05/03/2026
জমি দখলমুক্ত হবে ৩ মাসেইঃ নতুন আইনের ম্যাজিক!
রহিম সাহেব দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফিরে দেখেন তার পৈত্রিক ৫ শতাংশ জমি প্রতিবেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি জাল দলিল তৈরি করে দখল করে নিয়েছেন এবং সেখানে একটি সীমানা প্রাচীর দিয়েছেন। ইতিপূর্বে এ ধরনের সমস্যায় রহিম সাহেবকে দেওয়ানী আদালতে 'টাইটেল স্যুট' অর্থাৎ স্বত্ব সাব্যস্তের মামলা করতে হয়েছিল, যা শেষ হতে ১০-১৫ বছর লেগেছিল। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে রহিম সাহেব পরামর্শ নেন একজন আইনজীবীর সাথে। তাঁর পরামর্শক্রমে রহিম সাহেব ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর অধীনে জেলা প্রশাসকের নিকট বা নির্ধারিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেন।
ম্যাজিস্ট্রেট উভয় পক্ষের দলিলপত্র যাচাই করেন। দেখা যায়, প্রতিবেশীর দলিলটি সাম্প্রতিক সময়ে করা এবং তার কোনো সঠিক বায়া দলিল নেই। আইন অনুযায়ী, বিগত ৩০ বছর যাবত নিরবচ্ছিন্ন দখল বা বৈধ মালিকানা প্রমাণ করতে না পারায় ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবেশীর দলিলটি অবৈধ ঘোষণা করেন এবং রহিম সাহেবকে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এ ধারা ৪ এ বলা আছে, অন্যের জমি নিজের নামে লিখে নেওয়া বা ভুয়া দলিল তৈরি করলে এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদ- ও অর্থদ-। অন্যদিকে এ আইনের ধারা ৫ এ বলা আছে, মালিকানা গোপন করে জমি বিক্রি বা তথ্য বিকৃতি করলে এর শাস্তিও সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদ-।
জামান সাহেব ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে দেখেন, তার পৈত্রিক কৃষি জমির এক অংশ স্থানীয় এক ব্যক্তি জোরপূর্বক বেড়া দিয়ে দখল করে নিয়েছেন। দখলদার দাবি করছেন যে, তিনি এই জমিটি জামানের মৃত চাচার কাছ থেকে মৌখিকভাবে কিনেছেন, যদিও তার কাছে কোনো বৈধ দলিল নেই। জামান সাহেব বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও দখলদার জমি ছাড়ছিলেন না।
জামান সাহেব ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর ৮ ধারা অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নিকট উচ্ছেদের আবেদন করেন। তিনি তার পক্ষে সি.এস এবং আর.এস খতিয়ান এবং হালনাগাদ দাখিলা (খাজনা রসিদ) প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন।
জেলা প্রশাসক বা মনোনীত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডকে নির্দেশ দেন। তদন্তে দেখা যায় দখলদারের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। আইন অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ ফোর্স ব্যবহার করে দখলদারকে উচ্ছেদ করেন এবং জামান সাহেবকে দখল বুঝিয়ে দেন। পাশাপাশি দখলদারকে জেল ও জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এ ধারা ৭ এ বলা হয়েছে যে,যদি কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত দলিল ছাড়াই অন্যের জমি দখল করেন বা দখল বজায় রাখেন, তবে সেটি অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদ- ও অর্থদ-।
ধারা ৮ এ বলা আছে, এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তি দখলচ্যুত হলে তিনি জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করতে পারেন। জেলা প্রশাসক প্রমাণাদি যাচাই করে ৩ মাসের মধ্যে দখল পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন।
তবে আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে তার বৈধ মালিকানা (দলিল ও খতিয়ান) রয়েছে এবং তিনি বেআইনিভাবে দখলচ্যুত হয়েছেন।
আদালতের একটি সাধারণ নজির হলো, যদি কারো কাছে বৈধ মালিকানার কাগজ থাকে এবং তার বিপরীতে কেউ অবৈধভাবে দখল করে রাখে, তবে আইনত দখলটি প্রকৃত মালিকেরই প্রাপ্য। দখলদার যত প্রভাবশালীই হোক, দলিলের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। প্রবাদে আছে, জমির দলিল যার, জমি তার।
২০২৩ সালের আইনের পর আদালতের মনোভাব হলো শুধুমাত্র 'জোর যার মুল্লুক তার' নীতি আর চলবে না। জেলা প্রশাসনকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ দেওয়ানী আদালতে যাওয়ার আগেই দ্রুত প্রশাসনিকভাবে জমি ফেরত পায়।
যদি দখলদার দাবি করে যে তার কাছেও দলিল আছে (অর্থাৎ জটিল স্বত্ব বিরোধ), তবে ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি সিভিল কোর্টে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন। তবে যদি দখলদার কোনো কাগজ দেখাতে না পারে, তবে দ্রুত উচ্ছেদ সম্ভব!