16/09/2024
জাতীয় সঙ্গীত বিতর্ক এবং রবীন্দ্রনাথ প্রেম।
সম্প্রতি বাংলাদেশে জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন নিয়ে এক তীব্র বিতর্কের সূচনা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আজমি, যিনি আট বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছেন, একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে "আমার সোনার বাংলা" গানটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত এই গানটি মূলত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় দুই বাংলার একত্রিকরণের জন্য রচিত হয়েছিল এবং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের পরিপন্থী। তার মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই সঙ্গীতটি বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত প্রতিফলন করে না এবং একটি নতুন জাতীয় সঙ্গীত প্রণয়ন করা উচিত যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হবে ।
আজমির এই মন্তব্য জাতীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই তার বক্তব্যকে দেশের জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন। বিশেষত, "আমার সোনার বাংলা" শুধু একটি গান নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেই সমাদৃত। বিরোধীরা মনে করেন, এটি জাতীয়তার মূল ভিত্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে সম্মান করার একটি প্রতীক।
তবে এই বিতর্কের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার এবং এটি গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি। আজমি তার পারিবারিক পটভূমির জন্য সমালোচিত হলেও, তার নিজস্ব মত প্রকাশ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া উচিত নয়। তার পিতা গোলাম আজমের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার জন্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ করা যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ অপরাধের দায় কখনোই পারিবারিকভাবে স্থানান্তরিত হয় না। জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের মতামতকে পিতার অপরাধের সঙ্গে সংযুক্ত করা একটি অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ।
জাতীয় সঙ্গীত কি?
জাতীয় সঙ্গীত একটি দেশের প্রতীকী সঙ্গীত, যা দেশের জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং স্বাধীনতার চেতনা প্রকাশ করে। এটি সাধারণত দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ঐক্যকে দৃঢ় করে এবং জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে গাওয়া হয়। জাতীয় সংগীত দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলে এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কয়েকটি মূল উপাদান থাকতে হয়, যা একটি দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, এবং স্বাধীনতার চেতনা প্রতিফলিত করে। যেমন, ফ্রান্সের "লা মার্সেইয়েস" ফরাসি বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে, দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীত জাতিগত বৈচিত্র্য এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গেলড ব্যানার" স্বাধীনতা সংগ্রামের এক দৃঢ় প্রতিচ্ছবি। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে, একটি জাতীয় সঙ্গীত শুধু গান নয়, এটি জাতীয় চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে। জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে একটি গানকে গ্রহণ করার জন্য গানটিকে অবশ্যই সেই দেশকে উদ্দেশ্য করে রচিত হতে হবে এবং শুধুমাত্র সেই দেশ ও তার ভূখণ্ডকে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।
‘আমার সোনার বাংলা’ সঙ্গীতটি কি বাংলাদেশকে প্রনিধিত্ব করে?
অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৯০৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে বাংলা প্রদেশকে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় বিভক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তটি মূলত প্রশাসনিক হলেও এর পেছনে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। পূর্ব বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এবং তারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিল, বিশেষত পশ্চিম বাংলার হিন্দু জমিদার ও প্রভাবশালী ঠাকুরদের তুলনায়। পশ্চিম বাংলার জমিদার ও উচ্চবর্গের হিন্দু সমাজ পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগণকে তাদের অধীনস্থ ও নীচু জাতি বলে মনে করত। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার পূর্ব বাংলার মুসলমানদের উন্নতির লক্ষ্যে প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পশ্চিম বাংলার হিন্দু জমিদাররা এই বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
এই প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর "আমার সোনার বাংলা" গানটি রচনা করেন, যেখানে তিনি বাংলার ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। এই গানের পেছনে থাকা প্রেরণাটি ছিল পশ্চিম বাংলার হিন্দু জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করা, যারা পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। এটি তখনকার প্রেক্ষাপটে বাংলার জনগণের, বিশেষত পূর্ব বাংলার মুসলমানদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। মূলত, এটি পশ্চিম বাংলার হিন্দু জমিদারদের প্রভাব ও প্রভুত্ব রক্ষা করার প্রয়াসের প্রতিফলন ছিল। মাত্র ৬ বছর পর, ১৯১১ সালে, বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয় এবং দুই বাংলাকে আবার একত্রিত করা হয়। তাই বলা যায়, "আমার সোনার বাংলা" গানের রচনার প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর আধিপত্য কায়েম রাখার একটি প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে।
রবীন্দ্রনাথের এই গান সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই বাংলার ঐক্য এবং পশ্চিম বাংলার জমিদারদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছিল, যা অনেকের মতে পূর্ব বাংলার জনগণের বাস্তব চাহিদা ও উন্নয়নের বিরুদ্ধে ছিল। তাই সন্দেহাতীতভাবে বলা চলে যে, "আমার সোনার বাংলা" গানটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধচেতনা বা বৈষম্যপূর্ণ ইতিহাসকে প্রতিনিধিত্ব করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই গানটি কি সত্যিই বাংলাদেশের সার্বিক জাতীয় চেতনা এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করে? একটি জাতীয় সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য হলো সেই দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং জাতিগত সমতার প্রতীক হওয়া। যদি কোনও সঙ্গীত বৈষম্যমূলক ইতিহাসের প্রতিফলন হয়, তবে সেটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতীয় সঙ্গীতের পুনর্মূল্যায়ন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি সম্মান ও পরিবর্তনের প্রয়োজন
এই বিতর্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি সম্মান রেখে জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা। ঠাকুরের সাহিত্যকীর্তি এবং তাঁর অবদান শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও বিশাল। তিনি ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী এবং তাঁর কাব্য ও সঙ্গীতের গভীরতা সর্বজনবিদিত। "আমার সোনার বাংলা" গানটির রচয়িতা হিসেবে তাঁর প্রতি জাতীয়ভাবে গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং সেই শ্রদ্ধা অক্ষুন্ন থাকবে।
তবে, জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের দাবি বা এই বিষয়ে আলোচনা করা মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি অসম্মান করা নয়। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যার নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং একটি বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ রয়েছে। যদি কোনো গান সেই সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার চেতনাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না করে, তাহলে সেই সঙ্গীত নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানানো এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচয় পুনর্বিবেচনা করা দুটি ভিন্ন বিষয়। জাতীয় সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামকে প্রতিফলিত করা, এবং এটি পরিবর্তন করা মানেই রবীন্দ্রনাথের কীর্তির প্রতি অসম্মান নয়। বরং এটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির পরিচয়কে পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হতে পারে।
উপসংহার
"আমার সোনার বাংলা" গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর যথাযথতা নিয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসামান্য সাহিত্যিক ও সঙ্গীতময় অবদান অনস্বীকার্য, এবং তাঁর প্রতি সর্বদাই গভীর শ্রদ্ধা থাকা উচিত। তবে জাতীয় সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য হলো জাতির স্বাধীনতা, সংগ্রাম এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যদি কোনও জাতীয় সঙ্গীত সেই জনগণের বৈষম্যপূর্ণ ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটায় বা বর্তমান সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতিগত ও রাজনৈতিক চেতনাকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্নে গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করতে হবে।
অতএব, জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন বা পুনর্বিবেচনা করা মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি অসম্মান নয়। বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম, জাতিগত সমতা, এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি পদক্ষেপ হতে পারে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সঙ্গীত, যা শুধুমাত্র ঐতিহাসিক একটি নির্দিষ্ট সময়কে নয়, বরং জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম ও মুক্তির প্রতিনিধিত্ব করবে, এবং যা সকল নাগরিকের পরিচয় ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।
এম এ আরেফিন আশরাফ
ব্যারিস্টার
কোর্টস অফ ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস