31/07/2026
ফাঁকা চেকে সই মানেই কি জেল? পুরনো চেক, ভিন্ন হাতের লেখা ও আসামির খালাসের আইনি সমীকরণ
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
আদালতের কাঠের কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে একজন আসামি যখন দেখেন, কয়েক বছর আগে কোনো ব্যবসায়িক জামানত হিসেবে দেওয়া তাঁর একটি ফাঁকা চেকে ইচ্ছেমতো টাকার বিপুল অঙ্ক বসিয়ে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে তখন তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
আইনের সাধারণ চোখ বলে, চেকে যখন স্বাক্ষর আসামির, তখন এন.আই এ্যাক্টের ১১৮ ও ১৩৯ ধারা অনুযায়ী প্রাথমিক অনুমান অভিযোগকারীর বা বাদীর পক্ষেই যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আইনি অনুমান কি একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারকে একেবারে কেড়ে নিতে পারে? উত্তর হচ্ছে না, কখনোই নয়।
একটি চেকে কেবল একটি সই থাকলেই তা শতভাগ দোষনীয় চেকে পরিণত হয় না। চেকের বয়স, ভিন্ন হাতের লেখা, ভিন্ন কালি এবং ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার আলোকেই প্রকাশ পায় একটি মামলার আসল সত্য।
চেকের মামলায় আসামির সইটি যদি সঠিকও ধরে নেওয়া হয়, কিন্তু তারিখ, প্রাপকের নাম ও টাকার অঙ্ক যদি অন্য কারও হাতের লেখায় লেখা হয়ে থাকে তবে কি সেটি আইনানুগ চেক?
আমাদের উচ্চ আদালত এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। এম. এ মজিদ বনাম মোঃ আব্দুল মোতালেব (৫৬ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৬৩৬) মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে,
"আসামির স্বাক্ষর, টাকার অঙ্ক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখায় থাকলে এন.আই অ্যাক্টের ধারা ৩(ই) অনুসারে উহাকে 'ইস্যুয়েন্স অব চেক' বলা যাবে না এবং অনুরূপ চেক আইনানুগভাবে বৈধ নয়।" অর্থাৎ, সই এক ব্যক্তির আর ভেতরের বডি পূরণ করেছে অন্য কেউ এমন চেককে স্বাভাবিক নিয়মে ইস্যুকৃত চেক বলা যাবে না।
চেক দাতার অনুমোদন বা সম্মতি ছাড়া পরবর্তীতে যদি চেকে কোনো পরিবর্তন আনা হয় যেমন ইচ্ছেমতো টাকার অঙ্ক বাড়ানো বা মেয়াদ পার হওয়া চেকে নতুন তারিখ বসানো তবে এন.আই অ্যাক্টের ৮৭ ধারা অনুযায়ী তা 'মেটেরিয়াল অলটারেশন' বা বস্তুগত পরিবর্তন হিসেবে গণ্য হয়। আর আইনানুযায়ী এমন চেক সরাসরি বাতিল।
সম্প্রতি এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য (৭৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৪৪৭) মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, যদি চেকের মূল ড্রয়ার নিজে সম্পূর্ণ চেক পূরণ না করে অন্য কেউ পরে অঙ্ক, তারিখ কিংবা প্রাপকের নাম লিখে দেয় এবং হস্তাক্ষরে অসঙ্গতি থাকে, তবে বাদীকে আদালতে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন তিনি বা অন্য কেউ এই চেক পূরণ করলেন? এতে ড্রয়ারের সম্মতি ছিল কি না? বাদী যদি এই হস্তাক্ষরের ভিন্নতার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তবে মামলার ভিত্তিই ধসে যাবে এবং আসামি সরাসরি খালাস পাবেন।
অনেক সময় পাওনাদার বহু পুরোনো কোনো সিকিউরিটি চেক ৫ বা ১০ বছর নিজের কাছে রেখে সুবিধাজনক সময়ে নিজের ইচ্ছেমতো তারিখ ও বড় অঙ্কের টাকা বসিয়ে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করেন।
এখন প্রশ্ন হলো, চেকের সই এবং ভেতরের লেখা একই সময়ে করা হয়েছে, নাকি ভিন্ন সময়ে যেমন ৫ বছর পর পূরণ করা হয়েছে তা প্রমাণ করবেন কীভাবে?
এখানেই আসে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ৪৫ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৩(২) ধারার ভূমিকা। হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ বা ফরেনসিক ল্যাবে চেকটি পাঠানোর আবেদন করা আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি আইনগত অধিকার, যা ‘ন্যায্য বিচার’ বা ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমাদের উচ্চ আদালত এন.আই অ্যাক্টের ক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বহুল সমাদৃত দুটি নজির প্রায়ই অনুসরণ করে থাকেন। (টি. নাগাপ্পা বনাম ওয়াই.আর. মুরলিধর (এআইআর ২০০৮ এস.সি ২০১০)। (কল্যাণী ভাস্কর বনাম এম.এস. সম্পূর্ণম (২০০৭, ২ এসসিসি ২৫৮)
উক্ত রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, চেকে এন.আই অ্যাক্টের ১১৮(এ) ও ১৩৯ ধারার আইনি অনুমান থাকলেও তা 'খ-নযোগ্য'। সই এবং লেখা একই সময়ের কি-না, তা নির্ধারণের জন্য চেক ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো আসামির ন্যায্য প্রতিরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। আসামি যদি যৌক্তিক কারণে হস্তাক্ষর পরীক্ষার আবেদন জানান, আদালত তা খারিজ করলে তা ফেয়ার ট্রায়ালের সরাসরি লঙ্ঘন হবে।
চেকের অবৈধ ব্যবহার ও জামানত হিসেবে দেওয়া চেকের অপব্যবহার রোধে মহামান্য আপিল বিভাগ হুমায়ুন রশিদ বনাম শাহিন আকন্দ (৭১ ডিএলআর (অউ)) মামলায় কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
চেকের মামলায় বাদীকে কেবল চেকটি উপস্থাপন করলেই চলবে না; চেকে যদি বিভিন্ন হাতের লেখা ও কালির ব্যবহার দৃশ্যমান হয়, তবে বাদীকে অবশ্যই তার যৌক্তিক কারণ প্রমাণ করতে হবে। বাদী যদি হস্তাক্ষরের এই ভিন্নতার কোনো ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন, তবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল নীতি অনুযায়ী "সন্দেহের সমস্ত সুবিধা পাবেন আসামি।"
বিনিময় মূল্য ছাড়া, ভিন্ন ব্যক্তির হাতের লেখায় এবং ভিন্ন সময়ে সুবিধাজনকভাবে পূরণকৃত কোনো বিতর্কিত চেক দিয়ে কাউকে সাজা দেওয়া ন্যায়বিচারের মূল চেতনার পরিপন্থী। আইনের অনুমানের ঢাল ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে হয়রানি করার সুযোগ নেই।
আদালতের সুনির্দিষ্ট আইনি নজির এবং হস্তাক্ষর ও ফরেনসিক রিপোর্টের সত্যতাই পারে একজন নির্দোষ আসামিকে সাজানো চক্রান্তের হাত থেকে রক্ষা করে খালাসের পথ নিশ্চিত করতে।
লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা, পিএইচ.ডি ইন-ল। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮, ইমেইলঃ[email protected]