21/04/2026
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ভার্চুয়াল শুনানি: আধুনিকতার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সপ্তাহে দুইদিন ভার্চুয়াল শুনানি চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বিচারিক কার্যক্রমকে আধুনিকায়নের এই পদক্ষেপ কেবল সময়োপযোগীই নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিচারব্যবস্থাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে বহুদিন ধরেই অনলাইনভিত্তিক বিচারিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যে “HM Courts & Tribunals Service” ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মামলা দায়ের, শুনানি এবং রায় প্রদান প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল কোর্টগুলোতে “PACER” ও “CM/ECF” সিস্টেমের মাধ্যমে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা অনলাইনে মামলা দায়ের, নথি জমা এবং কেস ট্র্যাক করতে পারেন। সিঙ্গাপুরের “e-Litigation” সিস্টেম সম্পূর্ণ ডিজিটাল কোর্ট ম্যানেজমেন্টের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে প্রায় সব বিচারিক কার্যক্রমই অনলাইনে সম্পন্ন হয়। এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন হাইকোর্টও কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকে ভার্চুয়াল শুনানিকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, অনলাইন বিচারিক ব্যবস্থা কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং আধুনিক বিচারব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে ভার্চুয়াল শুনানি চালুর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের আদালতে শারীরিকভাবে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে। এতে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি এক বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। একজন ব্যক্তি দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে, এমনকি বিদেশ থেকেও, তার মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন—যা বিচারপ্রাপ্তির সুযোগকে আরও বিস্তৃত করবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দুর্নীতি প্রতিরোধ। বিচারিক কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হলে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়। ফলে ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের সম্ভাবনাও হ্রাস পায়। নথিপত্র দাখিল, শুনানি এবং আদেশ সংগ্রহ—সবকিছু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হলে স্বচ্ছতা বাড়ে এবং প্রতিটি ধাপ সহজে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা অগ্রাহ্য করা যাবে না। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন, ইন্টারনেটের স্থিতিশীলতা, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, ডিজিটাল বিভাজনের কারণে গ্রামীণ বা প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ জনগোষ্ঠী যাতে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ নজর দিতে হবে।
সর্বোপরি বলা যায়, হাইকোর্ট বিভাগে সপ্তাহে দুইদিন ভার্চুয়াল শুনানি চালুর উদ্যোগটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে আধুনিক, দ্রুত ও স্বচ্ছ করার পথে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে ধারাবাহিকভাবে উন্নত করা এবং এমন একটি বিচারিক কাঠামো গড়ে তোলা, যা প্রযুক্তির সহায়তায় সবার জন্য সহজলভ্য, দক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম।