06/10/2025
ধর্মীয় অবমাননা ও দায়-প্রহেলিকা: অপূর্ব পালের উদাহরণ, আইন ও নৈতিক প্রশ্ন
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়—এটি রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা এবং সমাজের সহনশীলতার পরীক্ষা। অপূর্ব পালের ঘটনাটি ঠিক সেই জায়গাতেই আলো ফেলেছে, যেখানে “অভিযোগ”, “আইন” ও “মানসিক বিকার” একে অপরের বিপরীতে দাঁড়ায়।
আইন ও ধারা: ২৯৫-এ ও সাইবার নিরাপত্তা আইন
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫-এ ধারা অনুযায়ী, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত করলে, সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা (বা উভয়) হতে পারে। এই ধারা ১৯২৭ সালে যুক্ত হয়, মূলত ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে।
অন্যদিকে, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ২৮ ধারা ডিজিটাল মাধ্যমকে যুক্ত করেছে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা উস্কানি দেয়, তাহলে তার শাস্তি হতে পারে দুই বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই।
দণ্ডবিধির ৮৪ ধারা: মানসিক বিকার ও দায়মুক্তির পথ
এই ধারাটাই এখন অপূর্ব পালের মামলার কেন্দ্রবিন্দু। এতে বলা আছে—যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময় মানসিকভাবে এতটাই অক্ষম থাকে যে কাজের প্রকৃতি, পরিণতি বা নৈতিকতা বুঝতে না পারে, তাহলে সে দোষী নয়। আদালত তখন মানসিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য “Mental Status Examination (MSE)” নির্দেশ করে। যদি সত্যিই বিকারগ্রস্ত প্রমাণিত হয়, তাকে কারাদণ্ড দেওয়া যায় না; বরং মানসিক হাসপাতালে বা নিরাপদ কাস্টডিতে রাখা হয় যতদিন না সে সমাজের জন্য নিরাপদ বিবেচিত হয়।
এই ধারাই অনেক সময় ধর্মীয় অবমাননার মামলাকে নিষ্প্রভ করে দেয়—যেখানে অপরাধের দায় শেষ পর্যন্ত “বিকার”-এর আড়ালে মিলিয়ে যায়।
অপূর্ব পালের ভিডিও: বিকার না উদ্দেশ্য?
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়—অপূর্ব পাল নিজ হাতে পবিত্র কুরআন ছিঁড়ে, পা দিয়ে মাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘুরছে। এখন প্রশ্ন—এটি কি মানসিক অসুস্থতার প্রকাশ, নাকি ইচ্ছাকৃত অবমাননা?
তার আশেপাশের কিছু শিক্ষক ও পরিচিতজন বলছেন, সে দীর্ঘদিন ধরে ড্রাগ আসক্ত ছিল এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু যুক্তি আসে—NSU লাইব্রেরিতে প্রায় ৪৯,৬০০টি বই আছে, সেখানে যদি কেউ বিকারগ্রস্ত হয়, তাহলে কেন শুধু ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থটিই তার লক্ষ্য হবে?
একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ এলোমেলো আচরণ করে; কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতীক আঘাতের লক্ষ্য। সুতরাং “মানসিক বিকার” তত্ত্ব কতটা টেকসই—সেটি আদালতের ফরেনসিক ও মনস্তাত্ত্বিক রিপোর্টের উপর নির্ভর করবে।
রাখাল রাহা ইস্যু: এক প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টান্ত
রাখাল রাহা, যিনি পাঠ্যপুস্তক সংশোধন কমিটির সদস্য ছিলেন, তার মন্তব্য নিয়েও সম্প্রতি তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, যদিও পরে তদন্তে দেখা যায় অভিযোগের তথ্যগত অসঙ্গতি ছিল। তাকে কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু মামলা পর্যন্ত গড়ায়নি।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে—ধর্মীয় অনুভূতি ও জনরোষের মাঝের সীমানা কতটা সূক্ষ্ম, এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কতটা সামাজিক চাপে পরিচালিত হতে পারে।
অতীতের নজির: বিচারবিহীনতার ধারাবাহিকতা
ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় অবমাননার মামলাগুলো সচরাচর কঠোর শাস্তিতে পৌঁছায় না।
১৯৭৩-এ কবি দাউদ হায়দার নবী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, পরে ভারতে পালিয়ে যান।
১৯৯৩-এ তসলিমা নাসরিন ইউরোপে পাড়ি দেন; ২০০২-এ অনুপস্থিতিতে মাত্র এক বছরের সাজা হয়।
২০০৭-এ কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমান পান মাত্র দুই মাসের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা।
২০২৫-এর শুরুতে প্রান্ত তালুকদারের ইসলামবিরোধী মন্তব্যেও কোনো কার্যকর শাস্তি হয়নি।
এই ইতিহাস দেখায়, অভিযোগ যতই আলোড়ন তুলুক, আইন প্রয়োগ প্রায়ই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ছায়ায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
NSU-এর দায় কতটা?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের ভেতর এমন কাজ করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতটা দায়ী?
বাংলাদেশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট-২০০১ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীর আচরণের জন্য নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দায় বহন করে, যদি তা ক্যাম্পাসে ঘটে এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ঘাটতির কারণে সম্ভব হয়।
অপূর্ব পালের ঘটনা ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে সংঘটিত হওয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া, একাধিক সূত্র বলছে, সে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও আচরণগত সমস্যায় ভুগছিল—যা প্রশাসনের জানা ছিল। যদি তাই হয়, তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়াটা প্রশাসনিক অবহেলা হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
এখন NSU চাইলে ঘটনাটিকে “ব্যক্তিগত বিকার” বলে দায় ঝেড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু আইনের চোখে দায়িত্ব একেবারে শূন্য নয়। কারণ, এই ঘটনা ঘটেছে তাদের নিয়ন্ত্রিত ও সুরক্ষিত স্থানে—যেখানে ধর্মীয় অবমাননার ভিডিও তৈরি ও ছড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়েছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত প্রতিটি মামলা আইন, নীতি, ও নৈতিকতার সংঘর্ষে আটকে যায়। কেউ বিকারগ্রস্ত, কেউ মুক্তচিন্তার শিকার, কেউ আবার রাজনৈতিক খেলায় প্যাদা। কিন্তু কুরআন অবমাননার মতো ঘটনায় রাষ্ট্র যদি বারবার “মানসিক অসুস্থতা”কে ঢাল হিসেবে মেনে নেয়, তাহলে সেটি কেবল আইনের ব্যর্থতা নয়—এটি আমাদের নৈতিক পতনেরও সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।