23/08/2026
জোরপূর্বক বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া চেকের মামলা: আসামীপক্ষের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
আমাদের সমাজে চেক ডিজঅনার মামলা এখন একটি অতি পরিচিত বিষয়। কেউ ঋণ দিয়ে চেক নেন, আবার কেউবা প্রতারণা করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অন্যের কাছ থেকে সাদা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। পরবর্তীতে সেই চেক দিয়েই দায়ের হয় ফৌজদারি মামলা। প্রশ্ন হলো—চেক যদি স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নেওয়া হয়, কিংবা হারিয়ে যাওয়া চেক অসাধুভাবে ব্যবহার করে মামলা করা হয়, তাহলে আসামীর প্রতিকার কী?
এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র, ২৩ এএলআর (ভলি-৩), ২০২১, মামলা নং-৩১—এই সিদ্ধান্তটি চেক মামলায় হয়রানির শিকার নিরপরাধ মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এই রায়ের কেন্দ্রীয় বার্তা হলো—কোনো চেকের বিপরীতে যদি আইনগত ও বৈধ বিনিময়মূল্য (Consideration) না থাকে, তাহলে সেই চেক দাতা তার জন্য ফৌজদারিভাবে দায়ী থাকবেন না। অর্থাৎ শুধু একটি স্বাক্ষরিত চেক থাকলেই কাউকে আসামী করে সাজা পাওয়ানো যায় না; চেকের পেছনে প্রকৃত ঋণ, দেনা-পাওনা বা লেনদেন থাকা আবশ্যক।
চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর মূল কথাই হলো, যেকোনো চুক্তি বা দলিল তৈরি হতে হবে স্বাধীন সম্মতিতে। এই আইনের ধারা ১৪ অনুযায়ী সম্মতি তখনই 'স্বাধীন' বলে গণ্য হয়, যখন তা জবরদস্তি (Coercion), অন্যায় প্রভাব (Undue Influence), প্রতারণা (Fraud), ভুল বর্ণনা (Misrepresentation) বা ভুল বোঝাবুঝি (Mistake) দ্বারা প্রভাবিত না হয়।
ধারা ১৫ অনুযায়ী জবরদস্তির মাধ্যমে নেওয়া কোনো দলিল বাতিলযোগ্য (Voidable)।
ধারা ১৯ অনুযায়ী যার সম্মতি জবরদস্তি বা প্রতারণার ফলে নেওয়া হয়েছে, তিনি ইচ্ছা করলে সেই চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখেন।
সুতরাং জোর করে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া চেক আইনের চোখে কোনো স্বাধীন সম্মতিতে সম্পাদিত দলিল নয়। যেহেতু এই চেকের বিপরীতে বৈধ কোনো লেনদেন নেই, তাই নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এন.আই এ্যাক্ট), ১৮৮১-এর ৪৩ ধারা অনুযায়ী এটি একটি 'প্রতিদানবিহীন' বা 'অবৈধ কনসিডারেশন'-এর দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ২৩ এএলআর মামলার রায়ে ঠিক এই যুক্তিই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
এন.আই এ্যাক্টের ১১৮ ধারায় বলা আছে, প্রতিটি নেগোশিয়েবল দলিল সম্পর্কে আদালত সাধারণত অনুমান করবে যে তা বৈধ প্রতিদানের বিনিময়ে সম্পাদিত হয়েছে। আর ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, চেক গ্রহীতা যদি প্রমাণ করেন যে চেকটি তার হাতে এসেছে, তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেটি ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এই অনুমান কোনোভাবেই অকাট্য (Irrebuttable) নয়—এটি একটি খণ্ডনযোগ্য অনুমান (Rebuttable Presumption)। ২৩ এএলআর মামলার সিদ্ধান্ত অনুসারে, আসামী যদি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ (Probable Defence) দিয়ে এই অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, তাহলে প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) ঘুরে গিয়ে বাদী তথা অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়। আসামীকে প্রতিটি বিষয় নিঃসন্দেহে (Beyond Reasonable Doubt) প্রমাণ করতে হয় না; সম্ভাব্যতার ভারসাম্যে (Preponderance of Probability) সন্দেহ তৈরি করতে পারলেই যথেষ্ট।
জোরপূর্বক চেক নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করা যেতে পারে—
সাক্ষী — ঘটনার সময় উপস্থিত কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী থাকলে তার জবানবন্দি।
সিসিটিভি ফুটেজ — জোরপূর্বক চেক আদায়ের স্থান বা সময়ের কোনো ভিডিও প্রমাণ।
থানায় দায়েরকৃত জিডি — ঘটনার অব্যবহিত পরে সাধারণ ডায়েরি করা থাকলে তার কপি।
হারানো চেকের জিডি — চেক হারিয়ে গিয়ে থাকলে তার থানায় করা জিডির কপি।
নিরাপত্তা চেক সংক্রান্ত চুক্তিপত্র — চেকটি কোনো কাজের জামানত (Security) হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকলে সেই সংক্রান্ত লিখিত চুক্তি।
এসব প্রমাণ দেখাতে পারলে বোঝা যাবে যে, চেকটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত লেনদেনের মাধ্যমে হাতবদল হয়নি, বরং জবরদস্তির শিকার হয়েছে।
অভিযোগকারী যদি দাবি করেন যে তিনি ঋণ হিসেবে টাকা দিয়েছিলেন এবং তার বিপরীতেই চেকটি নিয়েছেন, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে—
তার সেই পরিমাণ অর্থ প্রদানের আর্থিক সামর্থ্য ছিল কি না;
তার আয়ের বৈধ উৎস কী ছিল
তিনি তার আয়কর রিটার্নে এই লেনদেন প্রদর্শন করেছেন কি না;
আসামীর সাথে তার পূর্ব থেকে কোনো ঘনিষ্ঠ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি না।
২৩ এএলআর মামলার নজির অনুযায়ী, অভিযোগকারী যদি তার আয়কর নথিতে এই পাওনা টাকা প্রদর্শন না করে থাকেন, তাহলে তা এই লেনদেনকে কাল্পনিক বা অস্বচ্ছ প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
ফৌজদারি বিচারে জেরা (Cross-Examination) একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। আসামীপক্ষের আইনজীবী অভিযোগকারীকে নিম্নরূপ প্রশ্ন করতে পারেন—
ক) চেকটি ঠিক কবে, কোথায়, কার উপস্থিতিতে লেখা বা হস্তান্তর হয়েছিল?
খ) সেই সময় সাক্ষী হিসেবে আর কে কে উপস্থিত ছিলেন?
গ) টাকা প্রদানের বিপরীতে কোনো রসিদ বা লিখিত চুক্তি হয়েছিল কি না?
ঘ) টাকাটি ব্যাংকিং চ্যানেলে দেওয়া হয়েছে, না কি নগদে?
ঙ) অভিযোগকারীর সাথে আসামীর পূর্বে কোনো ব্যবসায়িক বা আর্থিক সম্পর্ক ছিল কি না?
অভিযোগকারী যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর বা কোনো সাক্ষী-প্রমাণ দেখাতে না পারেন, তাহলে এন.আই এ্যাক্টের ৪৩ ধারা অনুযায়ী প্রকৃত বিনিময়মূল্যের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে, যা মামলার ফলাফল আসামীর অনুকূলে নিয়ে যেতে পারে।
চেক ডিজঅনার আইন মূলত বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত হয়েছিল, যাতে মানুষ চেক দিয়ে প্রতারণা করতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এই আইনের অপব্যবহার করে জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শন করে নেওয়া চেক দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হয়। ২৩ এএলআর মামলার এই যুগান্তকারী রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধু একটি স্বাক্ষরিত চেক থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজা হয়ে যায় না—চেকের পেছনে বৈধ প্রতিদান আছে কি না, তা প্রমাণের দায়ও অভিযোগকারীকেই বহন করতে হতে পারে, যদি আসামী যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষা দাঁড় করাতে সক্ষম হন।
সুতরাং যারা প্রতারণামূলকভাবে বা জোরপূর্বক দেওয়া চেকের মামলায় আসামী হয়েছেন, তাদের উচিত দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে যথাযথ প্রমাণ ও কৌশল নিয়ে আদালতে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।
লেখক পরিচিতি: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | [email protected]