05/06/2026
কারাগারে / জেলখানায় কত মাসে বছর? #জেলখানায়কতমাসেবছর
জেলখানায় কত মাসে বছর? (প্রিজন্স অ্যাক্ট, ১৮৯৪ এর ধারা: ৫৯ এ বর্ণিত জেলকোড, ১৯২০ এর বিধি অনুযায়ি)
✪ স্বাভাবিকভাবে আমরা জানি ৩৬৫ দিনে বছর, ৩০ দিনে মাস; জেলখানার কয়েদিদের জন্যও কি সেই হিসেব প্রযোজ্য? নাকি তাদের বেলা ভিন্ন হিসেব? চলুন আজকে আলোচনা করা যাক সেই বিষয়েই..
➤ সূচনা আলোচনা: দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৪৯ ধারায় বছর ও মাসের সংজ্ঞায় বলা আছে ব্রিটিশ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যেভাবে বছর ও মাস গণনা করা হয় তাকেই বোঝাবে। একই কথা বলা হয়েছে General Clauses Act, 1897 আইনের ৩ (৫৯) ধারায়ও। সুতরাং, বছর মানে ৩৬৫ দিন ও মাস মানে ৩০ দিন এটাই প্রযোজ্য আইনে এবং কারাগারের ক্ষেত্রেও এই হিসেবেই বছর ও মাসের হিসেবটা হবে!
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যে শুনি জেলাখানায় ৮ মাস, ১০ মাস বা ৬ মাসে বছর এই কথাগুলো আসলো কিভাবে? চলুন তাহলে সেই বিষয়টা জেনে নেই।
➤ মূল আলোচনা: রেয়াতের মাধ্যমে মূলত কারাবন্দিদের দণ্ডকাল কমে আসে। তাহলে রেয়াত বিষয়টি বুঝলেই কিন্তু আমরা বুঝতে পারবো কয়েদিদের ক্ষেত্রে কত মাসে বছর কিংবা কত দিনে মাস!
আদালতের রায়ে কাউকে কারাগারে পাঠানো হলে আদালতের আর কোনো দায় থাকেনা এরপর থেকে দায়িত্ব বর্তায় কারা কর্তৃপক্ষের উপর। কারা কর্তৃপক্ষ ও কারাগারের যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রিত হয় Prisons Act, 1894 এর ধারা: ৫৯ এ বর্ণিত Jail Code, 1920 মোতাবেক।
জেলকোড, ১৯২০ এর ১১শ অধ্যায়ের ৭৫০-৭৮১ বিধিতে সন্নিবেশিত আছে বন্দিদের রেয়াত (remission) মঞ্জুরের বিধানবলী। রেয়াত মানে হলো অব্যাহতি দেয়া বা ছাড় দেয়া বা রেহাই দেয়া। এই রেয়াত এর মাধ্যমেই মূলত কোনো আসামীর দণ্ডের মেয়াদ কমানোর সুযোগ চলে আসে যা কিনা ঐ বিধিগুলো মোতাবেকই হতে হবে।
✪ রেয়াত (Remission) : রেয়াত দুই প্রকারের হয়: সাধারণ ও বিশেষ রেয়াত।
➤ রেয়াত মঞ্জুর: জেলকোডের ৭৬১ বিধি মোতাবেক 'সাধারণ রেয়াত' মঞ্জুর করতে পারেন সিনিয়র জেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট বা জেল সুপার বা তার কতৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্য কোনো জেল কর্মকর্তা।
অপরদিকে, ৭৬৬ বিধি মোতাবেক সরকার বা আইজি প্রিজন্স অথবা জেল সুপার কার্যকর করতে পারেন 'বিশেষ রেয়াত'।
✪ জেলকোডের বিধি মোতাবেক রেয়াতের পরিমাণ:
➤ কারাবন্দীদের সাধারণ রেয়াৎ প্রাপ্তি:
☞ কারাগারের সব নিয়ম মেনে চলার জন্য প্রতিমাসে ৩ দিন। [বিধি: ৭৫৬ (এ)]
☞ শিল্প ও দৈনন্দিন দেয়া কাজগুলো সঠিকভাবে করাে জন্য প্রতিমাসে ২ দিন। [বিধি: ৭৫৬ (বি)]
☞ কারারক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালনে প্রতিমাসে ৭ দিন ও নৈশপ্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালনে প্রতিমাসে ৬ দিন। [বিধি: ৭৫৭]
☞ শুক্রবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে বাবুর্চি ও সুইপারের কাজে নিয়োজিত থাকলে অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি কোয়ার্টারে ৩ দিন। [বিধি: ৭৫৯]
☞ দণ্ডাদেশ প্রাপ্তির পরবর্তী মাসের ১ তারিখ হতে ১ বছর পার হবার পর; কারা অপরাধের সর্বশেষ শাস্তিভোগের তারিখ হতে ১ বছর অতিক্রম করার পর বন্দি যদি অন্যকোনো কারা অপরাধ না করেন সেক্ষেত্রে বছরে আরও ১৫ দিন সাধারণ রেয়াত পাবেন। [বিধি: ৭৬০]
◑ তাহলে দেখা যাচ্ছে, একজন বন্দী বিধি মোতাবেক কাজকর্ম করলে মাসে ১০-১৫ দিন সাধারণ রেয়াত পেতে পারেন যা সম্ভব নয় তবে প্রত্যেক বন্দিই কিছু রেয়াত পেয়ে থাকেন। ফলে বন্দিদের ক্ষেত্রে প্রতিমাসে দিনের পরিমাণ কমে আসে।
➤ কারাবন্দীদের বিশেষ রেয়াৎ প্রাপ্তি: বিশেষ রেয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে জেলকোডের ৭৬৫ ও ৭৬৬ বিধিতে। উক্ত বিধি দুটি মোতাবেক জেল সুপার বছরে সর্বোচ্চ ৩০ দিন ও আইজি প্রিজন্স অথবা সরকার বছরে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত বিশেষ রেয়াত প্রদান করতে পারেন। যে যে ক্ষেত্রে বিশেষ রেয়াত প্রদান করা হয়:
☞ কারাগারে শৃঙ্খলা বা নিয়ম ভঙ্গের বিষয় শনাক্ত করা কিংবা প্রতিরোধ করার কাজে সহযোগিতা করা।
☞ হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ প্রদানে কৃতিত্ব।
☞ বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ কোনো কাজ কিংবা আয় বৃদ্ধিকারক উন্নতমানের কোনো কাজ।
☞ আক্রমণ হতে কারা কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের রক্ষা করা।
☞ কারা বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা, আগুন বা সমপ্রকৃতির জরূরী ক্ষেত্রে কারা কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করা।
☞ পোশাক ব্যবহারে মিতব্যয়িতা।
☞ টেকনিক্যাল বা একাডেমিক ট্রেনিং গ্রহণে দক্ষতা প্রদর্শন।
☞ কারাগারের বিধিবিধান পালনে মনোযোগী হওয়া ও একটানা তিন বছর কোনো কারাশাস্তি ভোগ না করা।
✪ রেয়াত প্রাপ্তির শর্তাবলী:
☞ জেলকোডের ৭৬৮ বিধি মোতাবেক এক দণ্ডের তৃতীয়াংশের বেশি রেয়াত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ অনুমতি লাগবে।
☞ বিচারাধীন বন্দি কোনো রেয়াতই পাবেন না।
☞ জরিমানা অনাদায়ে প্রদত্ত কারাদণ্ড ব্যতীত ৬ মাসের কম মেয়াদের কারাদণ্ডে সাধারণ রেয়াত প্রযোজ্য নয়।
☞ বিধি ৭৫৪ মোতাবেক কারা শৃঙ্খলা ভঙ্গ কিংবা কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আঘাত করার অপরাধে কারা কর্তৃপক্ষ রেয়াত বাতিল করতেও পারবেন।
✪ উপসংহার: উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে একজন কারাবন্দী রেয়াতের ভিত্তিতে দণ্ডাকাল কমিয়ে আনতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এমনও হতে পারে বছর ৬ মাসেও হতে পারে কিংবা ৮ মাস বা ১১ মাসেও হতে পারে। একেক বন্দীর ক্ষেত্রে সাধারণ ও বিশেষ রেয়াতের মাধ্যমে বন্দিরা দণ্ডকাল কমিয়ে আনতে পারবেন।