখা হয়েছে।
অথবা একাধিক দাগের জমির হিসাব যোগ করতে গিয়ে মোট জমির পরিমাণে ভুল হয়েছে।
প্রমাণপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে এটি যদি নিছক হিসাবগত/করণিক ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
উদাহরণ–৪: অংশের হিসাবে ভুল
ধরুন, তিনজনের অংশ ছিল—
রহিম — ৪০ শতক
করিম — ৩০ শতক
জলিল — ৩০ শতক
কিন্তু খতিয়ানে হিসাবের ভুলে কারও অংশ বেশি বা কম লেখা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দলিল/রেকর্ড থেকে সঠিক হিসাব পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত।
এ ধরনের হিসাবগত ভুল হলে সংশোধনের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
উদাহরণ–৫: খতিয়ান ও দাগসূচির মধ্যে ভুল
ধরুন, মূল খতিয়ানে একটি দাগের তথ্য সঠিকভাবে আছে, কিন্তু দাগসূচিতে লেখার সময় ভুল হয়েছে।
অর্থাৎ মূল তথ্যের সঙ্গে দাগসূচির তথ্যের অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে।
এটি যদি শুধুই রেকর্ড প্রস্তুতের সময়ের লেখার ভুল হয়, তাহলে করণিক ভুল সংশোধনের বিষয় হতে পারে।
তাহলে কখন মামলা লাগতে পারে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ধরুন, খতিয়ানে আপনার নাম নেই। অন্য একজনের নাম আছে।
আপনি বলছেন—
“এই জমি আমার, কারণ আমার ১৯৮০ সালের রেজিস্ট্রি দলিল আছে।”
অন্য ব্যক্তি বলছেন—
“না, জমি আমার। আপনার দলিল বৈধ নয়।”
এখন এটি শুধু বানান বা লেখার ভুল নয়।
এখানে মালিকানা, স্বত্ব বা দলিলের বৈধতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তাই এমন বিরোধকে শুধু “করণিক ভুল” বলে ভূমি অফিসে আবেদন করলেই সমাধান হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সহজভাবে মনে রাখুন:
নাম ভুল → করণিক ভুল হতে পারে।
দাগ নম্বর ভুল → করণিক ভুল হতে পারে।
হিসাব ভুল → করণিক ভুল হতে পারে।
অংশের হিসাব ভুল → করণিক ভুল হতে পারে।
কিন্তু—
“জমির প্রকৃত মালিক কে?”—এ নিয়ে বিরোধ হলে বিষয়টি আর সাধারণ করণিক ভুলের মধ্যে নাও থাকতে পারে।
আবেদন করার আগে যা রাখবেন
১. সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি
২. দলিলের কপি
৩. পূর্বের খতিয়ান/রেকর্ড
৪. মৌজা ম্যাপ বা প্রয়োজনীয় নকশা
৫. নামজারি সংক্রান্ত কাগজপত্র, যদি থাকে
৬. খাজনার দাখিলা, প্রয়োজন অনুযায়ী
৭. যে কাগজে সঠিক তথ্য রয়েছে তার প্রমাণ
এরপর ভুলটি কোথায় এবং কীভাবে হয়েছে—সেটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—
রেকর্ডে ভুল দেখলেই মামলা নয়। আবার সব ভুলকেও করণিক ভুল ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
আগে বুঝুন,
ভুলটা কি শুধু লেখার/হিসাবের ভুল, নাকি মালিকানা নিয়ে প্রকৃত বিরোধ?
এই পার্থক্যটা বুঝতে পারলে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ও খরচ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতে পারে।