28/12/2022
আবাসন শিল্পে বাজারজাতকরণ
Link: https://www.dainikbangla.com.bd/opinion/8289
দেশের জিডিপিতে আবাসন খাতের অবদান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই যুগে জিডিপির প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবদান রেখেছে এই খাত। ইতিমধ্যে সরকার আবাসন শিল্পকে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে দেশে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদা এবং সরবরাহের কথা মাথায় রেখে একটি টেকসই আবাসন খাত গড়ে তোলার জন্য সরকার ও এ শিল্পের উদ্যোক্তারা নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিগত কয়েক বছরে ঢাকাসহ দেশের বেশকিছু জায়গায় প্রচলিত আবাসন ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠছে উন্নত বিশ্বের আদলে অভিজাত গেইটেড কমিউনিটি, স্যাটেলাইট টাউন ও কন্ডোমিনিয়াম প্রজেক্ট। হাতের নাগালের ভেতর আধুনিক জীবনের সব উপকরণ নিয়ে নাগরিক জীবনের স্কয়ার ফুট গল্পের শৃঙ্খল চূর্ণ করার সংকল্প থেকে তৈরি হচ্ছে এ ধরনের প্রকল্প। বর্তমানে আবাসিক ভবনগুলোতে স্মার্ট হোম প্রযুক্তির ব্যবহার চোখে পড়ছে।
আবাসন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ খাতের বাজার হয়ে উঠছে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। সেই সঙ্গে সঠিক পণ্য নিয়ে সঠিক ক্রেতার নিকট পৌঁছানো এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতানুগতিক বাজার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো স্ট্র্যাটেজিক মার্কেটিং বা কৌশলগত মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্য বা সেবার বাজার মান নিয়ে গভীর জ্ঞান না রাখলে এবং পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকলে এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।
অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ বিজ্ঞাপনী সংস্থার ওপর মার্কেটিং কার্যক্রমের সিংহভাগই ছেড়ে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে উৎপাদনকারী এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থা দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং লক্ষ্য সব সময় এক নয়। সুতরাং ওপরের বিষয়কে মাথায় রেখে একটি সৃজনশীল মার্কেটিং টিম গঠন করে নিচের বিষয়গুলোর ওপর দৃষ্টি দিলে আমাদের আবাসন শিল্পের কৌশলগত মার্কেটিং নির্ধারণ সহায়ক হতে পারে।
বাজার গবেষণা
আপনি যে আবাসিক বা বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করবেন বলে ভাবছেন বাজার গবেষণার মাধ্যমে ওই এলাকার মানুষের জীবনমান, বাজারের ব্যাপকতা, ভোক্তার প্রয়োজন বা চাহিদা, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হওয়া, বাজারে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সুযোগ চিহ্নিতকরণ এবং ভোক্তার প্রয়োজন কিংবা চাহিদা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রথেমই জেনে নিতে হবে। তা ছাড়া সব ধরনের আবাসন পণ্যের ক্রেতার চাহিদা এক নয়। তাই পণ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্রেতা শ্রেণীকরণ আগেই করে নিন। এতে করে সঠিক পণ্য নিয়ে সঠিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানো সহজ হবে।
প্যাকেজিং এবং কমিউনিকেশন টুলস
আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের মড়কীকরণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথম দর্শনে যদি ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ না করে তাহলে ক্রেতা পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ পণ্যটি ক্রয়ে আকৃষ্ট হবেন না। পণ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা ফিচার নিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটি প্রকল্প ফেনস নির্মাণ করা যেতে পারে, যা ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের আদলে গ্রিন ফেনস নির্মাণ প্রকল্প সাইটকে একটা ভিন্নমাত্রা দেয় এবং এই সৃজনশীল চিন্তা নির্মাণাধীন ভবনটিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
একটি ইনফরমেটিভ ব্রোশিওর যেখানে পণ্যের পরিচিতি, বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা ফিচার অর্থাৎ ইউনিট সেলিং প্রপোজিশন (ইউএসপি), ডিজাইন ফিলোসফি, পণ্যের আশপাশের বৈশিষ্ট্য বা ফিচারসমূহ উল্লেখ করে তৈরি করতে পারেন। এক্ষেত্রে ব্রোশিওরের কাগজ, প্রিন্ট কোয়ালিটি এবং কন্টেন্টের দিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে।
ক্রেতার সঙ্গে ভালো একটি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে পণ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা ফিচার নিয়ে অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়াল, সংক্ষিপ্ত ডিরেক্ট মেইলার, যথোপযুক্ত মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার, সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য কন্টেন্ট তৈরি এবং পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারেন।
স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং
বর্তমান কৌশলগত বাজারজাতকরণের যুগে মার্কেটিং প্রফেশনালদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত ভোক্তা চিহ্নিতকরণ এবং সেই অনুযায়ী যথোপযুক্ত স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং প্রণয়ন করা। সারা দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক পণ্য বাজারে আসে তার ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পণ্যই সফল হতে পারে না, শুধুমাত্র পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ না করে বাজারে যাত্রা করার জন্য। ভোক্তার ক্রয় মনোভাব এবং প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হয়ে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং প্রণয়ন করা হলে এই সমস্যার সমাধান মিলবে। এ ক্ষত্রে ডেমোগ্রাফিক্স (এজ, জেন্ডার, ইনকাম), জিওগ্রাফিক্স (লোকাল, ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল), বিহেভিয়েরাল (প্যাটার্নস, বেনিফিটস), সোসিও-ইকোনোমিক, ইউজার বেজড বিভাজনকে মাথায় রেখে আইডিয়া জেনারেশন, আইডিয়া স্ক্রিনিং, কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্ট করে একটি বাস্তবভিত্তিক মার্কেটিং স্ট্রাটেজিক প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট ও এসইও
একটি সুন্দর ইনফরমেটিভ (এসইও) ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট তৈরি করে নিতে হবে। কারণ আপনার বর্তমান নির্ধারিত ক্রেতার কাছে সংযোগ স্থাপন করার জন্য এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সার্চইঞ্জিন সব সময়ই তার সার্চের ফলাফল দেখায় স্থানীয় অনুসারে। উদাহরণস্বরূপ আপনার আবাসিক বা বাণিজ্যিক পণ্য কেনার প্রয়োজন কিন্তু আপনি জানেন না আপনার আশপাশে কোথায় প্রয়োজনীয় পণ্যটি রয়েছে, তাই গুগলে (লাকজারি ফ্ল্যাট ইন ঢাকা) সার্চ করা হলে, গুগল তৎক্ষণাৎ আপনাকে আপনার নির্ধারিত পণ্যের তালিকার পাতায় নিয়ে যাবে। সেখানে যদি আপনার ওয়েব প্রেজেন্স না থাকে তাহলে আপনি যে আপনার নির্ধারিত ক্রেতা হারাবেন তার কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া একটি ইনফরমেটিভ ওয়েবসাইট তৈরির মাধ্যমে পণ্যের ডিজিটাল শপ ও কাস্টমারকে রিটার্গেটিং করে অনগোয়িং বা আপকামিং পণ্যের পরিচিতি সহজেই তুলে ধরা যায়।
ডিজিটাল
বর্তমান ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে শুধুমাত্র বিক্রয়কর্মীদের কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে বিক্রয় কর্মীদের হাতে তুলে দিতে হবে মানসম্পন্ন লিড। এ জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে। অনেক ক্রেতাই তাদের ব্যস্ত কর্মসূচির মাঝখানে এখন টেলিফোন বা ডোর টু ডোর পদ্ধতির বিক্রয় কৌশলকে পছন্দ করছেন না। এমতাবস্থায় ফেসবুক, অনলাইন পোর্টাল, লিংকডইনসহ সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রচুর মানসম্পন্ন লিড জেনারেশন সম্ভব। যা প্রতিষ্ঠানের মাসিক তথা বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক।
কল সেন্টার এজেন্ট ও সিআরএম সফটওয়্যার
একটি উন্নত কল সেন্টার গড়ে তুলতে হবে যেখানে ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে একজন কল সেন্টার এজেন্ট সহায়তা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কল সেন্টার প্রধান ও কল সেন্টার এজেন্টদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রোডাক্ট নলেজ এবং ডাটা এনালাইসিসে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ইনবাউন্ড এবং আউটবাউন্ড কলের মাধ্যমে যে লিড জেনারেশন হয়ে থাকবে তা অবশ্যই কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যুগোপযোগী সিআরএম সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্রেতার তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এতে করে ভবিষ্যতে একই ক্রেতার কাছে আরও বিক্রির সম্ভাবনা বাড়বে।
গবেষণা ও উন্নয়ন টিম
প্রতিটি আবাসন কোম্পানি বাজারজাতকরণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে সহায়তার জন্য একটি গবেষণা ও উন্নয়ন টিম শাখা রাখতে পারেন। এলাকাভিত্তিক পণ্যের ধরন অনুযায়ী প্রাইস এনালাইসিস, প্রাইস জাস্টিফিকেশন, ভোক্তার প্রয়োজন বা চাহিদ গবেষণা, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ও তাদের কর্মকাণ্ড গবেষণা করা এবং দেশের এই শিল্পের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে তা আবাসন প্রতিষ্ঠানকে গাইড করা এই টিমের উল্লেখযোগ্য কাজ হবে।
২১ শতকের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ বিনির্মাণে আবাসন খাত যাতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে সে জন্য মার্কেটিং পেশাজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের এবং বৈশ্বিক আবাসনশিল্প নিয়ে গবেষণা করতে হবে, পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিষ্ঠান তথা দেশকে পথ দেখাতে হবে।
লেখক: হেড অব মার্কেটিং, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড