28/03/2021
যৌতুকঃ
যৌতুক বা পণ হল কন্যার বিবাহে পিতামাতার সম্পত্তির হস্তান্তর প্রক্রিয়া। 'যু' ধাতু থেকে নিষ্পন্ন 'যুত' শব্দের অর্থ যুক্ত; বুৎপত্তিগত অর্থ হলো, পাত্র-পাত্রীর যুক্ত হওয়ার সময়ে অর্থাৎ বিয়ের সময় পাত্রীর জন্য যা কিছু মূল্যবান সামগ্রী দেয়া হয়, তা যৌতুক।
যৌতুক প্রথার কারণঃ
যৌতুক প্রথার প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থলোভ। অনেক সময় অর্থের লালসায় ছেলের পরিবার ছেলেকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে থাকে। এছাড়াও আমাদের দেশে দারিদ্র্য বা আর্থিক দূরবস্থাও যৌতুক প্রথা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। দরিদ্রতার চাপে বা অভাবে পরে অনেকে যৌতুক নিয়ে থাকে।
সামাজিক মর্যাদা বা ‘স্ট্যাটাস' বজায় রাখতে কেবল নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নয়, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও উপহারের নামে যৌতুক দেয়ার চল রয়েছে বাংলাদেশে৷ সমাজকে যৌতুকমুক্ত করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা৷
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারে তথাকথিত যৌতুক প্রথা সাধারণত পরিলক্ষিত হয় না৷ কিন্তু অন্যভাবে কন্যার পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখা হয়, যেটা যৌতুকের অন্তর্ভুক্ত৷ অনেকে মনে করেন নিজের মেয়েকে সুখে থাকবে তাই ভালো করে বেশি বেশি জিনিস দিয়ে তাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হোক৷ কিন্তু তারা একটা জিনিস বুঝতে পারেন না যে, এই দেয়ার প্রবণতা অন্যপক্ষের চাওয়ার প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়৷ অর্থাৎ যৌতুক যে লোভ, সেই লোভকে আরো উসকে দেয়া হয়৷ কেননা আমাদের সমাজে ধরেই নেয়া হয় পুত্র সন্তান মানেই ধন-সম্পদ, পরিবারে অর্থ উপার্জন বা অর্থ আনার লক্ষ্মী৷ সুতরাং তাকে দেখেই যেন মেয়ের বাপ-মা সবকিছু উজার করে দেবেন৷ অথবা কেউ দেবেন চাকরি, কেউ দেবেন সম্পত্তি৷
যারা নিচ্ছেন তারা একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে, এই যৌতুক চাওয়াটা একেবারে ভিক্ষার পর্যায়ে পড়ে? একটা পরিবারে একজন মেয়ে তো ঠিক ততটাই আদর যত্নে বড় হয়, যতটা একটা ছেলে৷ সেট যত্নের ধনকে আপনার হাতে যখন তুলে দেয়া হচ্ছে, আপনি তাকে আপনার পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করছেন, অর্থাৎ শর্তহীন ভালোবাসায় গ্রহণ করছেন তাকে৷ সেখানে ভিক্ষার দান থাকবে কেন?
নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা৷ আর উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো কী করছে? সমাজের ধনী ও বিত্তশালী হবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে তারা৷ অর্থাৎ দেখানোর প্রতিযোগিতা৷ কে কত অর্থ ঢালতে পারে ছেলে-মেয়ের বিয়েতে৷ অর্থাৎ সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস বজায় রাখতে জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠান করা, প্রচুর মানুষ দাওয়াত করা এবং উপঢৌকন দেয়া৷ দুই পরিবারে সামাজিক পদ ভিন্ন হলে, অর্থাৎ কনের পরিবার কম সম্পদের অধিকারী হলে বরের পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে সাধ্যের বাইরে গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করেন৷ কিন্তু এতে কি আদৌ বরের পরিবারে কনের সম্মান বাড়ে? নাকি বাবা যে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে এই আড়ম্বর অনুষ্ঠান করলেন সেই আত্মগ্লানি মেয়েটিকে কুড়ে কুড়ে খায়?
এ সব বিয়েতে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে কনের পরিবার বরের পরিবারকে কী কী উপহার দিল, বাড়ি, গাড়ি নাকি ব্যবসায় অংশীদারিত্ব? এই দেখানোর চলটা ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের মানসিকতায় প্রবেশ করছে আজ৷ বাবা-মায়ের সামর্থ্য না থাকলেও এই দেখানোর প্রতিযোগিতায় কত পরিবার যে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে তার খবর রাখে কে? এর মাধ্যমে যে যৌতুককে উসকে দেয়া হচ্ছে, সেটাই বা মানতে চাইবে ক'জন? তাই এই ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে আমাদেরই৷
পরিসংখ্যান কী বলছে?
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতনের কারণে সারা দেশে ৬ হাজার ৬০৭টি মামলা হয়েছে৷ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ‘আমরাই পারি' পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের-২০১৫ সালের বছরজুড়ে নারী নির্যাতনের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ১৯২ জনকে, যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়েছেন ১৭৩, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৭৪ জন৷ দেশের আদালতে যেসব নালিশি মামলা দায়ের হয় তার অন্তত ৫০ শতাংশ যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা৷
এছাড়া ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' বা ইউএনডিপি পরিচালিত ‘সিস্টেম অফ ডাওরি ইন বাংলাদেশ' বা বাংলাদেশের যৌতুক প্রথার ওপর ১০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শতকরা ৫০ শতাংশ বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়৷ তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সাদা চোখে আমরা হয়ত কেবল দরিদ্র পরিবার গুলোকেই যৌতুক নিতে দেখছি৷ কিন্তু অন্যান্য পরিবারগুলোও যে এই মানসিকতা থেকে বাইরে নয়, তার একটা মোটামুটি চিত্র কিন্তু এ থেকে বোঝা যায়৷
যৌতুক বন্ধে ১৯৮০ সালে ন'টি ধারা নিয়ে হয় যৌতুক নিরোধ আইন৷ এটাতে কাজ হলো না৷ এরপর ১৯৯৫ সালে হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ বিধান আইন করা হলো৷ এ আইনে কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হলো৷ শেষ পর্যন্ত এটাও ব্যর্থ হলো৷ সর্বশেষ ২০০০ সালে হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন৷ এরপর এ বছর ‘যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৭'-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়৷ এর আওতায় কোনো নারীর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষের অন্য যেকোনো ব্যক্তি যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷ যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা (প্ররোচিত করে) করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, মারাত্মক জখমের জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড বা ন্যূনতম ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে৷
কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি শুধু নয়, মারণব্যধির মতো আমাদের সমাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে৷ যৌতুক যে দেয় এবং যৌতুক যে নেয় দু'জনেই সমান অপরাধী-এই আইনের মূল মন্ত্র জানলেও ক'জন তা মানে? তাই শুধু আইন করে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়৷ এজন্য প্রয়োজন ঘর থেকে ঘরে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া৷ এ ব্যাপারে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আরও নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত৷ ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যৌতুক বিরোধী প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে৷ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ পাঠ্যপুস্তকে যৌতুক বিরোধী বিষয় এবং যৌতুক সংক্রান্ত আইনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে৷ মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিওগুলো যৌতুক বিরোধী প্রচারণা চালাতে পারে৷ গণমাধ্যমে যৌতুক বিরোধী প্রচারাভিযানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে৷
নারীরা কেন যৌতুকের বলি হবে? কেন তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে? এ সমস্যার সমাধান রয়েছে প্রতিটি পরিবারের প্রতিটি ব্যক্তির সচেতন হয়ে ওঠার মধ্যেই৷ সবার মধ্যে যদি এই বোধ জন্ম নেয় যে যৌতুক এক ধরনের ভিক্ষাবৃত্তি, এর মাধ্যমে কোন সম্মান প্রাপ্তি হয় না, বরং নিজের সম্মানহানিই ঘটে-তাহলে হয়ত আমাদের সমাজ থেকে একদিন এই ভয়াবহ অভিশাপ দূর হবে৷
যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফলতা আসছে না৷ সামাজিক এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে৷ গ্রাম থেকে শহরে, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত–সর্বোত্রই এই ব্যাধির প্রকোপ৷ এ নিয়েই এবার ডয়চে ভেলের মুখোমুখি ডা. মালেকা বানু৷
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানুর কথায়, নারীর ক্ষমতায়ন বা বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গেলেও আগে দরকার যৌতুক প্রথা বন্ধ করা৷ তবে শুধু যারা যৌতুক দিচ্ছে, তারা নয়৷ যারা দিচ্ছে, তারাও অপরাধী৷
ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে যৌতুক প্রথার অবস্থাটা এখন কেমন?
ডা. মালেকা বানু: বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা এখনো চলছে সেই আগের মতোই৷ তাই এটা আগের চেয়ে কমেছে, এটা আমরা বলতে পারব না৷
এই সংখ্যাটা কি আগের চেয়ে বেড়েছে না কমছে?
কমেনি তো বটেই৷ উলটে যৌতুক প্রথাটা দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে৷ এক সময় এটা একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷ কিন্তু এখন এটা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে৷ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত – সবার মধ্যেই এটা ছড়িয়ে আছে৷ তাছাড়া সকল ধর্ম-বর্ণের মধ্যে এই যৌতুক প্রথা এখন আসন গেড়ে বসেছে৷
যৌতুক কি সামাজিক ব্যাধি না কি একটা প্রথা?
এটা অবশ্যই সামাজিক ব্যাধি৷ আমাদের সমাজে মেয়েদের যেভাবে দেখা হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গি তো বদলায়নি৷ বিয়েতে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া আমাদের সমাজে এখনো প্রচলিত আছে৷ বাংলাদেশে কিন্তু যৌতুকবিরোধী আইন আছে৷ অথচ যারা যৌতুক দিচ্ছে এবং নিচ্ছে তারা কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা করছে না৷ তবে আইনের ফাঁক-ফোকর রয়েছে৷ এই যৌতুকটা একটা মেয়ের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক৷ এর কারণেই মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে৷ মেয়ের বয়স যত বেশি হবে, তার জন্য নাকি তত বেশি যৌতুক দিতে হবে৷ উচ্চবিত্ত পরিবারেও নানা কৌশলে যৌতুক দেয়া এবং নেয়া হচ্ছে৷ আমাদের ৮৭ ভাগ মেয়ে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে৷ এর সিংহ ভাগই হচ্ছে যৌতুকের কারণে৷ এটা পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে উঠে এসেছে৷ বিয়ের ১০ বছর পরও যৌতুকের কারণে মেয়েদের নির্যাতন করা হচ্ছে, তার পরিবারের উপর চাপ দেয়া হচ্ছে৷ এটা বন্ধ করা না গেলে নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ বন্ধ বা মেয়েদের সম্মানজনক একটা অবস্থায় কখনও নিয়ে যাওয়া যাবে না৷ দেশে যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং হত্যা চলছেই৷
যৌতুক প্রথা শহরে না গ্রামে বেশি?
আমরা বলব গ্রামে বা শহরে সব জায়গাতেই এটা চলছে৷ গ্রামেরটা দৃশ্যমান৷ সেখানে বলাই হয় যে, যৌতুক না দিলে মেয়ের বিয়ে হবে না৷ বয়স বেশি হলে যৌতুক বেশি দিতে হবে৷ কিন্তু শহরে নানান ‘ফরম্যাটে' যৌতুক দেয়া এবং নেয়া হচ্ছে৷ এখানে উচ্চবিত্তরা চাকরি, গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক – নানা কায়দায় এটা চালাচ্ছে৷ যারা দিচ্ছে এবং নিচ্ছে তাদের আমরা সামাজিকভাবে বয়কট করতে পারছি না৷ আমরা যদি তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে না পারি তাহলে যৌতুক প্রথা বন্ধ করতে পারব না৷
বাল্যবিবাহ যৌতুকের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত?
খুবই সম্পর্কিত৷ এখানে দারিদ্র একটা কারণ৷ বলা হয়, কম বয়সে বিয়ে হলে কম যৌতুক দেয়া যায়৷ এ কারণে গ্রামের বাবা-মায়েরা মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন৷
পুরুষদের মধ্যে যৌতুকের আকাঙ্খা কেন তৈরি হয়?
আমাদের সমাজে ছেলেরা একটা ভিন্ন ধরনের মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে৷ যৌতুক নেয়াটা তারা এক ধরনের অধিকারের বলে ধরে নিছে৷
এটা কি তাহলে পারিবারিক প্রথার মধ্যে ঢুকে গেছে?
শুধু পারিবারিক বা সামাজিক প্রথা নয়, এটা মানসিক চিন্তার মধ্যেও এটা ঢুকে গেছে৷ যৌতুক নেয়াটা একটা ছেলের জন্য কতটা অসম্মানজনক, সেটা আজকের ছেলেদের আমাদের বোঝাতে হবে৷
শাশুড়ি কিংবা ননদ যৌতুকে জড়িত হন কেন? তাঁরাও তো নারী?
এটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঢুকে গেছে৷ এই দৃষ্টিভঙ্গির ধারক-বাহক ছেলে এবং মেয়ে৷ এর শিকারও হচ্ছে ছেলে-মেয়ে সবাই৷ ফলে নির্যাতিত মেয়ের পাশে এই শাশুড়ি বা ননদ দাড়াঁচ্ছেন না৷ অনেক সময় তাঁরাও নির্যাতনকারীর ভূমিকায় চলে আসছেন৷
শিক্ষিত সচেতন নাগরিকরাও তো যৌতুক দিচ্ছেন এবং নিচ্ছেন৷ তাহলে আমাদের শিক্ষায় কোনো গলদ আছে কি?
আমি বলব অবশ্যই শিক্ষায় গলদ রয়েছে৷ একটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা – এই বিষয়গুলো আমাদের পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷ এটা নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি৷ তবে এবার এটাকে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷
যৌতুকের জন্য প্রাণ নিয়ে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে না কমছে?
আমরা কমার কোনো লক্ষণ দেখছি না৷ নানানভাবে এই প্রবণতা বেড়েই চলছে৷ আমরা দেখছি শুধু প্রাণ কেড়ে নেয়া নয়, একজন নারীর চোখ তুলে নিচ্ছে বা নানাভাবে তাঁর উপর নির্যাতনও করা হচ্ছে৷ আর এ ধরনের নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে৷ যাঁরা যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার তাঁরা যদি মামলা করেন, তাহলে তাঁদের কতভাগ নিজেদের পক্ষে রায় পান? আর এই ভাগ যদি কম হয়, তাহলে তার কারণ কী?
আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চয় আপনাদেরও একটা ধারণা আছে! আর দ্বিতীয় কথা হলো, এটা কিন্তু নারী বান্ধব না৷ এই বিচার ব্যবস্থা থেকে নারীরা যে ন্যায় বিচার পাবে, তার সম্ভাবনা সবক্ষেত্রেই কম৷ যৌতুকের মামলার ক্ষেত্রে তো আমরা দেখিই যে, এটা ঠিকমতো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক ব্যতয় ঘটে৷
তাহলে কি আদালতে নারী ‘পাবলিক প্রসিকিউটার' বা সরকারি প্রতিনিধি জরুরি হয়ে পড়ছে?
নিশ্চয় প্রয়োজন৷ আমরা দেখছি যে, বিচার ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে৷ আমরা বলছি, যিনি ‘পাবলিক প্রসিকিউটার' বনা পিপি রয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটা যেন নারীবান্ধব হয়৷ নারীর প্রতি তাঁর একটা সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি যেন থাকে৷ তাছাড়া আইনেও পরিবর্তন আনতে হবে৷ আমরা চেষ্টা করছি৷ সরকারেরও একটা ‘পজেটিভ' দৃষ্টিভঙ্গি আছে৷ দেখা যায় কী হয়!
যৌতুক নির্মূলে আপনার পরামর্শ কী?
সর্বপ্রথম আমাদের আইনে সংশোধন প্রয়োজন৷ কারণ একটা আন্দোলনে নামতে হলে আগে আপনার হাতিয়ার প্রয়োজন৷ সেইভাবে আইনটা আগে ঠিক করতে হবে৷ দ্বিতীয়ত, সামাজিক আন্দোলনটা অব্যহত রাখতে হবে৷ যারা যৌতুক দিচ্ছে বা নিচ্ছে তারা সামাজিকভাবে অপরাধী৷ তাদের বয়কট করতে হবে৷ এই চর্চাটা শুরু করতে পারিনি৷ এ জন্য ব্যাপক প্রচারণা দরকার৷ আর এটা যে একটা সামাজিক ব্যাধি, সেটা তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে৷
যৌতুক প্রতিরোধে উপায়ঃ
অতি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হয়, অভিশপ্ত যৌতুকবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও দেশের শহর, নগর, গ্রাম, গঞ্জসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের এখানে-সেখানে প্রকাশ্যে, চুপিসারে যৌতুকজনিত হত্যাকাণ্ড, অত্যাচার, নির্যাতন, আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। পরিণামে মা-বোন হচ্ছেন লাঞ্ছিত ও নারীকুল হচ্ছে অপমানিত।
ইসলামী দিকদর্শন ও নীতিমালায় যৌতুক লেনদেন শরিয়তের ঘোর পরিপন্থী। সেদিক দিয়ে আলেম, উলামা, ইমাম ও কাজি সাহেবদের যৌতুক প্রতিরোধে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এ অভিশপ্ত প্রথাটির মূলোচ্ছেদ এবং দেশকে যৌতুকবিহীন করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন তারা। দেশে লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসা রয়েছে এবং এতে রয়েছেন অসংখ্য আলেম। এসব আলেম, ইমাম ও কাজি সাহেব যদি মসজিদে নামাজের আগে যৌতুক থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিতে থাকেন, তাহলে যৌতুকের অভিশপ্ত প্রথা দেশ থেকে বিলুপ্ত হতে পারে। যৌতুক প্রতিরোধে আলেম, ওলামা, পীর-মাশায়েখ, মুফতি, ইমাম, কাজি সাহেব ও সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশমালা পেশ করছি।
১. যৌতুক লেনদেন একটি অভিশপ্ত প্রচলন এবং ঘৃণাজনক প্রথা। এর বিরুদ্ধে গণসচেতনতা বাড়াতে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ, নসিহত, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা অনুষ্ঠান করে যৌতুক প্রতিরোধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যৌতুকবিরোধী আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। তাই দেশের অসহায় নারীদের যৌতুকের নির্যাতন থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
২. যৌতুক দিয়ে বিয়ে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
৩. দেশের সব মসজিদে জুমার খুদবার আগে যৌতুক সম্পর্কে শরিয়তের বিধান ও হুকুম সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।
৪. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত বয়সের ক্লাসগুলোতে 'যৌতুক' যে অত্যন্ত জঘন্য ও অভিশপ্ত প্রথা সে বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করতে হবে।
৫. গ্রাম, গঞ্জ, পাড়া-মহল্লায় সর্বস্তরের সমাজকর্মীদের নিয়ে 'যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি' গঠন করতে হবে। শুধু তাই নয়, এর বাস্তবায়নের জন্য মুরবি্বদের সচেতন ও শক্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যৌতুক দিয়ে বিয়ে-শাদিতে যারা জড়িত তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
৬. যৌতুক আদায়ে যেসব পাষণ্ড স্বামী স্ত্রীকে মারধর করে বা বাবার বাড়িতে টাকা বা অর্থ আনতে পাঠিয়ে দেয়, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে পাকড়াও করে পুলিশে সোপর্দ করতে হবে।
৭. বিশেষ করে কাবিননামা ফরমে ' যৌতুকের কোনো দাবি নেই' মর্মে আদালতগ্রাহ্য হলফনামায় স্বাক্ষরদানের ধারা প্রবর্তনের দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
৮. দেশে অসংখ্য কন্যাদায়গ্রস্ত গরিব-দুঃখী, অসহায় বাবা-মার বিয়েযোগ্য কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবার আছে, যারা অভাবের জন্য বিয়ে সুসম্পন্ন করতে পারছে না।
বিয়েযোগ্য এসব মেয়ের বিয়ের বিষয়ে দেশের ধনাঢ্য, বিত্তবান ও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
৯. দেশের সব জাতীয় সংবাদপত্র, বেতার, টিভি এবং দেশি চ্যানেল মিডিয়াকে যৌতুক প্রতিরোধে যৌতুকবিরোধী টক শোর ব্যবস্থা করতে হবে। এসব টক শোতে আলেম, ওলামা, ইমাম, পীর-মাশায়েখদের দিয়ে যৌতুকের ভয়াবহ কুফল পরিণতির কথা জনসমক্ষে তুলে ধরার ব্যবস্থা করতে হবে।
১০. যৌতুকবিহীন বিয়ে সম্পন্ন করতে দেশের সর্বত্র নিজ নিজ এলাকার গণ্যমান্য মুরবি্ব, অভিভাবক মহল, ধনাঢ্য-বিত্তবান, আলেম, ওলামা, ইমাম ও কাজি সাহেবদের যৌতুক লেনদেন বন্ধ করার মনমানসিকতা তৈরি করতে হবে। মনে রাখবেন, বিয়ে-শাদি মানবজীবনের একটি পবিত্র কাজ। অতএব আসুন, যৌতুক লেনদেন চিরতরে বিলুপ্ত করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে মানবিক কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হই।
সংগৃহীত-
তারিখঃ- ২৭/০৩/২০২১ ইং
এম.এ. মতিন
এল.এল.বি.
দলিল লেখক ও তল্লাশী কারক এবং ল্যান্ড সার্ভেয়ার /আমিন
সদর-সাব রেজিস্ট্রি অফিস
রেজিষ্ট্রেশন কমপ্লেক্স ভবন (৩য়তলা), নারায়ণগঞ্জ।
মোবাইলঃ ০১৭১৬ ৮০৮২৮২