P. M. Serajul Islam

P. M. Serajul Islam এ্যাডভোকেট পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)

জোরপূর্বক বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া চেকের মামলা: আসামীপক্ষের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষাএডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকআমাদের সম...
23/08/2026

জোরপূর্বক বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া চেকের মামলা: আসামীপক্ষের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
আমাদের সমাজে চেক ডিজঅনার মামলা এখন একটি অতি পরিচিত বিষয়। কেউ ঋণ দিয়ে চেক নেন, আবার কেউবা প্রতারণা করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অন্যের কাছ থেকে সাদা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে নেন। পরবর্তীতে সেই চেক দিয়েই দায়ের হয় ফৌজদারি মামলা। প্রশ্ন হলো—চেক যদি স্বেচ্ছায় নয়, বরং জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নেওয়া হয়, কিংবা হারিয়ে যাওয়া চেক অসাধুভাবে ব্যবহার করে মামলা করা হয়, তাহলে আসামীর প্রতিকার কী?
এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র, ২৩ এএলআর (ভলি-৩), ২০২১, মামলা নং-৩১—এই সিদ্ধান্তটি চেক মামলায় হয়রানির শিকার নিরপরাধ মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এই রায়ের কেন্দ্রীয় বার্তা হলো—কোনো চেকের বিপরীতে যদি আইনগত ও বৈধ বিনিময়মূল্য (Consideration) না থাকে, তাহলে সেই চেক দাতা তার জন্য ফৌজদারিভাবে দায়ী থাকবেন না। অর্থাৎ শুধু একটি স্বাক্ষরিত চেক থাকলেই কাউকে আসামী করে সাজা পাওয়ানো যায় না; চেকের পেছনে প্রকৃত ঋণ, দেনা-পাওনা বা লেনদেন থাকা আবশ্যক।
চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর মূল কথাই হলো, যেকোনো চুক্তি বা দলিল তৈরি হতে হবে স্বাধীন সম্মতিতে। এই আইনের ধারা ১৪ অনুযায়ী সম্মতি তখনই 'স্বাধীন' বলে গণ্য হয়, যখন তা জবরদস্তি (Coercion), অন্যায় প্রভাব (Undue Influence), প্রতারণা (Fraud), ভুল বর্ণনা (Misrepresentation) বা ভুল বোঝাবুঝি (Mistake) দ্বারা প্রভাবিত না হয়।
ধারা ১৫ অনুযায়ী জবরদস্তির মাধ্যমে নেওয়া কোনো দলিল বাতিলযোগ্য (Voidable)।
ধারা ১৯ অনুযায়ী যার সম্মতি জবরদস্তি বা প্রতারণার ফলে নেওয়া হয়েছে, তিনি ইচ্ছা করলে সেই চুক্তি বাতিল করার অধিকার রাখেন।
সুতরাং জোর করে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া চেক আইনের চোখে কোনো স্বাধীন সম্মতিতে সম্পাদিত দলিল নয়। যেহেতু এই চেকের বিপরীতে বৈধ কোনো লেনদেন নেই, তাই নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এন.আই এ্যাক্ট), ১৮৮১-এর ৪৩ ধারা অনুযায়ী এটি একটি 'প্রতিদানবিহীন' বা 'অবৈধ কনসিডারেশন'-এর দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ২৩ এএলআর মামলার রায়ে ঠিক এই যুক্তিই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
এন.আই এ্যাক্টের ১১৮ ধারায় বলা আছে, প্রতিটি নেগোশিয়েবল দলিল সম্পর্কে আদালত সাধারণত অনুমান করবে যে তা বৈধ প্রতিদানের বিনিময়ে সম্পাদিত হয়েছে। আর ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, চেক গ্রহীতা যদি প্রমাণ করেন যে চেকটি তার হাতে এসেছে, তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেটি ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এই অনুমান কোনোভাবেই অকাট্য (Irrebuttable) নয়—এটি একটি খণ্ডনযোগ্য অনুমান (Rebuttable Presumption)। ২৩ এএলআর মামলার সিদ্ধান্ত অনুসারে, আসামী যদি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ (Probable Defence) দিয়ে এই অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, তাহলে প্রমাণের দায়ভার (Burden of Proof) ঘুরে গিয়ে বাদী তথা অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়। আসামীকে প্রতিটি বিষয় নিঃসন্দেহে (Beyond Reasonable Doubt) প্রমাণ করতে হয় না; সম্ভাব্যতার ভারসাম্যে (Preponderance of Probability) সন্দেহ তৈরি করতে পারলেই যথেষ্ট।
জোরপূর্বক চেক নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করা যেতে পারে—
সাক্ষী — ঘটনার সময় উপস্থিত কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী থাকলে তার জবানবন্দি।
সিসিটিভি ফুটেজ — জোরপূর্বক চেক আদায়ের স্থান বা সময়ের কোনো ভিডিও প্রমাণ।
থানায় দায়েরকৃত জিডি — ঘটনার অব্যবহিত পরে সাধারণ ডায়েরি করা থাকলে তার কপি।
হারানো চেকের জিডি — চেক হারিয়ে গিয়ে থাকলে তার থানায় করা জিডির কপি।
নিরাপত্তা চেক সংক্রান্ত চুক্তিপত্র — চেকটি কোনো কাজের জামানত (Security) হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকলে সেই সংক্রান্ত লিখিত চুক্তি।
এসব প্রমাণ দেখাতে পারলে বোঝা যাবে যে, চেকটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত লেনদেনের মাধ্যমে হাতবদল হয়নি, বরং জবরদস্তির শিকার হয়েছে।
অভিযোগকারী যদি দাবি করেন যে তিনি ঋণ হিসেবে টাকা দিয়েছিলেন এবং তার বিপরীতেই চেকটি নিয়েছেন, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে—
তার সেই পরিমাণ অর্থ প্রদানের আর্থিক সামর্থ্য ছিল কি না;
তার আয়ের বৈধ উৎস কী ছিল
তিনি তার আয়কর রিটার্নে এই লেনদেন প্রদর্শন করেছেন কি না;
আসামীর সাথে তার পূর্ব থেকে কোনো ঘনিষ্ঠ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি না।
২৩ এএলআর মামলার নজির অনুযায়ী, অভিযোগকারী যদি তার আয়কর নথিতে এই পাওনা টাকা প্রদর্শন না করে থাকেন, তাহলে তা এই লেনদেনকে কাল্পনিক বা অস্বচ্ছ প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
ফৌজদারি বিচারে জেরা (Cross-Examination) একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার। আসামীপক্ষের আইনজীবী অভিযোগকারীকে নিম্নরূপ প্রশ্ন করতে পারেন—
ক) চেকটি ঠিক কবে, কোথায়, কার উপস্থিতিতে লেখা বা হস্তান্তর হয়েছিল?
খ) সেই সময় সাক্ষী হিসেবে আর কে কে উপস্থিত ছিলেন?
গ) টাকা প্রদানের বিপরীতে কোনো রসিদ বা লিখিত চুক্তি হয়েছিল কি না?
ঘ) টাকাটি ব্যাংকিং চ্যানেলে দেওয়া হয়েছে, না কি নগদে?
ঙ) অভিযোগকারীর সাথে আসামীর পূর্বে কোনো ব্যবসায়িক বা আর্থিক সম্পর্ক ছিল কি না?
অভিযোগকারী যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর বা কোনো সাক্ষী-প্রমাণ দেখাতে না পারেন, তাহলে এন.আই এ্যাক্টের ৪৩ ধারা অনুযায়ী প্রকৃত বিনিময়মূল্যের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে, যা মামলার ফলাফল আসামীর অনুকূলে নিয়ে যেতে পারে।
চেক ডিজঅনার আইন মূলত বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত হয়েছিল, যাতে মানুষ চেক দিয়ে প্রতারণা করতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এই আইনের অপব্যবহার করে জোরপূর্বক বা ভীতি প্রদর্শন করে নেওয়া চেক দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হয়। ২৩ এএলআর মামলার এই যুগান্তকারী রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধু একটি স্বাক্ষরিত চেক থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজা হয়ে যায় না—চেকের পেছনে বৈধ প্রতিদান আছে কি না, তা প্রমাণের দায়ও অভিযোগকারীকেই বহন করতে হতে পারে, যদি আসামী যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষা দাঁড় করাতে সক্ষম হন।
সুতরাং যারা প্রতারণামূলকভাবে বা জোরপূর্বক দেওয়া চেকের মামলায় আসামী হয়েছেন, তাদের উচিত দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে যথাযথ প্রমাণ ও কৌশল নিয়ে আদালতে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।
লেখক পরিচিতি: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | [email protected]

ডিজিটাল প্রমাণ ও জেরার শক্তি: ১৩৮ ধারার চেক মামলায় আইনি জটিলতা থেকে বাঁচার উপায়!এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক: সাধারণ মানুষের ...
23/08/2026

ডিজিটাল প্রমাণ ও জেরার শক্তি: ১৩৮ ধারার চেক মামলায় আইনি জটিলতা থেকে বাঁচার উপায়!
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, চেক ডিজঅনার হলেই আসামীর সাজা অবধারিত। বাস্তবে তা মোটেই ঠিক নয়। আইন আসামীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে, এবং উচ্চ আদালতের অসংখ্য সিদ্ধান্তে দেখা যায়—সঠিক প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করতে পারলে আসামী সসম্মানে খালাস পেতে পারেন।

আজকের লেখায় চেক মামলায় আসামীর সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা কৌশলগুলো এবং সেসবের পেছনের আইনি ভিত্তি সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

হাইকোর্ট বিভাগ বহুবার পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, এই ধারার মূল উদ্দেশ্য চেকের টাকা আদায় নিশ্চিত করা, আসামীকে কারাগারে পাঠানো নয়। মো. আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় এবং তার আগে আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র মামলায় আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, কারাদণ্ড একটি কঠোর সাজা এবং বিশেষ ও উপযুক্ত পরিস্থিতি ছাড়া তা দেওয়া উচিত নয়।

এন.আই অ্যাক্টের ১১৮ ও ১৩৯ ধারায় বলা আছে, আসামী চেকটি প্রদান করলে ধরে নেওয়া হয় যে তা কোনো বৈধ পাওনা বা দায়বদ্ধতার বিপরীতে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই অনুমানের দায় আসামীর ওপর বর্তায়। কিন্তু এই অনুমান একেবারে অখণ্ডনীয় নয়—আসামী যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ (reasonable doubt) সৃষ্টি করতে পারলেই সেই দায় ঘুরে যায় বাদীর ওপর। অর্থাৎ তখন বাদীকেই প্রমাণ করতে হয় যে প্রকৃতপক্ষে দাবিকৃত টাকা তিনি দিয়েছিলেন এবং তা পরিশোধের ক্ষমতা বা উৎস তার ছিল। ভারতের বোম্বে হাইকোর্টও মহেষ চন্দ্রিকার বনাম দত্তরাম মামলায় (২০০৯(২) ডিসিআর ১৮৫) একই নীতি সমর্থন করেছেন—আসামী কোন প্রেক্ষাপটে চেক দিয়েছিলেন তা প্রমাণের অধিকার তার আছে, এবং জেরা বা সাফাই সাক্ষ্যের মাধ্যমে তিনি এই অনুমান খণ্ডন করতে পারেন।

আসামীর সম্ভাব্য প্রধান ডিফেন্সগুলো
১. নোটিশ জারিতে ত্রুটি বা নোটিশ না পাওয়া

১৩৮ ধারার (১) উপধারার প্রোভাইশো (বি) অনুযায়ী আসামীকে নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে। নোটিশ জারি সঠিকভাবে হয়েছে কিনা তা প্রমাণের দায়িত্ব একমাত্র বাদীর—এ বিষয়ে ৬০ ডিএলআর ৬৭৭ পৃষ্ঠায় উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে। আবার ৩৯ বিএলডি পৃষ্ঠা ২২২-তে বলা হয়েছে, আসামী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিশ উপেক্ষা না করে থাকেন এবং নোটিশ জারি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে ১৩৮ ধারার পূর্বশর্ত পালনে ব্যর্থতার কারণে আসামী খালাস পেতে পারেন।

২. প্রকৃত দেনা-পাওনা বা প্রতিদান (কনসিডারেশন) প্রমাণে বাদীর ব্যর্থতা

শুধু চেক দাখিল করলেই মামলা টিকে যায় না। লোকমান বনাম আয়ুব আলী এবং রাষ্ট্র মামলায় (৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬-৬২০) স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাদীকে অবশ্যই দেনা-পাওনা, প্রকৃত লেনদেন ও প্রতিদানের বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে। তারিখ, সময়, স্থান, সাক্ষীর উপস্থিতি ইত্যাদি বিবরণ নালিশী দরখাস্ত বা জবানবন্দিতে না থাকলে এবং জেরায় তা উন্মোচিত হলে আসামীর পক্ষে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ তৈরি হয়, যা খালাসের পথ খুলে দিতে পারে।

৩. চেক জামানত (সিকিউরিটি) হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, নগদায়নের জন্য নয়

এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ডিফেন্স, বিশেষত ব্লাংক চেকের ক্ষেত্রে। ঋণ প্রদানের আগেই অনেক সময় জামানত হিসেবে ব্লাংক চেক নেওয়া হয়। এ বিষয়ে বোম্বে হাইকোর্টের একটি সিদ্ধান্তে (২০১০ সালের ডিসিআর ২ নং ভলিউমের ৩১৭ পৃষ্ঠা) বলা হয়েছে, ঋণ প্রদানের আগে জামানত হিসেবে ব্লাংক চেক গ্রহণ করা হলে তা কোনো দায়-দেনার অস্তিত্ব সৃষ্টি করে না, এবং সেই ভিত্তিতে মামলা টিকে না। মৌখিক কথোপকথন, চ্যাট বা অন্যান্য প্রমাণে যদি স্পষ্ট হয় যে চেকটি সিকিউরিটি হিসেবে ছিল, নগদায়নের জন্য নয়, তাহলে আসামীর সাজা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

৪. চেকে ওভাররাইটিং বা টেম্পারিং

চেকের অঙ্কে কাটাকাটি, ওভাররাইটিং বা টাকার পরিমাণ পরিবর্তন করা হলে আসামী খালাস পেতে পারেন। ভারতের পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট ২০১০ সালে (ডিসিআর ১ নং ভলিউম, পৃষ্ঠা ১০৮) এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

৫. জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর আদায়

আসামীকে অবৈধভাবে ভয় দেখিয়ে বা জোরজবরদস্তি করে চেকে স্বাক্ষর করানো হয়েছে—এমন প্রমাণ থাকলে তা একটি শক্তিশালী ডিফেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়।

৬. আসামীর মানসিক অসুস্থতা বা নাবালকত্ব

চেক ব্যাংকে উপস্থাপনের আগেই যদি এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত কর্তৃক ঘোষিত হয় যে চেক প্রদানকারী মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন, সেটিও ভালো ডিফেন্স হতে পারে। একইভাবে নাবালক কর্তৃক বা নাবালকের পক্ষে ইস্যুকৃত চেক ডিজঅনার হলে তার বিরুদ্ধে ১৩৮ ধারার মামলা করা যায় না।

৭. মামলা দায়েরের সময়সীমা (তামাদি) লঙ্ঘন

আইনের ১৪১(বি) ধারায় তামাদির মেয়াদ নির্ধারিত। নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিন পার হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা দায়ের না হলে তা তামাদি দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফৌজদারী কার্যবিধির ২২১ ধারার উপধারা (৫) অনুযায়ী অভিযোগ গঠনের সময় অপরাধ সংঘটনের সকল আইনানুগ উপাদান নালিশে উল্লেখ থাকা আবশ্যক।

৮. আসামী কর্তৃক দাবিকৃত টাকা ইতিমধ্যে পরিশোধ

মামলা দায়েরের আগেই যদি বাদীর দাবিকৃত টাকা আসামী নগদে বা অন্য কোনোভাবে পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্স।

৯. অডিও রেকর্ডিং বা ডিজিটাল প্রমাণের ব্যবহার

মামলার প্রকৃত ঘটনা যেমন প্রথম কেইস স্টাডিতে দেখানো হয়েছে, তেমন অনেক ক্ষেত্রে ফোন কল রেকর্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে ২০২২ সালের Evidence (Amendment) Act-এর মাধ্যমে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এ নতুন ৬৫এ ও ৬৫বি ধারা সংযোজন করে ডিজিটাল রেকর্ড ও ফরেনসিক বস্তুকে সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করার এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দ্রুত বিচার আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীন দায়েরকৃত মামলাতেও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে ধারণকৃত অডিও, ভিডিও ও স্থিরচিত্র সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

তবে শুধু অডিও রেকর্ডিং জমা দিলেই চলবে না—আসামীকে প্রমাণ করতে হবে যে তাতে কোনো এডিটিং বা টেম্পারিং করা হয়নি, অর্থাৎ ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা যাচাই করাতে হয়। ডিজিটাল প্রমাণ প্রাইমারি এভিডেন্স হিসেবে গণ্য হবে যদি তা মূল ডিভাইস থেকে সরাসরি উপস্থাপিত হয়, পরিবর্তিত না হয় এবং যথাযথ চেইন অফ কাস্টডি বজায় থাকে। প্রিন্ট কপি বা স্ক্রিনশট মাধ্যমিক সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, যদি না তার সাথে সত্যতার সনদ দাখিল করা হয়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমানে সাক্ষ্য আইনকে আরও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকার একটি সংশোধনী প্রক্রিয়াধীন রেখেছে, যেখানে সাধারণভাবে সব মামলাতেই ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে ধারণকৃত অডিও-ভিডিও-স্থিরচিত্রকে সরাসরি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের সুযোগ তৈরি করার প্রস্তাব রয়েছে।

১০. কোম্পানির পক্ষে মামলায় ত্রুটি

চেক যদি কোনো কোম্পানির পক্ষ থেকে ইস্যু হয়ে থাকে এবং এন.আই অ্যাক্টের ১৪০(১) ধারা অনুযায়ী কোম্পানিকে যথাযথভাবে মামলায় পক্ষভুক্ত করা না হয়, তাহলে তা কার্যধারায় ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জেরার গুরুত্ব ও উচ্চ আদালতে আবেদনের সুযোগ

হয়রানিমূলক বা প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যে মামলা হয়ে থাকলে আসামীর আইনজীবীকে বাদী ও সাক্ষীদের দক্ষতার সঙ্গে জেরা করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। জেরায় সত্য উদঘাটিত হলে আসামীর খালাসের সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া মামলার কার্যধারায় আইনগত ত্রুটি থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলা কোয়াশমেন্টের (খারিজের) জন্য আবেদন করা যায়।

সংক্ষেপে মনে রাখার মতো কিছু কথা
ক) বাদী কম টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করলে চেকের পুরো টাকার মামলা টিকবে না।
খ) কথোপকথন বা প্রমাণে চেক জামানত হিসেবে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হলে আসামীর সাজার সম্ভাবনা কমে।
গ) জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের প্রমাণ থাকলে মামলা খারিজ হতে পারে।
ঘ) চেক দেওয়ার পর টাকা ফেরতের প্রমাণ থাকলে আসামী নির্দোষ প্রমাণিত হতে পারেন।
ঙ) অডিও বা ডিজিটাল প্রমাণ শুধু দাখিল করলেই হবে না, তার সত্যতা ফরেনসিকভাবে প্রমাণ করতে হবে।
চ) চেক দিলেই মামলা প্রমাণিত হয় না; দেনা-পাওনা ও প্রতিদান প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর।

এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলা সাধারণত জনমনে একতরফা "চেক দিয়েছেন মানেই দোষী" এই ধারণা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে আইন ও উচ্চ আদালতের অসংখ্য সিদ্ধান্ত আসামীর ন্যায্য প্রতিরক্ষার অধিকারকে সমুন্নত রেখেছে। সঠিক আইনি পরামর্শ নিয়ে যথাযথ প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করলে একজন নিরপরাধ ব্যক্তি অন্যায় সাজা থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। মোবাইল: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | ই-মেইল: [email protected]

চেক ডিসঅনার মামলায় খালাস পাওয়ার সহজ আইনি উপায় ও কৌশল! এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:বাংলাদেশে চেক ডিসঅনার বা চেক ফেরতের মামলায...
22/08/2026

চেক ডিসঅনার মামলায় খালাস পাওয়ার সহজ আইনি উপায় ও কৌশল!
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
বাংলাদেশে চেক ডিসঅনার বা চেক ফেরতের মামলায় শুধুমাত্র চেকের উপস্থিতি বা স্বাক্ষর থাকলেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। আদালতের স্থির দৃষ্টিভঙ্গি হলো—চেকের পেছনে অবশ্যই বৈধ লেনদেন, দেনা-পাওনা বা প্রতিদান (consideration) থাকতে হবে; তা প্রমাণিত না হলে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
চেক মামলার মূল আইন হলো নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করেন এবং তা ব্যাংক থেকে ফেরত আসে (অপর্যাপ্ত তহবিল বা চুক্তিবদ্ধ সীমা অতিক্রমের কারণে), তবে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন।
তবে এই অপরাধ সাব্যস্ত হতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ হতে হয়:
১। চেকটি বৈধভাবে ইস্যু করা হয়েছে।
২। চেকটি কোনো বৈধ দেনা বা দায়িত্ব পরিশোধের জন্য দেওয়া হয়েছে।
৩। চেক ডিসঅনারের পর বাদী আইনানুগ নোটিশ পাঠিয়েছেন।
৪। নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আসামী টাকা পরিশোধ করেননি।
নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ধারা ৪৩ স্পষ্টভাবে বলেছে কোনো হস্তান্তরযোগ্য দলিল (যেমন চেক) যদি প্রতিদান ছাড়া বা ব্যর্থ প্রতিদানের ভিত্তিতে তৈরি, ড্র, গ্রহণ, এন্ডোর্স বা হস্তান্তর করা হয়, তবে তা পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো অর্থ প্রদানের দায়িত্ব সৃষ্টি করে না। অর্থাৎ, চেকের পেছনে যদি কোনো বৈধ লেনদেন, ঋণ, বা দায়িত্ব না থাকে, তবে সেই চেক আইনগতভাবে কার্যকর নয়।
ধারা ১১৮(ক) অনুযায়ী, প্রতিটি নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (চেক) প্রতিদানসহ তৈরি হয়েছে বলে অনুমান করা হয়, যতক্ষণ না এর বিপরীত প্রমাণিত হয়। তবে এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য (rebuttable presumption)। আসামী যদি আদালতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন যে চেকটি কোনো বৈধ দেনা বা লেনদেনের বিপরীতে দেওয়া হয়নি, তবে এই অনুমান ভেঙে যায়। এক্ষেত্রে আসামীর দায়িত্ব হলো সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে (preponderance of probabilities) তার ডিফেন্স প্রতিষ্ঠা করা, যা 'সন্দেহাতীত প্রমাণ'-এর মতো কঠোর নয়।
১. লোকমান বনাম আয়ুব আলী এবং রাষ্ট্র (৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬)
এই মামলায় হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন যে, বাদী যদি চেকের বিপরীতে কোনো কনসিডারেশন বা প্রতিদান প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, তবে আসামিকে খালাস দেওয়া উচিত। আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, চেকের মামলায় শুধু চেকের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; বৈধ লেনদেন বা দেনা-পাওনা প্রমাণিত হতে হবে।
২. এম.ডি. আবুল কাহের শাহীন বনাম এমরান রশিদ (১৪ এসসিওবি, ২০২০) সুপ্রিম কোর্টের এই রায়টি চেক মামলার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। আদালত রায় দেন যে, ধারা ৪৩ অনুযায়ী যদি চেকের পেছনে কোনো প্রতিদান না থাকে বা প্রতিদান ব্যর্থ হয়, তবে চেক ইস্যুকারীর কোনো অর্থ প্রদানের দায়িত্ব থাকে না। ফলে ধারা ১৩৮-এর অধীনে কোনো মামলাই টিকে না।
৩. এন. হরিহারা কৃষ্ণন বনাম জে. থমাস (২০১৮)
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায়টি বাংলাদেশেও প্রাসঙ্গিক। আদালত বলেন যে, চেক মামলায় বাদীকে আলাদাভাবে দেনা বা দায়িত্বের পরিমাণ প্রমাণ করতে হয় না; ধারা ১৩৯-এর অনুমান সেটি করে দেয়। তবে এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য, এবং আসামী যদি সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে দেখাতে পারেন যে কোনো বৈধ দেনা ছিল না, তবে তিনি খালাস পেতে পারেন।
যদি কেউ মিথ্যা বা জালিয়াতির মাধ্যমে চেক হস্তগত করে মামলা করেন, তবে আসামীর জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ:
১. সাফাই সাক্ষ্য (Defence Evidence) উপস্থাপন কর দেখাতে হবে যে:
ক) বাদীর সাথে তার কোনো বৈধ লেনদেন বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না।
খ) চেকটি কোনো ঋণ পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়নি।
গ) চেকটি হয়তো চুরি, জালিয়াতি, বা অন্যায়ভাবে হস্তগত করা হয়েছে।
২. ডকুমেন্টারি প্রমাণ, যেমন-ব্যাংক স্টেটমেন্ট, লেনদেনের রেকর্ড, চুক্তিপত্র, ইমেইল বা মেসেজের মাধ্যমে দেখাতে হবে যে বাদীর সাথে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল না। যদি চেকটি সিকিউরিটি বা অন্য উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
৩. সাক্ষীদের জবানবন্দি অর্থাৎ ব্যবসায়িক পার্টনার, সহকর্মী, বা পরিচিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দিয়ে বৈধ লেনদেনের অভাব প্রমাণ করা যেতে পারে।
৪. ফরেনসিক পরীক্ষা অর্থাৎ চেকের স্বাক্ষর, টাকার অংক, বা পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখা হয়, তবে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তা প্রমাণ করা যেতে পারে যে চেকটি আসামী কর্তৃক বৈধভাবে ইস্যু করা হয়নি।
মহামান্য হাইকোর্টের বিভিন্ন রায়ের সারসংক্ষেপ হলো শুধু চেক থাকলেই দোষী নয়, যেমন-
"চেক ডিসঅনার মামলায় শুধু চেকের বাহ্যিক সত্যতা (যেমন স্বাক্ষর, অংক) দেখেই দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। আদালতকে বাদীর দাবির ন্যায্যতা এবং আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থন উভয়ই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করতে হবে।"
কাজেই চেক ইস্যু করার সময় কখনোই অজানা বা বিশ্বাসহীন ব্যক্তির কাছে চেক দেবেন না। চেকের পেছনে কোনো চুক্তি, রসিদ, বা লিখিত দলিল থাকলে তা ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। চেক হারালে বা চুরি হলে সাথে সাথে ব্যাংক ও পুলিশে জানান। এটি ভবিষ্যতে কোনো জালিয়াতি মামলা থেকে রক্ষা করবে।
পাশাপাশি চেক মামলায় পড়লে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হোন, যিনি আদালতে আপনার পক্ষে সঠিক ডিফেন্স গড়ে তুলতে পারবেন। তাই, চেক মামলায় পড়লে ভয়ের কিছু নেই; সঠিক আইনি প্রস্তুতি ও প্রমাণ দিয়ে আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | [email protected]

মারামারির মামলায় রক্তপাত সত্ত্বেও আসামির খালাস: ত্রুটি কোথায়, দায়ী কে? একটি আইনি বিশ্লেষণএডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:মারামার...
22/08/2026

মারামারির মামলায় রক্তপাত সত্ত্বেও আসামির খালাস: ত্রুটি কোথায়, দায়ী কে? একটি আইনি বিশ্লেষণ
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
মারামারি বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার পর ভুক্তভোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, থানায় যান এবং বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে দেখা যায়—সত্যিকারে রক্তপাত বা জখম হওয়া সত্ত্বেও আসামি পক্ষ আদালতে খালাস পেয়ে যায়। বাদী ও ভুক্তভোগী বিচার না পেয়ে হতাশ হয়ে ফেরেন।

আদালতের নথিপত্র এবং আইনি মারপ্যাঁচ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—আদালত কেবল আবেগে চলে না, বিচার চলে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের কড়া নিয়মে। একটি মারামারি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ কেন মামলা প্রমাণে ব্যর্থ হয় এবং এর জন্য কারা সবচেয়ে বেশি দায়ী, তা একটি বাস্তব কেইস স্টাডি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ মামলা প্রমাণে যেসব কারণে ব্যর্থ হয়ঃ
১. এজাহার ও সাক্ষ্যের সুস্পষ্ট বৈপরীত্য (Departure from FIR Story):
মামলার এজাহার হলো বিচারপ্রক্রিয়ার সূচনা বিন্দু। এজাহারে ঘটনার যে বিবরণ দেওয়া হয়, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বাদী বা সাক্ষীরা যদি তার থেকে সরে এসে নতুন কোনো গল্প ফাঁদেন বা নতুন অভিযোগ আনেন, তবে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। উচ্চ আদালতের নজরে এজাহারের বিবরণ থেকে বিচ্যুতি রাষ্ট্রপক্ষের পুরো মামলাকে সন্দেহজনক করে তোলে (42 DLR 446)।

২. নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সাক্ষীর অভাব (Non-Examination of Independent Witnesses):
মারামারির ঘটনা সাধারণত রাস্তাঘাট, মোড় বা জনাকীর্ণ স্থানে ঘটে। কিন্তু মামলায় যদি কেবল বাদীর আপন ভাই, ভাতিজা বা দলীয় লোকজনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং এলাকার নিরপেক্ষ লোক বা আশপাশের দোকানদারদের বাদ দেওয়া হয়, তবে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। সাক্ষ্য আইনের ১১৪(জি) ধারা অনুযায়ী, নিরপেক্ষ ও স্থানীয় সাক্ষীদের আদালতে হাজির না করলে আদালত ধরে নিতে পারেন যে, ওই স্বাধীন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিলে তা বাদীপক্ষের বিরুদ্ধেই যেত (48 DLR 196 & 7 BLT 59)।

৩. ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারা ও সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারার অসংগতিঃ
তদন্তকারী কর্মকর্তার (I.O.) কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেওয়া সাক্ষ্যের মধ্যে প্রধান বিষয়ে বড় ধরনের গরমিল থাকলে আসামির আইনজীবীরা জেরার মাধ্যমে সাক্ষীর বক্তব্য নস্যাৎ করে দেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে না বলা কথা আদালতে নতুন করে বললে সাক্ষীর গ্রহণযোগ্যতা থাকে না (9 BLC 696 & 58 DLR 26)।

৪. ঘটনাস্থলের ভিন্নতা ও অস্পষ্টতা (Change of Place of Occurrence):
এজাহার, স্কেচম্যাপ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী যদি মামলার ঘটনাস্থলে গরমিল পাওয়া যায়—যেমন এজাহারে এক জায়গায় ঘটনার কথা বলা হলেও সাক্ষ্যে অন্য জায়গায় দাবি করা হলে—আদালতের কাছে চোখের সামনে দেখা চাক্ষুষ সাক্ষীদের উপস্থিতিই কাল্পনিক মনে হয় (12 BLT 199)।

৫. ডাক্তারি সনদ (Medical Evidence) ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের অমিল:
মারামারি মামলায় ডাক্তারি সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। সাক্ষীরা যদি দাবি করেন ঘটনা এক নির্দিষ্ট তারিখে ঘটেছে, কিন্তু হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার বা ইনজুরি রিপোর্টে আঘাতের সময় ও তারিখ অন্য কিছু নির্দেশ করে, তবে ডাক্তারি তথ্যই প্রাধান্য পায়। কারণ প্রত্যক্ষদর্শী বা চাক্ষুষ সাক্ষীর বক্তব্য ডাক্তারি প্রতিবেদনের বিপরীত হলে সেই সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে কাউকে সাজা দেওয়া যায় না (7 BLT 407 & 10 BLT 770)।

৬. এজাহার দায়েরের অযৌক্তিক বিলম্ব (Delayed FIR):
ঘটনা ঘটার পর যুক্তিসঙ্গত ও বিশ্বাসযোগ্য কারণ ছাড়া বিলম্বে এজাহার দায়ের করলে আদালতে ধরে নেওয়া হয় যে, পক্ষদ্বয়ের মধ্যে শলাপরামর্শ করে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত গল্প বানানোর সুযোগ নেওয়া হয়েছে (15 BLD 205)।

মারামারির মামলায় চূড়ান্ত ব্যর্থতার জন্য দায়ী কে?
একটি মামলা ভেস্তে যাওয়ার পেছনে কোনো একক পক্ষের ত্রুটি থাকে না; বরং এটি কয়েকটি পক্ষের অসচেতনতা ও গাফিলতির যৌথ পরিণতি:

তদন্তকারী কর্মকর্তা (Police/I.O.): নিরপেক্ষ স্থানীয় সাক্ষী না রাখা, ঘটনাস্থলের সঠিক স্কেচম্যাপ তৈরি না করা, কিংবা জখমী ও চিকিৎসকের বক্তব্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ না করার মতো প্রাথমিক গাফিলতিই মামলার মূল ভিত্তি ধসিয়ে দেয়।

বাদী ও তার স্বজনদের অতিরঞ্জন: ভুক্তভোগী ও বাদীপক্ষ প্রায়শই অতি-উৎসাহী হয়ে মূল ঘটনার সাথে বানিয়ে অনেক কিছু যোগ করেন, কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামি করেন। এই অতিরঞ্জন জেরার মুখে ধরা পড়ে যায়।

কৌশলী আইনি সহায়তা ও প্রসেস ম্যানেজমেন্টের অভাব: মামলা পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট ড্রাফটিং ও সাক্ষীদের সঠিকভাবে ব্রিফিং করার ঘাটতি থাকলে এবং চিকিৎসকের সাথে ইনজুরি সার্টিফিকেটের তথ্যের সমন্বয় না থাকলে মামলা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের (Reasonable Doubt) সুবিধা পেয়ে আসামিরা খালাস পান (56 DLR 35)।

উত্তরণের উপায় ও সচেতনতা:
আইনের সুনির্দিষ্ট নীতি হলো—"যতক্ষণ না প্রমাণ হচ্ছে, ততক্ষণ আসামি নির্দোষ" (42 DLR 31) এবং "আদালত আবেগ বা অনুভূতির ওপর ভর করে রায় দিতে পারেন না, তাকে আইন ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করতেই হবে" (4 BLT 65)।

সত্যিকারের ভুক্তভোগী হয়ে বিচার পেতে হলে:
১. এজাহারে কোনো আবেগ বা বানোয়াট তথ্য না দিয়ে কেবল সত্য ঘটনাটি লিখুন।
২. নিরপেক্ষ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের প্রাধান্য দিন।
৩. ঘটনার পরপরই বিলম্ব না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন এবং ইমারজেন্সি রেজিস্টারে সঠিক তারিখ ও সময় লিপিবদ্ধ নিশ্চিত করুন।
৪. তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন, আদালতে যেন তার ব্যতিক্রম না ঘটে সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

মারামারিতে আঘাত পেলেই বিচার নিশ্চিত হয় না; আইনসম্মত ও নির্ভুল প্রক্রিয়ায় তা আদালতে প্রমাণ করাই হলো আসল বিচার পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি।

লেখকঃ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা, পিএইচ.ডি ইন ল। ই-মেইলঃ [email protected], মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮

চেকে হাতের লেখা মিলছে না? জেনে নিন, আপনি খালাস পেতে পারেন!এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:আপনি কি কখনো কাউকে বিশ্বাস করে একটি ফা...
21/08/2026

চেকে হাতের লেখা মিলছে না? জেনে নিন, আপনি খালাস পেতে পারেন!
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক:
আপনি কি কখনো কাউকে বিশ্বাস করে একটি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করে দিয়েছিলেন? পরে শুনেছেন, সেই চেকেই বসানো হয়েছে লাখ লাখ টাকার অংক, আর আপনার নামে ঠুকে দেওয়া হয়েছে মামলা?

এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে নতুন কিছু নয়। ব্যবসায়িক লেনদেন, ঋণের নিশ্চয়তা কিংবা নিছক বিশ্বাসের জায়গা থেকে অনেকেই ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করে দেন। পরবর্তীতে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ চেকের গায়ে নিজের ইচ্ছামতো টাকার অংক, তারিখ বা প্রাপকের নাম বসিয়ে আদালতে দ্য নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলা করে বসেন। ফলে নিরপরাধ মানুষও ফেঁসে যান দীর্ঘ মামলার জালে।

তবে সুখবর হলো—মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এমন হয়রানির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যা ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বড় ঢাল হয়ে উঠতে পারে।

একটি চেকে সাধারণত থাকে স্বাক্ষর, তারিখ, প্রাপকের নাম আর টাকার অংক (সংখ্যায় ও কথায়)। বাস্তবে দেখা যায়, চেকের স্বাক্ষরটি হয়তো আসামির নিজের, কিন্তু ভেতরের অন্য লেখাগুলো—তারিখ, নাম কিংবা টাকার অংক—সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতের লেখা এবং ভিন্ন কালিতে করা। অর্থাৎ চেকটি আসামি নিজে পূরণ করেননি, করেছেন অন্য কেউ। এখানেই আসে এ.এইচ. এরশাদুল হক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য (৭৫ ডিএলআর, ৪৪৭) মামলার গুরুত্ব। হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলায় স্পষ্ট করে বলেছেন—

চেক দাতা (ড্রয়ার) নিজে সম্পূর্ণ চেকটি না লিখলে এবং অন্য কেউ পরে অংক, তারিখ বা নাম বসিয়ে দিলে, আর সেখানে হাতের লেখায় স্পষ্ট গরমিল থাকলে, মামলার প্রাথমিক অনুমান ভেঙে যায়।

সহজ কথায়—শুধু স্বাক্ষর মিললেই মামলা টিকবে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। বাকি লেখাগুলোর সঙ্গে অসংগতি থাকলে গোটা মামলার ভিত্তিই নড়ে যেতে পারে।

দ্য নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ৮৭ ধারায় বলা আছে, চেকদাতার সম্মতি বা স্বাক্ষর ছাড়া যদি চেকের মূল বিষয়বস্তুতে—যেমন টাকার অংকে—কোনো পরিবর্তন বা সংযোজন করা হয়, যা চেকের মূল চরিত্র বদলে দেয়, তাহলে সেই চেকটি আইনি দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হয়। আইনের ভাষায় একে বলে "বস্তুগত পরিবর্তন" বা Material Alteration।

অর্থাৎ, কেউ যদি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরে নিজের সুবিধামতো অংক বসিয়ে দেন, সেই চেক দিয়ে ফৌজদারি মামলা চালানোর আইনগত ভিত্তি থাকে না।

সাধারণত ১৩৮ ধারার মামলায় আদালত প্রাথমিকভাবে ধরে নেয় যে, চেকটি বৈধ দেনা পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখনই আসামি হাতের লেখায় অসংগতি বা চেকে কাটাকাটি-ঘষামাজার প্রমাণ দেখাতে পারেন, তখন প্রমাণের দায়িত্ব ঘুরে যায় বাদীর ঘাড়ে।

চেকটি কেন আসামি নিজে পূরণ করেননি? তাহলে চেকের ভেতরের লেখাগুলো কার হাতে লেখা? অন্য কেউ চেক পূরণ করলে তার জন্য আসামির সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছিল কি না? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে মামলার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ বা ফরেনসিক প্রতিবেদনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চেকের ভেতরের লেখা ও কালিতে যদি ফরেনসিক পরীক্ষায় গরমিল ধরা পড়ে, তা মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে পারে।

তবে মনে রাখা জরুরি, ফরেনসিক রিপোর্টই একমাত্র নির্ধারক নয়—আদালত সামগ্রিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন বা পড়তে পারেন, তাদের জন্য কিছু সতর্কতা ও করণীয়।

কখনোই সম্পূর্ণ ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করবেন না। প্রয়োজনে টাকার অংক ও তারিখ নিজ হাতে লিখে দিন। মামলায় জড়ালে আইনজীবীর মাধ্যমে হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞের মতামত (ফরেনসিক পরীক্ষা) চেয়ে আবেদন করুন।
জেরার সময় বাদীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন—চেকের ভেতরের লেখা কার হাতে, চেকটি কি আপনার সামনে পূরণ হয়েছিল? প্রয়োজনে পাল্টা ব্যবস্থা নিন। অনুমতি ছাড়া চেকে পরিবর্তন প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় জালিয়াতির মামলা করার সুযোগও থাকে।

চেক-সংক্রান্ত মামলা মানেই আসামির দোষী হওয়া নয়। হাতের লেখার অসংগতি, বস্তুগত পরিবর্তন এবং ফরেনসিক প্রমাণ একটি মামলাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। ৭৫ ডিএলআর ৪৪৭ নজিরটি এই বিষয়ে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

তবে প্রতিটি মামলার তথ্য-প্রমাণ ভিন্ন হয়, তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | [email protected]

21/08/2026

চেকে সই থাকলেই কি জেল নিশ্চিত? 😱
অনেকেরই ধারণা চেক বাউন্স করলেই আর রক্ষা নেই! কিন্তু মহামান্য হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মূল উদ্দেশ্য কাউকে জেলে পাঠানো নয়, বরং পাওনা টাকা আদায় নিশ্চিত করা। ⚖️চেকে সই থাকা সত্ত্বেও মামলা থেকে খালাস পাওয়ার ৩টি শক্তিশালী আইনি উপায় এবং হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখুন! 📌
আইন সংক্রান্ত এমন আরও দরকারী ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পেতে Law Tips BD পেজটি ফলো রাখুন। ভিডিওটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না! 🔗👇

দেনাদার চেক দিয়ে পালিয়ে গেলে করণীয় কী? জেনে নিন চেক ডিজঅনার মামলার আদ্যোপান্তএডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃব্যবসা-বাণিজ্য ক...
21/08/2026

দেনাদার চেক দিয়ে পালিয়ে গেলে করণীয় কী? জেনে নিন চেক ডিজঅনার মামলার আদ্যোপান্ত
এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকঃ
ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগত লেনদেনে চেক এখনও আস্থার সবচেয়ে বড় প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই দেনাদার চেক দিয়ে টাকা না দিয়ে উধাও হয়ে যান—ফোন বন্ধ করে ফেলেন, ঠিকানা পরিবর্তন করেন, এমনকি এলাকা ছেড়েও চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে পাওনাদার প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়েন—মামলা করা যাবে কি না, আসামিকে খুঁজে না পেলে বিচার আটকে থাকবে কি না, এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খায় মনে।
সুখবর হলো, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (এন.আই অ্যাক্ট) অনুযায়ী আসামি পলাতক থাকলেও মামলা দায়ের বা বিচার প্রক্রিয়া থেমে থাকে না। আইনে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে পলাতক আসামির বিরুদ্ধেও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা যায়। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি।
কেউ যদি আপনাকে একটি চেক দেন এবং সেই চেক ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যাত (ডিজঅনার/বাউন্স) হয়—অর্থাৎ হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা, স্বাক্ষর অমিল, হিসাব বন্ধ থাকা বা অন্য কোনো কারণে ব্যাংক টাকা দিতে অস্বীকার করে—তখন সেই চেকদাতার বিরুদ্ধে এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ থাকে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অস্ত্র, যা পাওনাদারকে তার প্রাপ্য অর্থ আদায়ে সহায়তা করে।
চেক ডিজঅনার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মামলা করা যায় না। আইন অনুযায়ী প্রথমে চেকদাতাকে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে) টাকা পরিশোধের কথা বলা হয়। এই নোটিশ পাঠানোর পরও যদি টাকা পরিশোধ না করা হয়, তাহলেই মামলা করার অধিকার জন্মায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেনাদার যদি পালিয়ে যান বা তার ঠিকানা না পাওয়া যায়, তাহলে নোটিশ কীভাবে পৌঁছানো হবে? আইনে এ বিষয়ে তিনটি বিকল্প পদ্ধতি রাখা হয়েছে:
আসামির হাতে সরাসরি নোটিশ পৌঁছে দিয়ে তার কাছ থেকে গ্রহণের স্বাক্ষর নেওয়া।
এটি সম্ভব না হলে আসামির শেষ জানা ঠিকানায় প্রাপ্তি স্বীকারসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো।
আসামির ঠিকানা অজানা থাকলে বা তিনি পলাতক থাকলে বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক পত্রিকায় নোটিশ প্রকাশ করা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করলেই নোটিশ জারি হয়েছে বলে গণ্য হবে। একাধিক পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন নেই—অর্থাৎ রেজিস্টার্ড ডাকে নোটিশ পাঠানোর পর আবার পত্রিকায় প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা নেই। উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ে এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
অনেকেই দুশ্চিন্তা করেন, নোটিশ কোন পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে বা কতটা প্রচারিত পত্রিকা হতে হবে তা নিয়ে। বাস্তবে আইনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা বা মানদণ্ড দেওয়া নেই। কোনো পত্রিকা বহুল প্রচারিত কি না, তা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক আদালতই নির্ধারণ করে। তাই স্থানীয় কোনো পত্রিকায় নোটিশ প্রকাশ করা হলেও তা বৈধভাবে জারি হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়, এবং শুধু এই টেকনিক্যাল কারণ দেখিয়ে মামলা বাতিল করা যায় না।
মামলা আমলে নেওয়ার পর আদালতের প্রক্রিয়া সাধারণত এভাবে এগোয়:
আদালত প্রথমে আসামির ঠিকানায় সমন জারি করেন। আসামি সমন গ্রহণ না করলে বা পাওয়া না গেলে, জারিকারক তার বাসগৃহে সমন লটকে দিয়ে আসেন—আইনের চোখে এটিও বৈধ জারি বলে গণ্য হয়।
সমন জারির পরও আসামি হাজির না হলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করেন এবং সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে তাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রেপ্তার এড়াতে থাকলে আদালত হুলিয়া জারি করেন—অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজির হওয়ার আদেশ দেন। এরপরও সাড়া না পেলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮২ ও ৮৩ ধারা অনুযায়ী আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিতে পারেন আদালত।
সব ধরনের চেষ্টার পরও আসামিকে খুঁজে না পাওয়া গেলে বা সম্পত্তি ক্রোকের পরও তিনি হাজির না হলে, আদালত জাতীয় বাংলা দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন। এটিই আসামির জন্য আদালতে হাজির হওয়ার শেষ সুযোগ। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলে আদালত আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে আসামির পক্ষে লড়ার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) নিয়োগ দেওয়া হতে পারে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া ন্যায্য থাকে।
সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন। দোষী প্রমাণিত হলে সাধারণত চেকের সমপরিমাণ অর্থ, সর্বোচ্চ তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড, এবং/অথবা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
অনেকে মনে করেন, আসামি বহু বছর পালিয়ে থাকলে হয়তো মামলা বা সাজা আর কার্যকর থাকে না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আদালতের রায় বা সাজার পরোয়ানা কখনোই তামাদি (মেয়াদোত্তীর্ণ) হয় না। আসামি যতদিনই পালিয়ে থাকুন না কেন, যেদিনই তিনি ধরা পড়বেন বা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন, সেদিন থেকেই তার সাজা কার্যকর হবে। অর্থাৎ সময় পার হয়ে গেলেই কেউ শাস্তি থেকে মুক্তি পাবেন—এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
দেনাদার পালিয়ে গেলেই পাওনাদারের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় না। আইন এমনভাবে সাজানো, যাতে প্রতিটি ধাপে আসামিকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পাওনাদারের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে। তাই চেক প্রতারণার শিকার হলে হতাশ না হয়ে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। যোগাযোগ: ০১৭১৬৮৫৬৭২৮ | [email protected]

Address

কুষ্টিয়া আদালত চত্ত্বর, খুলনা, বাংলাদেশ।
Kushtia
7000

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when P. M. Serajul Islam posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Practice

Send a message to P. M. Serajul Islam:

Shortcuts

Share