23/08/2026
🇧🇩 বাংলাদেশ ও মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।
বিগত কিছু দিন যাবৎ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত খবরগুলোর একটি হচ্ছে, বাংলাদেশ কি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে কি না!
গত ৭ আগস্ট, ২০২৬, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় স্বাক্ষর করেছে একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। যেটিকে অনেক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ সামরিক চুক্তির সম্প্রসারিত রূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশও এখন এতে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defence Pact) মূলত ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর আদলে গঠিত একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামো। এর মূল শর্ত হলো, তিন রাষ্ট্রের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিনটি রাষ্ট্রের ওপরই আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর্টিকেল ৫ এর কারণেই ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর রাশিয়া হামলা করে না।
চুক্তিতে প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে: সৌদি আরব প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অর্থায়ন করবে, তুরস্ক উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, আর পাকিস্তান সম্মুখসারিতে জনবল দেবে। ঘোষিত লক্ষ্য হলো “যেকোনো আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করা” এবং তিন রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ পর তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে গভীর সহযোগিতার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যদিও অনেকেই এই জোটকে ইরানবিরোধী একটি জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বাস্তবে এটি মূলত ইরানবিরোধী কোনো জোট নয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে লিখিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং সৌদি আরবের ইরানকে আক্রমণ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং রিয়াদ চায় হরমুজ প্রণালী ঘিরে সংঘাতের অবসান এবং সংলাপ। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো “ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের” জন্য উন্মুক্ত এবং তাত্ত্বিকভাবে ইরানও এতে যোগ দিতে পারে।
বিশেষ করে, ইরানের নিজস্ব বিশ্লেষক মহলও এটাকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে না। বরং তারা এই চুক্তিকে পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন নিরাপত্তা আধিপত্যের পতনের সূচনা হিসেবে দেখছে, যা বছরের পর বছর ধরে ইরান নিজেই দাবি করে আসছিল যে অঞ্চলের দেশগুলোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভর করা। এক অর্থে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ঠিক সেই পথেই হেঁটেছে, যা ইরান দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছে।
তাছাড়া এই জোটের বর্তমান তিনটি দেশের সবার সঙ্গেই ইরানের মোটামুটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালের পর চীনের মধ্যস্থতায় ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক সম্পর্কও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া পাকিস্তান ও ইরান ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ এবং মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ইরানকে রক্ষায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখনও পালন করে যাচ্ছে।
এই চুক্তির কৌশলগত প্রেক্ষাপটে মূলত দুই ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে: ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। ইসরায়েলের নিজস্ব গণমাধ্যমও স্বীকার করেছে, এই চুক্তি তাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণের সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থাৎ, এটা মূলত মুসলিম বিশ্বের নিজস্ব নিরাপত্তা স্থাপত্য গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা, যেখানে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক অবস্থান একটি কেন্দ্রীয় উদ্বেগ।
ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ইসরায়েল নিজেও ইতিমধ্যে ইসরায়েল, গ্রিস, ভারত, সাইপ্রাস ও আব্রাহাম চুক্তির কিছু সদস্যকে নিয়ে একটি “হেক্সাগন জোট” ঘোষণা করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল।
তাছাড়া এই জোট কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোনো জোট নয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান অনেক দিন যাবৎ এমন একটি জোট তৈরির জন্য প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের এই জোট নিয়ে চিন্তাভাবনা কী?
সম্প্রতি তুরস্কের কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে যে বাংলাদেশকে এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, বাংলাদেশ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক-সংশ্লিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, নিজের স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে।
তিনটি প্রতিষ্ঠাতা দেশই মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ এই কাঠামোতে যুক্ত হলে বিশ্বমঞ্চে মুসলিম বিশ্বের একটি সক্রিয় অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো যে, বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশের পরপরই লক্ষণীয় একটি পরিবর্তন এসেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মক্কা চুক্তি প্রসঙ্গে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে শুধু বলেছে, তারা “পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে”, যা নিজেই একটি সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
দিন দিন বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি হয়তো আরও বেশি নিশ্চিত হবে এবং যেকোনো দেশের সঙ্গে সরকারের আলোচনার ক্ষমতাও হয়তো আরও বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে এই চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশ হয়তো তুরস্কের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা পাবে এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ পেতে পারে।
প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার না করলেও, একটি বিষয় সত্য যে কিছু দেশ আমাদের সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে চায়। একইসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র আমাদের দেশের ওপর বাইরের কিছু দেশ অনেক দিন যাবৎ চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
এছাড়াও, আমাদের দুর্বল সামরিক অবকাঠামো, ভূ-রাজনৈতিক হুমকি, নিরবচ্ছিন্ন সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং অন্যান্য হুমকির কথা বিবেচনা করলে, এমন একটি জোটে অংশ থাকা হয়তো আমাদের দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উপকারী হবে। এই ধরনের জোট ভবিষ্যতে কোনো আক্রমণ থেকে হয়তো প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে এবং কোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবেও কাজ করতে পারে।
সুতরাং, সরকারকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জোটে যোগদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসা উচিত এবং এর জন্য এই সরকার অবশ্যই তারেক রহমানের “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি অবলম্বন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
#সার্বভৌমত্ব