19/02/2026
ফাঁকা চেক কিংবা জামানতের চেকঃ আসামী খালাসের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত!
এডভোকেট এনামুল হক।
শুধুমাত্র চেক স্বাক্ষর হলেই সাজা নিশ্চিত নয়; বরং লেনদেনের বৈধতা এবং সত্যতা প্রমাণ করা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপিল বিভাগ বেশ কিছু যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। তার মধ্যে চেকটি কেন দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে কোনো বৈধ লেনদেন ছিল কি না, তা বাদীকে প্রমাণ করতে হবে। যদিও এন.আই এ্যাক্টের ১৩৯ ধারায় বলা আছে চেক থাকলেই ধরে নেওয়া হবে দায় আছে, কিন্তু আদালত বলছেন এটি একটি ‘খ-নযোগ্য অনুমান’। অর্থাৎ, আসামি যদি প্রমাণ করতে পারে যে কোনো লেনদেন হয়নি যেমন চেকটি হারিয়ে গিয়েছিল বা সিকিউরিটি হিসেবে ছিল, তবে তিনি খালাস পেতে পাবেন। (মোঃ আবুল কাহের শাহিন বনাম ইমরান রশিদ এবং অন্যান্য, ২৫ বিএলসি (এডি), ১১৫)
আবার মামলার বাদী এত টাকা আসামিকে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন কি না, সেটিও এখন আদালতের বিবেচ্য বিষয়। বাদী যদি বড় অংকের টাকা লেনদেনের দাবি করেন, তবে তার ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে সেই টাকার উল্লেখ আছে কি না, তা যাচাই করা হতে পারে। বাদী নগদ টাকা দিয়ে থাকলে সেই টাকা তার কাছে কোত্থেকে এলো, তা প্রমাণ করতে না পারলে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। কেবল চেক ছাড়া আর কোনো চুক্তিপত্র বা সাক্ষী না থাকলে আদালত আসামিকে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ দিতে পারেন।
অনেক সময় মহাজনি ঋণের বিপরীতে বা কাউকে চাপে ফেলে ব্ল্যাঙ্ক চেক নেওয়া হয়। যদি বাদী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন যে তিনি চেক-এ উল্লেখিত টাকা আসামিকে কোনো সুদ চুক্তির ভিত্তিতে দিয়েছিলেন, তবে চেক থাকা সত্ত্বেও আসামি দ- পাবেন না। আদালত এটাকে "পাওনা টাকার অস্তিত্বহীনতা" হিসেবে গণ্য করবেন। (৬৪ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৪২০)।
আবার অনেক সময় ব্যবসার জামানত হিসেবে চেক দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যদি প্রমাণিত হয় চেকটি কোনো নির্দিষ্ট পাওনা মেটানোর জন্য নয় বরং জামানত বা নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হয়নি, তবে ১৩৮ ধারায় সাজা দেওয়া যাবে না। ৬৩ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) পৃষ্ঠা ৭২ আব্দুল আওয়াল বনাম রাষ্ট্র।
প্রতিদান ছাড়া যেমন চুক্তি হয় না, তেমনি প্রতিদান ছাড়া কোন হস্তান্তরযোগ্য দলিল কার্যকর করা যাবে না। কাজেই স্বাক্ষরসহ চেক কারও নিকট হস্তগত হলেই কিংবা ব্যাংক ডিসঅনার করলেই চেকের মামলায় আসামীকে শায়েস্তা করা যাবে না। প্রতিদান বা দেনা পাওনা বা লেনদেন প্রমাণ করতে না পারলে মামলায় আসামী খালাস পাবে-এমনটিই বলেছেন উচ্চ আদালত। (লোকমান বনাম আয়ুব আলী এবং রাষ্ট্র মামলা, যা ৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬, ৬১৭-৬২০)।
তবে মনে রাখবেন যদি বৈধ চুক্তি থাকে এবং লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে বা দালিলিক প্রমাণসহ হয়, তবে চেক ডিজঅনারের শাস্তি (১ বছর জেল ও চেকের তিনগুণ জরিমানা) আগের মতোই বলবৎ আছে।